
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
গ্রামীণ এক আঞ্চলিক পিচঢালা বা ইট বিছানো সড়ক ধরে অল্প সময় এগোলে চোখে পড়ে রবিন রাংসার ছোট একটি মুদিদোকান। যেখানে চা ও বিস্কুটের পাশাপাশি অন্যান্য দৈনন্দিন জিনিসপত্রও বিক্রি করা হয়।
গত ১৫ অক্টোবর ঠিক এই দোকানের পাশেই রাতের বেলা গুলি চালিয়ে হত্যা করা হয় নেত্রকোনার স্থানীয় সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকিরকে। তখন বয়স হয়েছিল তাঁর ৪৪ বছর এবং ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে দোকানে উপস্থিত ছিলেন স্বয়ং রবিন।
ঘটনার দিন রাত আটটার দিকটায় ওই দোকান থেকে ছয়টি সিগারেট কিনেছিলেন নিহত আলিফ। দোকানের কাঠের টেবিলে বসে একটি সিগারেট শেষ করার পর তিনি পাশেই নিজের শ্বশুরবাড়ির দিকে চলে যান।
গত প্রায় দুই বছর ধরে তিনি অনেকটা স্থায়ীভাবেই ওই শ্বশুরবাড়িতে বসবাস করছিলেন এবং দোকান থেকে যাওয়ার সময় ভুলবশত নিজের ব্যবহৃত মুঠোফোনটি টেবিলেই ফেলে যান।
এর কিছুক্ষণ পর দোকানে অন্য দুজন ক্রেতা আসেন সিগারেট কিনতে, যাদের একজনের পরনে ছিল লুঙ্গি এবং অন্যজনের গায়ে ছিল থ্রি-কোয়ার্টার প্যান্ট।
কিছুক্ষণ বিরতির পর আলিফ আবার দোকানে ফিরে এসে নিজের ফেলে যাওয়া মুঠোফোনটি নিয়ে পুনরায় শ্বশুরবাড়ির উদ্দেশে রওনা হন।
দোকান থেকে তাঁর বের হওয়ার ঠিক পরপরই বাইরে থেকে কয়েকটি গুলির বিকট শব্দ ভেসে আসে বলে জানান দোকানদার রবিন।
গুলি চালানোর ওই শব্দের মুহূর্তে রবিন নিজের চায়ের কাপগুলো ধোয়ামোছার কাজ করছিলেন এবং বাইরে তাকিয়ে দেখতে পান আলিফ মাটিতে লুটিয়ে পড়েছেন।
মাটিতে পড়ে থাকা আলিফের কাছাকাছিই সেই সন্দেহভাজন দুজনকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেন রবিন এবং ভয়ের চোটে তিনি দ্রুত দোকানের ভেতরের অংশে নিজের বাসার ভেতর গিয়ে লুকিয়ে পড়েন।
পরে রবিনের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল যে তিনি ওই হামলাকারী দুজনকে আগে থেকেই চিনতেন কি না, যার জবাবে তিনি জানান তাঁদের আগে কখনো দেখেননি।
আলিফের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে দেখা করতে দেশের নানা প্রান্ত থেকে লোকজনের আগমন ঘটত এবং তাঁরা এই দোকানেই এসে বসতেন, তবুও এই খুনী দুised ব্যক্তিকে তিনি কখনো দেখেননি।
নিহত সাংবাদিক আলিফের মূল বাড়ি নেত্রকোনা জেলার কলমাকান্দা উপজেলার পোগলা ইউনিয়নের সুনই গ্রামে এবং তাঁর শ্বশুরবাড়ি দুর্গাপুর উপজেলার বিরিশিরি ইউনিয়নের তেলুনঞ্জিয়া গ্রামে।
জীবনের এক পর্যায়ে তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনী থেকে অবসর গ্রহণ করেছিলেন এবং পেশাগতভাবে আইপি টেলিভিশন চ্যানেল রূপসী বাংলার নেত্রকোনা প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করতেন।
সাংবাদিকতার পাশাপাশি তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ নামের একটি ফেসবুক পেজ পরিচালনা করতেন ও নিয়মিত তথ্য প্রকাশ করতেন।
সীমান্তবর্তী এলাকার চোরাচালান, মাদক ব্যবসা, অবৈধ অস্ত্র এবং নানা স্থানীয় অন্যায়-অনিয়ম নিয়ে তিনি সংবাদ ও তথ্য তুলে ধরতেন।
তাঁর প্রকাশিত ছবি ও ভিডিওর কারণে এর আগেও তাঁকে দুবার হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিল বলে পুলিশ ও তাঁর পরিবার নিশ্চিত করেছে।
প্রাণ হারানোর ভয়ে তিনি মূলত শ্বশুরবাড়িতেই অবস্থান করতেন এবং শেষ পর্যন্ত সেখানে গিয়েই সন্ত্রাসীরা তাঁকে নির্মমভাবে হত্যা করে।
