
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
আর্থিক প্রতিষ্ঠানে কোনো রকম ব্যর্থতা দেখা দিলে তার সবচেয়ে বড় শিকার হবেন সাধারণ আমানতকারীরাই। এই বাস্তবতার কথা তুলে ধরে দেশের ব্যাংকিং খাতের ওপর কড়া নজরদারি ও সঠিক তদারকি বজায় রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংককে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি)।
ব্যাংক খাতের নানা অনিয়মের চিত্র টেনে তিনি জানান, বেশি লাভের লোভ দেখিয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে টাকা আমানত হিসেবে নেওয়ার পর ব্যাংকগুলো কোনো বিপদে পড়লে তার দায় শেষ পর্যন্ত গ্রাহকদেরই বহন করতে হয়। ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকে নিজেরও টাকা রাখার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা রয়েছে বলে জানান তিনি। শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিংয়ের সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে অতিরিক্ত মুনাফার আশ্বাসে প্রচুর অর্থ এনে ব্যাংকটি শেষ পর্যন্ত গভীর সংকটে পড়েছে বলে মন্তব্য করেন আইজিপি।
দেশের ব্যাংক ও আর্থিক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে নৈতিকতা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং সঠিক তদারকির ওপর বিশেষ জোর দেওয়া দরকার বলে তিনি মনে করেন। তিনি পরিষ্কার ভাষায় জানান, শুধু কিছু নিয়ম বানানোর মধ্যেই কাজের শেষ নেই, বরং সেই নিয়মগুলোকে বাস্তবে নিখুঁতভাবে প্রয়োগ করতে হবে। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ এবং গ্রাহক—উভয় পক্ষকেই নিজ নিজ নৈতিক অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
আইজিপি আরও যোগ করেন যে, শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিংয়ের আসল দর্শন ও মূলনীতি সবাইকে সঠিকভাবে অনুধাবন করতে হবে। একই সঙ্গে লাভ-লোকসানের অংশীদারত্ব, কোনো খাতে বিনিয়োগের আগে তার লাভজনকতা যাচাই এবং গ্রাহকের ঋণ পরিশোধের ক্ষমতা বিচার-বিশ্লেষণ করেই কেবল ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করা উচিত।
বর্তমানে ব্যাংকিং খাতে চলা নানা অনিয়ম এবং বিপুল পরিমাণ ঋণখেলাপির কারণে পুরো আর্থিক খাতই বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়েছে বলে তিনি জানান। এর নেতিবাচক প্রভাব ব্যাংকে কর্মরত সাধারণ কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের চাকরির ওপরও সরাসরি পড়ছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। তাই যেকোনো জায়গায় টাকা খাটানোর আগে খরচ ও প্রাপ্তির হিসাব কষে দেখা এবং সামনের দিনে কী ধরনের ঝুঁকি থাকতে পারে, তা আগে থেকেই ভেবে নেওয়া জরুরি।
দেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো রাখা, মাদকের বিস্তার রোধ করা এবং সমাজে শান্তি বজায় রাখতে সব মহলের আন্তরিক সহযোগিতা কামনা করেছেন আইজিপি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কলকারখানা কিংবা শ্রমিকদের নানাবিধ জটিল পরিস্থিতির সময় পুলিশ বাহিনীকে নানা দায়িত্ব সামলাতে হয় বলে তিনি মনে করিয়ে দেন। এসব সংবেদনশীল ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষেরই যথেষ্ট দায়িত্বশীল আচরণ করা উচিত বলে তিনি মন্তব্য করেন।
পুলিশ বাহিনীকে তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে যেমন দেশের প্রচলিত আইন ও সংবিধানের প্রতি অনুগত থাকতে হবে, ঠিক তেমনি সাধারণ নাগরিকদেরও আইনের প্রতি যথাযথ সম্মান দেখাতে হবে বলে তিনি জানান। স্বাধীনতার মানে যা খুশি তাই করার অবাধ স্বাধীনতা নয়, বরং একটি সমাজে শান্তিতে বসবাস করতে হলে সবাইকে আইন ও নৈতিকতার বাঁধন মেনে চলতে হবে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সন্তোষজনক না থাকলে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও সামগ্রিক সমৃদ্ধি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয় বলে তিনি সতর্ক করেন। তাই একটি শান্তিময় বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পুলিশসহ সমাজের সব পেশার মানুষের আপ্রাণ চেষ্টা ও যৌথ উদ্যোগ একান্তভাবে প্রয়োজন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো ধরনের অসত্য তথ্য বা গুজব ছড়ানো থেকে সবাইকে দূরে থাকার অনুরোধ জানিয়ে আইজিপি বলেন, রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে নানা অনুমান করা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাজ নয়। পুলিশ কেবল আইন ও সংবিধানের বিধান মেনেই তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করে থাকে। পুলিশের কাজের সঠিক মূল্যায়ন করতে হলে বাস্তব ঘটনাগুলো মাথায় রাখতে হবে এবং বাহিনীর কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অপরাধের অভিযোগ উঠলে তার জবাবদিহির বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে।
সূত্র: আজকের পত্রিকা