
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
সৌদি আরবের প্রধান শহর রিয়াদসহ দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে রবিবার সকালেও ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন ছোঁড়ার ঘটনা ঘটে। এই আক্রমণগুলো সফলভাবে নিষ্ক্রিয় করার কথা জানিয়েছে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট। এমন ক্রমাগত নিরাপত্তা ঝুঁকির পরিবেশের মধ্যেই রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের দুটি প্রধান টার্মিনালে পুনরায় ফ্লাইট চলাচল শুরু হয়েছে।
ইয়েমেনের সশস্ত্র গোষ্ঠী হুতি বেশ কিছুদিন ধরে সৌদি আরবের ভূখণ্ডে নিয়মিত আক্রমণ পরিচালনা করে আসছে। ইরান–সমর্থিত এই বিদ্রোহী গোষ্ঠীটি গত শনিবার দাবি করে যে, তারা সৌদি আরবের বিভিন্ন বিমানবন্দর, গুরুত্বপূর্ণ তেল স্থাপনা এবং সামরিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে মোট সাতটি আক্রমণ চালিয়েছে। সৌদি কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে দাবি করা হয় যে, হুতি বিদ্রোহীরা দেশটির দুটি পবিত্র শহর মক্কা ও মদিনাকে তাদের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছিল। তবে সশস্ত্র গোষ্ঠীটি এই অভিযোগ জোরালোভাবে অস্বীকার করেছে।
একই সময়ে ইয়েমেনের তাইজ শহর ঘিরে দেশটির সরকারি বাহিনী এবং হুতি যোদ্ধাদের মধ্যকার সশস্ত্র লড়াই অত্যন্ত তীব্র আকার ধারণ করেছে। শহরটির ভেতরে অবরুদ্ধ অবস্থায় থাকা প্রায় আট লাখ সাধারণ মানুষের কাছে জরুরি ত্রাণসামগ্রী পৌঁছানোর সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে বলে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘ।
সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুর্কি আল-মালিকি গণমাধ্যমকে জানান যে, রাজধানী রিয়াদকে লক্ষ্য করে রবিবার সকালে নিক্ষিপ্ত একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং একটি ড্রোন আকাশে সফলভাবে ধ্বংস করা হয়েছে। এ ছাড়া দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের খামিস মুশাইত শহর অভিমুখে ছোঁড়া একটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রও সফলভাবে প্রতিহত করা হয়েছে।
সৌদি সামরিক জোটের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের আকাশসীমার দিকে ধেয়ে আসা আরও দশটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সফলভাবে প্রতিহত করা হয়েছে।
গত ১০ অক্টোবর রিয়াদের কিং খালিদ বিমানবন্দরে হুতিদের পরিচালিত মারাত্মক হামলায় অন্তত তেরো জন নিহত এবং তিন শতাধিক মানুষ আহত হওয়ার পর থেকে বিমানবন্দরটির কার্যক্রম স্থগিত রাখা হয়েছিল। তবে গত শনিবার রাতে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিক এক ঘোষণায় জানায় যে, রবিবার থেকে এর দুই নম্বর টার্মিনাল দিয়ে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চলাচল করবে এবং এক নম্বর টার্মিনালটি অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটের জন্য উন্মুক্ত থাকবে।
হুতিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি কিং খালিদ বিমানবন্দরটিকে একটি সম্পূর্ণ ‘অনিরাপদ’ স্থান হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি আন্তর্জাতিক, আঞ্চলিক ও স্থানীয় সকল বিমান সংস্থা, এর সাথে সংশ্লিষ্ট কর্মী এবং যাত্রীদের বিমানবন্দরটি ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকার কঠোর সতর্কতা জারি করেছেন। সেখানে যেকোনো অনভিপ্রেত পরিস্থিতির দায় সম্পূর্ণভাবে সৌদি প্রশাসনকে বহন করতে হবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল–জাজিরার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, হুতিদের এই ধারাবাহিক আক্রমণের ফলে সৌদি আরবের সার্বিক ব্যবসা-বাণিজ্য, বিমান চলাচল এবং সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক সংবাদমাধ্যম খালিজ টাইমস–এর তথ্য অনুযায়ী, গত শনিবার হুতিদের ঘোষিত বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুর তালিকায় ছিল কিং খালিদ, কিং ফাহাদ এবং নাজরান বিমানবন্দর। এ ছাড়া ইয়ানবুতে অবস্থিত আরামকোর স্থাপনা, রাবিগ তেল শোধনাগার, প্রধান তেল পাইপলাইন ও পাম্পিং স্টেশন এবং খামিস মুশাইত বিমানঘাঁটি তাদের নিশানায় ছিল। হুতিদের দাবি, সৌদি আরবের পূর্ব দিক থেকে পশ্চিম দিকে অপরিশোধিত তেল পরিবহনের পাইপলাইন ও পাম্পিং স্টেশনগুলোতে তারা সফলভাবে আক্রমণ চালাতে সক্ষম হয়েছে।
সৌদি বেসামরিক প্রতিরক্ষা দপ্তর জানিয়েছে যে, গত শনিবার দুটি ক্ষেপণাস্ত্র আকাশে প্রতিহত করার পর সেগুলোর খণ্ডিত অংশ মক্কা ও মদিনা অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে পড়েছে। এ ছাড়া জেদ্দার আল নুজহা, তায়েফের ওয়াদি জলিল এবং রাবিগের মাস্তুরাহ সেন্টারেও এসব ধ্বংসাবশেষের টুকরো আঘাত হেনেছে।
মক্কা ও মদিনাকে লক্ষ্যবস্তু করার অভিযোগকে সম্পূর্ণ ‘বড় মিথ্যা’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে হুতিরা। এর আগে তারা বলেছিল যে, পবিত্র এই দুটি শহরকে তারা কখনো তাদের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু করবে না।
ইয়েমেনের তাইজ শহরের নিকটবর্তী কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জাবাল সাবর পাহাড়ের দিকে গতকাল হুতি যোদ্ধারা অগ্রসর হন। তারা তাইজ শহরটি পুরোপুরি অবরুদ্ধ করে সৌদি আরব সমর্থিত ইয়েমেনি সরকারের অন্তর্বর্তীকালীন রাজধানী এডেনের সঙ্গে প্রধান সড়ক যোগাযোগের পথ বন্ধ করে দিয়েছেন। ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর দাবি অনুযায়ী, গত শনিবার তারা হুতিদের অবস্থান লক্ষ্য করে সাত শতাধিক বিমান ও অন্যান্য হামলা চালিয়েছে। এর ফলে ইরান–সমর্থিত এই বিদ্রোহী গোষ্ঠীর তিন শতাধিক যোদ্ধা নিহত হয়েছেন।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।