
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
সৌদি আরবের সরকারি পেট্রোলিয়াম প্রতিষ্ঠান সৌদি আরামকো সিঙ্গাপুরের জ্বালানি বাজার কর্তৃপক্ষ এবং জেটিসি করপোরেশনের যৌথ উদ্যোগে একটি নতুন সমঝোতা চুক্তি সম্পন্ন করতে চলেছে। সোমবার এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার কথা রয়েছে এবং আগামী কয়েক মাসের ভেতরেই এই অংশীদারত্ব সংক্রান্ত সমস্ত রূপরেখা চূড়ান্ত করার পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে।
একটি বিশেষ ভিডিও বার্তার মাধ্যমে সৌদি আরবের জ্বালানিমন্ত্রী প্রিন্স আবদুলআজিজ বিন সালমান আল-সৌদ উল্লেখ করেন যে, এশিয়ার প্রধান বাজারগুলোর কাছাকাছি জ্বালানি পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হলে গোটা অঞ্চলের সরবরাহ ব্যবস্থার গতিশীলতা বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। এর ফলে সিঙ্গাপুরের নিজস্ব জ্বালানি নিরাপত্তা এবং যেকোনো ধরনের অপ্রত্যাশিত সংকট মোকাবেলার সামরিক বা বেসামরিক প্রস্তুতি বহুলাংশে শক্তিশালী হয়ে উঠবে।
সিঙ্গাপুরের জুরং দ্বীপের ভূগর্ভে অবস্থিত জুরং রক ক্যাভার্ন হলো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সর্ববৃহৎ ভূগর্ভস্থ বাণিজ্যিক তরল জ্বালানি ও পেট্রোকেমিক্যাল সংরক্ষণের বিশাল ভাণ্ডার। ভূপ্রকৃতির গভীরে পাথুরে শিলা কেটে কৃত্রিম উপায়ে তৈরি এই প্রকাণ্ড গুহাটি অপরিশোধিত তেল ও বহুমুখী জ্বালানি সংরক্ষণের এক অনন্য প্রকৌশল নিদর্শন।
মাটির প্রায় ১৫০ মিটার বা ৪৯২ ফুট গভীরে নির্মিত এই ভূগর্ভস্থ গুহায় মোট ১৪ লাখ ৭০ হাজার ঘনমিটার তরল হাইড্রোকার্বন সংরক্ষণ করা সম্ভব। অপরিশোধিত জ্বালানি তেল এবং কনডেনসেট জাতীয় দাহ্য পদার্থ সংরক্ষণের জন্য নির্ধারিত এই বিশেষ অবকাঠামোর সর্বমোট ধারণক্ষমতা প্রায় ৯০ লাখ ব্যারেল পর্যন্ত পৌঁছেছে।
বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের এই শীর্ষ তেল উৎপাদক প্রতিষ্ঠানটি পূর্ব এশিয়ার দেশ জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়ায় তাদের অপরিশোধিত জ্বালানি তেল মজুদ করে আসছে। বিশ্ববাজারে হঠাৎ করে জ্বালানির কোনো ঘাটতি দেখা দিলে এই নির্দিষ্ট মজুতাগার থেকে তেল সংগ্রহের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রগুলোর সরকারগুলো বিশেষ অগ্রাধিকার পেয়ে থাকে।
জাপানের ওকিনাওয়ায় অবস্থিত তেল সংরক্ষণের সুবিধাদি ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে সম্প্রসারণ করে এর ধারণক্ষমতা ৮২ লাখ ব্যারেলে উন্নীত করা হয়েছিল। জাপানি কর্তৃপক্ষের সরকারি ওয়েবসাইটে প্রকাশিত বিবরণ অনুযায়ী, দেশটির জ্বালানি সংস্থা জোগমেকের সঙ্গে সম্পাদিত দ্বিপক্ষীয় চুক্তির মাধ্যমেই এই সংরক্ষণ ক্ষমতা বৃদ্ধি করা সম্ভব হয়েছিল।
পরবর্তীতে ২০২৩ সালের দিকে দক্ষিণ কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় জ্বালানি সংস্থা কোরিয়া ন্যাশনাল অয়েল করপোরেশনের সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি স্বাক্ষর করে সৌদি আরামকো। সেই চুক্তির শর্তানুযায়ী, দক্ষিণ কোরিয়ার উলসান বন্দর এলাকার সংরক্ষণাগারে আগামী পাঁচ বছরের দীর্ঘ মেয়াদে ৫৩ লাখ ব্যারেল তেল জমা রাখা হবে।
অন্যদিকে, পুরো এশিয়া মহাদেশ জুড়েই অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের মজুত ভাণ্ডার আরও সমৃদ্ধ করার লক্ষ্যে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ধারাবাহিক আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে জাপান। দেশটির শীর্ষ নেতা সানায়ে তাকাইচি চলতি বছরের সূচনালগ্নে পাওয়ার এশিয়া নামক একটি নতুন আঞ্চলিক সহযোগিতামূলক উদ্যোগের আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পেশ করেছিলেন।
পাওয়ার এশিয়া নামক এই উচ্চাভিলাষী উদ্যোগের আওতায় সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে সহযোগিতার জন্য ১০ বিলিয়ন বা ১ হাজার কোটি মার্কিন ডলার সমপরিমাণ আর্থিক সহায়তার তহবিল বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
ইতিমধ্যেই চীন, জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়ার মতো পরাশক্তি দেশগুলো নিজেদের উদ্যোগে বিশাল পরিমাণের জ্বালানি তেল সংরক্ষণ করে সুরক্ষিত অবস্থান তৈরি করেছে। তবে এর বিপরীতে এশিয়ার অন্যান্য অধিকাংশ দেশের তেল মজুতের পরিমাণ এখনও বেশ সীমিত পর্যায়ে রয়েছে।
আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় যদি কোনো হঠাৎ বিপর্যয় বা বিঘ্ন ঘটে, তবে এই দেশগুলোর পক্ষে তীব্র জ্বালানি সংকট সাফল্যের সঙ্গে মোকাবেলা করার সামর্থ্য অনেকটাই সীমিত বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সূত্র: আজকের পত্রিকা