নিহত আলিফের মাথা, গলা ও বুক লক্ষ্য করে মোট ছয়টি গুলি করা হয়েছিল, যা তাঁর শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত হানে।
এই হত্যাকা্ধের পরদিন নিহতের স্ত্রী খাদিজা আক্তার বাদী হয়ে থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন, যেখানে সাত থেকে আটজন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে আসামি করা হয়।
পুলিশের তদন্তে জানা গেছে, এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সন্দেহের তালিকার একেবারে শীর্ষে রয়েছেন তাজুল ইসলাম এবং শামীম আহমেদ ওরফে ‘শুটার শামীম’।
সীমান্তের এই অবৈধ ব্যবসায় এই দুই অভিযুক্তের আলাদা আলাদা সহযোগী দল রয়েছে এবং প্রয়োজনে তাঁরা একসঙ্গেও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে থাকেন।
আলিফকে হত্যার পরিকল্পনা, এর জন্য অর্থায়ন করা এবং সরাসরি হামলাকারীদের সঙ্গে তাঁদের কোনো যোগাযোগ ছিল কি না, তা পুলিশ খতিয়ে দেখছে।
দোকান থেকে আলিফের শ্বশুরবাড়ির দূরত্ব আনুমানিক তিন শ গজ হবে, আর সেখানে গিয়ে দেখা যায় তিনি একটি টিনের বেড়ার ঝুপড়ি ঘরে বসবাস করতেন।
সেই ছোট্ট ঘরটিতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা পুরোনো আসবাবপত্রের মধ্যে তাঁর এক জোড়া নীল রঙের কেডস পড়ে রয়েছে, যা দীর্ঘ ব্যবহারের কারণে সম্পূর্ণ বিবর্ণ হয়ে গেছে।
পাশাপাশি তাঁর কিছু শার্ট, ডেনিম বা জিনস প্যান্ট এবং একটি ব্লেজারও সেখানে ঝুলে আছে, যেগুলোর রঙও বহুদিনের ব্যবহারে অনেকটাই ফিকে হয়ে গেছে।
নিহতের স্ত্রীর নাম খাদিজা আক্তার, যিনি মূলত গারো সম্প্রদায়ের মানুষ এবং আলিফের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কের জেরে বিয়ের সময় ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন।
বয়ের আগে তাঁর বাবা-মায়ের দেওয়া নাম ছিল আনন্দিতা সাংমা, যিনি বর্তমানে এই শোকের মুহূর্তেও স্বামীর স্মৃতি আঁকড়ে ধরে আছেন।
যে ঝুপড়ি ঘরে আলিফ তাঁর স্ত্রী ও দুই শিশুসন্তানকে নিয়ে বসবাস করতেন, ঘটনার দিন সেখানেই উপস্থিত ছিলেন তাঁর স্ত্রী খাদিজা।
প্রথম আলোকে দেওয়া বক্তব্যে তিনি জানান, প্রথমে তিনি বুঝতেই পারেননি যে এগুলো গুলির শব্দ ছিল, বরং পটকা ফোটার শব্দ বলে মনে করেছিলেন।
এক প্রতিবেশীর কাছ থেকে আলিফকে গুলি করার খবর শুনে তিনি দ্রুত দৌড়ে ঘটনাস্থলের দিকে ছুটে যান।
কাছে গিয়ে তিনি আলিফের নিথর মাথা নিজের কোলে তুলে নেন এবং তাঁর শরীরে কোনো হৃৎস্পন্দন বা প্রাণের লক্ষণ আছে কি না তা পরীক্ষা করে দেখেন।
যেহেতু তিনি নার্সিং বিষয়ে পড়াশোনা করেছিলেন, তাই স্পর্শ করেই বুঝতে পেরেছিলেন যে তাঁর স্বামী আর বেঁচে নেই।
স্বামীর মরদেহের পাশে এভাবেই তিনি দীর্ঘ সময় বসে ছিলেন এবং এর কিছু সময় পর পুলিশ সেখানে এসে পৌঁছায়।
কথা বলার সময় বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন খাদিজা এবং জানান যে আগামী মাস অর্থাৎ নভেম্বরেই তাঁদের ঢাকায় চলে যাওয়ার কথা ছিল।
ঢাকার এই যাত্রার প্রস্তুতির জন্য তাঁর মা স্থানীয়ভাবে চল্লিশ হাজার টাকা ঋণও করেছিলেন, কিন্তু তার আগেই আলিফ চিরকালের মতো চলে গেলেন।
কলমাকান্দা ও দুর্গাপুর হলো নেত্রকোনা জেলার পাশাপাশি অবস্থিত দুটি উপজেলা, যেগুলোর সীমানা গিয়ে ঠেকেছে ভারতের মেঘালয় সীমান্তে।
এই দুই উপজেলার সীমান্ত দিয়ে নিয়মিতভাবে মাদক, চিনি, প্রসাধন সামগ্রী, কম্বল, গরু, যন্ত্রাংশ এবং আগ্নেয়াস্ত্রের মতো নানা অবৈধ পণ্যের চোরাচালান হয়ে থাকে।
পুলিশ ও স্থানীয় বিভিন্ন সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, দুর্গাপুর উপজেলার সীমান্তবর্তী একটি নির্দিষ্ট অংশের চোরাচালানের পুরো নিয়ন্ত্রণ থাকে শামীম আহমেদের হাতে।
