
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
আট ভাইবোনের বিশাল পরিবারে চারজন সদস্যের শারীরিক গঠন খর্বাকৃতির হওয়ায় তাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা অত্যন্ত কষ্টদায়ক হয়ে উঠেছে। বিশেষ এই চারজনের মধ্যে দুই ভাই কিছুটা চলাফেরা করতে পারলেও দুই বোন নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারেন না। তাদের আহারগ্রহণ থেকে শুরু করে প্রাত্যহিক সব কাজের জন্য সম্পূর্ণরূপে অন্যদের সাহচর্যের ওপর নির্ভর করতে হয়। এর ওপর আবার নিজেদের বাড়িতে যাতায়াতের কোনো নির্দিষ্ট সড়ক না থাকায় তাদের সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
এই পরিবারটির বসবাস মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার দীঘি ইউনিয়নের ভাটবাউর গ্রামে এবং তারা প্রয়াত হযরত আলী ও জহুরা বেগম দম্পতির ঔরসজাত সন্তান। এই দম্পতির ঘরে মোট আটটি সন্তান জন্ম নিয়েছিল, যার মধ্যে পাঁচটি মেয়ে এবং তিনটি ছেলে রয়েছে। শারীরিক প্রতিবন্ধকতার শিকার খর্বাকৃতির চার সন্তান হলেন মোছা. হাবিয়া, মোছা. মেহেরজান, ইজ্জত আলী এবং সিরাজ আলী। অন্যদিকে তাদের সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনযাপনকারী ভাইবোনেরা হলেন ছবিয়া বেগম, আফেলা বেগম, লিটন মিয়া ও দাপালি বেগম।
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রয়াত হযরত আলী জীবদ্দশায় বিআইডব্লিউটিসির একজন কর্মী হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন এবং প্রায় দশ বছর আগে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। এই আট ভাইবোনের মধ্যে কেবল ইজ্জত আলী বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন এবং বাকি তিনজন অবিবাহিত অবস্থাতেই একসঙ্গে বসবাস করছেন। অন্যদিকে জহুরা বেগম তার সুস্থ চার সন্তানের মধ্যে তিন মেয়ে ও এক ছেলেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিয়ে দিয়েছেন। বর্তমানে প্রতিবন্ধী চার সন্তান, এক ছেলে, দুই পুত্রবধূ এবং দুই নাতি-নাতনিকে নিয়ে জহুরা বেগমের সংসার চলছে।
পরিবারটির দাবি অনুযায়ী তারা জন্মগতভাবে কোনো প্রতিবন্ধকতার শিকার ছিলেন না, বরং শৈশবে নির্দিষ্ট বয়সে পৌঁছানোর পর তাদের মাঝে এই শারীরিক জটিলতা দেখা দেয়। সন্তানদের এই অস্বাভাবিক শারীরিক গঠনের পেছনের ইতিহাস সম্পর্কে জহুরা বেগম জানান যে, তার প্রথম সন্তান হাবিয়ার বয়স যখন সাত বছর, তখন সে তীব্র জ্বরে আক্রান্ত হয়েছিল। সেই জ্বর সম্পূর্ণ ভালো হওয়ার কিছুদিন পর থেকেই হাবিয়ার হাঁটার ধরনে অস্বাভাবিকতা লক্ষ করা যায় এবং কবিরাজি চিকিৎসা করিয়েও তাকে সুস্থ করা সম্ভব হয়নি। ঠিক একইভাবে অন্য তিন সন্তানের ক্ষেত্রেও সাত থেকে আট বছর বয়স হওয়ার পর হঠাৎ অসুস্থতার মধ্য দিয়ে হাঁটার সমস্যা শুরু হয়। চারজনের মধ্যে এই দুই বোন নিজের পায়ে হাঁটতে না পারলেও বাকি দুজন কিছুটা চলাচল করতে পারেন। সন্তানদের এমন শারীরিক অবস্থার কারণে জহুরা বেগমকে সমাজ ও গ্রামের মানুষের নানা কটু কথা এবং ঠাট্টা সহ্য করতে হয়েছে, যার যন্ত্রণা তিনি এখনও অনুভব করেন।
দুর্ভোগের কথা প্রকাশ করে প্রতিবন্ধী মেহেরজান বলেন যে, তাদের এই কষ্টের জীবনের খোঁজ কেউ রাখে না এবং শারীরিক অবস্থার কারণে তাদের পরিবারের বোঝা বলে মনে হয়। হুইলচেয়ারে বসিয়ে বাইরে নিয়ে যাওয়ার মতো কোনো উপযুক্ত রাস্তা না থাকায় তাদের কষ্ট বহুগুণ বেড়ে গেছে।
