
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
কৃষি খাতে সারের ডিলার নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের অনিয়ম এবং নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অতিরিক্ত অর্থে সার বিক্রির জোরালো অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত একটি সংসদীয় কমিটির বৈঠকে। উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলাসহ নওগাঁ অঞ্চলে অসাধু চক্রের মাধ্যমে সুকৌশলে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে চড়া মূল্যে সার বিক্রির অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে বলে বৈঠকে আলোকপাত করা হয়। এই ধরনের জনদুর্ভোগ সৃষ্টিকারী অনিয়ম কঠোর হাতে দমনের লক্ষ্যে যমুনা সেতু পারাপারের পর বিশেষ চেকপোস্ট স্থাপন করে সারের বহনকারী গাড়িগুলোর ওপর নিবিড় তদারকি বজায় রাখার অত্যন্ত সময়োপযোগী একটি প্রস্তাব তুলে ধরেন কমিটির একজন সম্মানিত সদস্য।
উত্থাপিত অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করে দ্রুততার সঙ্গে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণের বিষয়ে সংসদীয় কমিটিতে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে এবং কৃষি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে যে তারা পুরো বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে। কোনো ডিলার বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে আনীত অনিয়মের অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে তাদের ডিলারশিপ বা লাইসেন্স বাতিল করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।
বৈঠক সমাপ্তির পর সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে সংসদীয় কমিটির সভাপতি শাহাদাত হোসেন সেলিম জানান যে, যেসব জনপদ বা অঞ্চলে ডিলার পদায়ন নিয়ে অনিয়মের সুস্পষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেছে, সেসব স্থানে নতুন ডিলার নিয়োগের কার্যক্রম স্থগিত রাখতে বিশেষভাবে বলা হয়েছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের তরফ থেকে আগামী তিন মাসের নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সমস্ত অভিযোগ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়েছে এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে অভিযুক্তদের চিরতরে বাদ দেওয়া হবে।
শাহাদাত হোসেন সেলিম আরও উল্লেখ করেন যে, ডিলার নিয়োগের ক্ষেত্রে কৃষি মন্ত্রণালয় কেবল নামমাত্র পোস্ট অফিসের মতো দায়িত্ব পালন করেছে এবং মূল নিয়োগগুলো সম্পন্ন করেছেন স্ব স্ব জেলার জেলা প্রশাসকরা (ডিসি)। কমিটির সুদৃঢ় অভিমত হলো, মন্ত্রণালয় যদি নিজেরা কাগজপত্র যাচাই-বাছাই বা তদারকি না-ই করবে, তবে এই দপ্তরের অস্তিত্ব রাখার যৌক্তিকতা কোথায়? যদি সব ক্ষমতা ডিসিদের হাতেই থাকে, তবে মন্ত্রণালয়কে বাদ দিয়ে সরাসরি ডিসিদের মাধ্যমেই এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা যেত।
সংসদ সচিবালয় থেকে সংবাদমাধ্যমে পাঠানো একটি আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানানো হয়েছে যে, সার সরবরাহকারী ডিলারদের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম ও নানা অসংগতি পরিলক্ষিত হওয়া অঞ্চলগুলোতে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের জোরালো সুপারিশ করেছে কমিটি। যেসব অঞ্চলে এখনো ডিলারশিপের আনুষ্ঠানিক চুক্তিপত্র স্বাক্ষরিত হয়নি, সেসব স্থানে সমস্ত অভিযোগের সন্তোষজনক নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত নতুন করে কোনো চুক্তি সম্পাদন না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
যেসব এলাকায় ইতোমধ্যেই ডিলারদের সঙ্গে চুক্তি সম্পাদিত হয়ে গেছে, সেসব অঞ্চলের অনিয়মের অভিযোগগুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে তাৎক্ষণিক আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করেছে সংসদীয় কমিটি। বিশেষ করে লালমনিরহাট, বরগুনা, সাতক্ষীরা, ফরিদপুর, নওগাঁ এবং যশোর জেলার ডিলার নিয়োগে সংঘটিত অনিয়মের অভিযোগগুলোকে সর্বাধিক অগ্রাধিকার দিয়ে খতিয়ে দেখে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
চলমান সারের সুষ্ঠু বিতরণ ব্যবস্থা, সঠিক মজুত পরিস্থিতি এবং সার্বিক ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম নিবিড়ভাবে তদারকি করার উদ্দেশ্যে একটি সরেজমিন পরিদর্শন কমিটি গঠন করা হয়েছে। সারের অবৈধ মজুতকরণ, কালোবাজারি ও অন্যান্য শৃঙ্খলাবহির্ভূত কর্মকাণ্ড সশরীরে পরিদর্শন করে মূল সমস্যাগুলো চিহ্নিত করার পাশাপাশি তা চিরতরে নিরসনের জন্য সুনির্দিষ্ট কিছু সুপারিশ প্রণয়ন করবে এই তদন্ত দল।
সংসদ সদস্য মো. মোস্তাফিজুর রহমানের সুনির্দিষ্ট একটি প্রস্তাবের ওপর ভিত্তি করে গঠিত তিন সদস্যবিশিষ্ট এই বিশেষ কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন মোস্তফিজুর রহমান নিজেই। এছাড়া এই তদন্ত দলে সদস্য হিসেবে যুক্ত করা হয়েছে রোকন উদ্দীন বাবুল এবং সাবিরা সুলতানাকে। তবে বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে, সারের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল খাতের এই তদন্ত কমিটিতে বিরোধী দলের কোনো সংসদ সদস্যকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
সূত্র: আজকের পত্রিকা