অন্যদিকে আরেকটি শক্তিশালী সন্ত্রাসী বাহিনী পরিচালনা করেন তাজুল, যাঁদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি থেকে শুরু করে নানা অপরাধ ও চোরাচালানের অভিযোগ রয়েছে।
অভিযুক্ত শামীম ও তাজুলের বিরুদ্ধে হত্যা, হত্যাচেষ্টা, অস্ত্র আইন লঙ্ঘন, মাদক ব্যবসা, বিস্ফোরক উদ্ধার, অপহরণ, চাঁদাবাজি, ডাকাতি ও চুরির মতো বহু অপরাধের মামলা রয়েছে।
এর মধ্যে শুধু শামীমের বিরুদ্ধেই বিভিন্ন সময়ে অন্তত ২৫টি মামলার তথ্য পাওয়া গেছে, যেগুলো ২০১৪ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে দুর্গাপুর থানায় দায়ের হয়েছিল।
এই মামলাগুলোর মধ্যে ১১টিতেই সরাসরি হত্যাচেষ্টার গুরুতর ধারা সংযুক্ত রয়েছে এবং বর্তমানেও তাঁর বিরুদ্ধে ১৯টি মামলা চলমান অবস্থায় আছে।
শামীমের বিরুদ্ধে অন্তত দুটি সুনির্দিষ্ট হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে, যার মধ্যে ২০২২ সালের ৮ অক্টোবর নিহত হওয়া ইউপি চেয়ারম্যান সুব্রত সাংমা হত্যা মামলা অন্যতম।
নিহত সুব্রত সাংমার বোন বাদী হয়ে সেই মামলায় শামীমকে প্রধান আসামি করেছিলেন এবং ২০২৪ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি মজিবুর রহমান হত্যা মামলাতেও তাঁকে প্রধান আসামি করা হয়।
অন্যদিকে তাজুল ইসলামের বিরুদ্ধেও অন্তত ১৩টি মামলার সন্ধান পাওয়া গেছে, যার ১০টিই রয়েছে দুর্গাপুর থানায় দায়ের করা।
বাকিগুলোর মধ্যে কলমাকান্দা, নেত্রকোনা সদর এবং ঢাকার দারুস সালাম থানায় একটি করে মামলা নথিভুক্ত রয়েছে তাঁর নামে।
২০০৬ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে দায়ের হওয়া এসব মামলার মধ্যে তিনটিতে হত্যাচেষ্টা এবং চারটিতে অস্ত্র আইনের ধারা রয়েছে।
সাংবাদিক আলিফ তাঁর বিভিন্ন প্রতিবেদনে বিভিন্ন সময়ে এই শামীম ও তাজুলের অপরাধ কর্মকাণ্ড তুলে ধরেছিলেন।
আলিফকে ব্যক্তিগতভাবে চেনেন ও তাঁর কাজের ধারা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল অন্তত পাঁচজন ব্যক্তি জানিয়েছেন যে অপরাধ প্রকাশে তাঁর দারুণ একরোখা স্বভাব ছিল।
কেউ যদি তাঁকে হুমকি দিতো বা কোনো প্রকার চাপ প্রয়োগ করতে চাইত, তবে তিনি নিজের প্রকাশিত পোস্ট বা সংবাদ সরাতে রাজি হতেন না।
তাঁর লেখার সবচেয়ে বড় এবং কার্যকর মাধ্যম ছিল তাঁর নিজস্ব ফেসবুক পেজটি, যার মাধ্যমে তিনি দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হতেন।
তথ্য সংগ্রহের জন্য তিনি অপরাধের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ব্যক্তিদের খুব কাছাকাছি চলে যেতেন বলে তাঁর স্ত্রী খাদিজা উল্লেখ করেছেন।
সীমান্ত দিয়ে কী ধরনের অবৈধ পণ্য আসছে, কীভাবে তা প্রবেশ করছে এবং কারা এর মূল নিয়ন্ত্রক—তা জানতে তিনি চোরাকারবারিদের সঙ্গে মিশে যেতেন।
এমনকি তথ্যের গভীরে পৌঁছাতে তিনি সাধারণ শ্রমিকের বেশ ধারণ করেও বিভিন্ন স্থানে কাজ করেছেন।
দুর্গাপুর ও কলমাকান্দার বিভিন্ন নদী থেকে যারা অবৈধভাবে বালু ও পাথর উত্তোলন করত, তাদের নামও তিনি বিভিন্ন সময় সাহসিকতার সঙ্গে প্রকাশ করেছিলেন।
খাদিজা আরও জানান, একবার তাজুলের চোরাচালান ও অবৈধ অস্ত্রের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কিছু তথ্য পেয়ে আলিফ তা সরাসরি র্যাবকে সরবরাহ করেছিলেন।
সেই তথ্যের ভিত্তিতেই প্রায় চার বছর আগে র্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন এই তাজুল।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।