ভাটবাউর বাজারের পাকা সড়কের পাশে অবস্থিত কয়েকটি বসতবাড়ির ওপর দিয়ে হেঁটে এই পরিবারটির বাড়িতে যাতায়াত করতে হয়। সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা যায় যে, শারীরিক প্রতিবন্ধী হাবিয়া ও মেহেরজানকে তাদের মা এবং ভাই লিটন মিয়া কোলে করে ঘর থেকে বের করছেন। পরিবারের অন্য সদস্যরা নিজ হাতে তাদের খাইয়ে দিচ্ছেন এবং তাদের প্রাত্যহিক প্রাকৃতিক কাজের ক্ষেত্রেও অন্যের সাহায্য নিতে হচ্ছে। খর্বাকৃতি হওয়া সত্ত্বেও ইজ্জত ও সিরাজ তুলনামূলকভাবে স্বাভাবিকভাবে চলাচল করতে পারেন এবং বাড়ির কাছেই ভাটবাউর বাজারের পাকা রাস্তার পাশে খোলা আকাশের নিচে তারা পান-সিগারেটের দোকান পরিচালনা করেন, যেখান থেকে অত্যন্ত সামান্য আয় হয়। প্রায় দুই বছর ধরে এই চার ভাইবোন সরকারিভাবে প্রতিবন্ধী ভাতা পেয়ে আসছেন এবং এই ভাতার পাশাপাশি জমির ফসলের আয় দিয়ে কোনোমতে তাদের সংসার টিকে আছে।
ইজ্জত আলীর দুই সন্তান ইয়াসির আরাফাত এবং আলিফ আহম্মেদ সফলভাবে উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেছেন এবং তারা সম্পূর্ণ সুস্থ রয়েছেন। ইজ্জত আলী জানান যে, চরম অভাবের তাড়নায় তার বড় ছেলে আরাফাত সম্প্রতি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি নিয়েছেন এবং ছেলের যদি একটি সরকারি চাকরি জুটে যায়, তবে তাদের পরিবারের এই দীর্ঘদিনের কষ্টের অবসান ঘটত।
পরিবারের সদস্যরা আক্ষেপ করে জানান যে, বাড়িতে যাতায়াতের জন্য কোনো রাস্তা না থাকায় তারা চরম বিপাকে জীবনযাপন করছেন। রাস্তা না থাকার কারণে এই দুই প্রতিবন্ধী বোনকে প্রয়োজনের সময় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়াও একটি বড় সমস্যার সৃষ্টি করে। প্রায় দুই বছর আগে স্থানীয় প্রতিবেশীদের সহযোগিতায় ওই পথে কিছু মাটি ফেলা হলেও অর্থের অভাবে সেই কাজ অসমাপ্ত রয়ে গেছে। যদি কোনো সরকারি প্রকল্পের মাধ্যমে একটি স্থায়ী রাস্তা নির্মাণ করা যেত, তবে অন্তত হুইলচেয়ারে করে দুই বোনকে বাইরে আনা নেওয়া করা সম্ভব হতো।
স্থানীয় এলাকার বাসিন্দা ও সমাজসেবক আমজাদ হোসেনের মতে, এই পরিবারের চার সদস্যের খর্বাকৃতির শারীরিক গঠনের কারণে তারা প্রাত্যহিক জীবনে নানা ধরনের জটিলতার মুখোমুখি হচ্ছেন। তাছাড়া বাড়ি থেকে বের হওয়ার নির্দিষ্ট কোনো সড়ক না থাকায় তাদের পরিস্থিতি আরও জটিল রূপ ধারণ করেছে। তিনি উল্লেখ করেন যে, কেবল এই একটি পরিবারই নয়, বরং আশপাশের আরও অন্তত দশটি পরিবারের চলাচলের জন্যও কোনো রাস্তা নেই এবং তাদের বাধ্য হয়ে অন্যের বাড়ির ওপর দিয়ে যাতায়াত করতে হয়।
এ বিষয়ে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মৌসুমী নাসরিন জানান যে, তিনি এই পরিবারটির সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে খোঁজখবর নেবেন এবং প্রতিবন্ধী এই পরিবারসহ আশপাশের অন্যান্য পরিবারের চলাচলের সুবিধার্থে রাস্তা নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করবেন।
উল্লেখ্য যে, সম্প্রতি এই পরিবারের মাঝে প্রথম আলো বন্ধুসভার পক্ষ থেকে একটি সেলাই মেশিন এবং দৈনন্দিন ব্যবহারের কিছু প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী উপহার হিসেবে প্রদান করা হয়। সংবাদমাধ্যমের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত বিশেষ সামাজিক কর্মসূচির অংশ হিসেবে বন্ধুসভার সদস্যরা সরাসরি তাদের বাড়িতে উপস্থিত হয়ে এসব উপহার সামগ্রী হস্তান্তর করেন।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।