
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
একটি উপকূলসংলগ্ন ছোট শহর, ক্ষুব্ধ মহাসাগর, পানির নিচের অজানা ভীতি আর স্বজনদের রক্ষার নিরন্তর তাগিদ—এই পটভূমিতে নির্মিত কানাডার সিরিজ ‘বিলো’ নেটফ্লিক্সে গত আটই অক্টোবর প্রদর্শিত হওয়ার পর থেকেই বিশ্বজুড়ে নজর কেড়েছে। আমাদের দেশেও অনলাইন স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের জনপ্রিয়তার তালিকায় এটি সবার ওপরে অবস্থান করছে।
শুধু আমাদের দেশেই নয়, বিশ্বব্যাপী এই পরিবেশনাটির সাফল্য বিশেষভাবে লক্ষণীয়। স্ট্রিমিং মাধ্যমটির প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, প্রথম সপ্তাহে বিশ্বমঞ্চে ১ কোটি ৭০ লাখ দর্শকসংখ্যা নিয়ে ইংরেজি ভাষার পরিবেশনাগুলোর মধ্যে এটি শীর্ষ স্থান দখল করে। পরবর্তীতে দ্বিতীয় সপ্তাহে দর্শকসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে ২ কোটি ১২ লাখে উন্নীত হয়। স্ট্রিমিং মাধ্যমটির কোনো কানাডীয় সৃষ্টির ক্ষেত্রে এটি একটি অভূতপূর্ব রেকর্ড হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
তবে এই পরিবেশনাটিতে এমন কী বিষয় রয়েছে, যার আকর্ষণে মানুষ পর্দার সামনে সময় কাটাচ্ছে? কেবল সাগরের কোনো দানবের বিবরণ, নাকি এর অন্তরালে পরিবার, আয়ের সংকট, বিচ্ছিন্ন এলাকার জীবন এবং পরিবর্তনের সঙ্গে টিকে থাকার কঠিন লড়াইয়ের আরও গভীর কোনো সত্য প্রকাশ পেয়েছে?
মাছ ধরার ছোট একটি জনপদে ছয় খণ্ডের এই রহস্যমূলক পরিবেশনার মূল কেন্দ্রে রয়েছে ক্যালভিন পেনি নামক চরিত্রটি। এই ভূমিকায় রূপদান করেছেন হলিউডের জনপ্রিয় শিল্পী জশ হার্টনেট। কানাডার নিউফাউন্ডল্যান্ডের দূরবর্তী উপকূল এলাকার স্নুকস আর্ম জনপদের বাসিন্দা ক্যালভিন পেশায় একজন মৎস্যজীবী। ব্যক্তিগত জীবনে একের পর এক দুর্দশার মুখোমুখি হয়েছেন তিনি। অতীতের দিনে পিতার অস্বচ্ছ মৃত্যু তাঁকে নিয়মিত ভাবায়। নিজের পরিজনদের একত্রে রাখা এবং এলাকার মানুষের মাঝে নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করাও তাঁর জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।
এমন মুহূর্তে স্থানীয় সাগরে আত্মপ্রকাশ করে এক রহস্যময় প্রাণী। এই সত্তার উপস্থিতি কেবল মানবজীবনের জন্যই হুমকি সৃষ্টি করে না, বরং পুরো এলাকার ভবিষ্যৎকেও বিপন্ন করে তোলে। ক্যালভিনকে তখন একদিকে নিজের সন্তানসন্ততিদের রক্ষা করতে হয়, অন্যদিকে এলাকার মানুষের জীবন ও জীবিকা টিকিয়ে রাখার লড়াইয়ে অবতীর্ণ হতে হয়।
এই রহস্যের উন্মোচনে ক্যালভিনের পাশে এসে দাঁড়ান সামুদ্রিক প্রাণী বিষয়ের গবেষক ফন্ডা হাওয়ান্ডার। এই চরিত্রে অভিনয় করেছেন ম্যাকেঞ্জি ডেভিস। ক্যালভিনের পুত্র ওয়েডের চরিত্রে রয়েছেন ‘স্ট্রেঞ্জার থিংস’ খ্যাত চার্লি হিটন। অনুসন্ধান যত অগ্রসর হতে থাকে, ততই উন্মোচিত হতে থাকে জনপদটির অতীত ইতিহাস, পারিবারিক সম্পর্কের জটিলতা এবং সাগরের অতলে লুকিয়ে থাকা বিপদের নানা দিক।
শুধুমাত্র কোনো দানবের বিবরণ নয়, এখানে রয়েছে মানুষের বেঁচে থাকার কঠোর সংগ্রাম। ‘বিলো’র জনপ্রিয় হয়ে ওঠার অন্যতম প্রধান কারণ হলো এটি গতানুগতিক দানবভিত্তিক বর্ণনার ছক থেকে সম্পূর্ণ বেরিয়ে আসার প্রয়াস চালিয়েছে। এখানে রহস্যময় প্রাণীটি বড় কেন্দ্রবিন্দু হলেও বর্ণনার মূল অংশে রয়েছে মানবজীবন। যাঁদের জীবনযাত্রা ও পারিবারিক ঐতিহ্য সাগরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত, তাঁদের কাছে সাগরের এই বিপদ কোনো সাধারণ অজানা প্রাণীর আগ্রাসন নয়। এটি তাঁদের অস্তিত্বের এক গভীর সংকট।
শহরটির বাসিন্দারা এমনিতেই অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মুখে দিন কাটাচ্ছেন। সমুদ্র থেকে মৎস্য আহরণ হ্রাস পাচ্ছে, জীবিকার পথ দিন দিন সংকুচিত হয়ে আসছে। এর মধ্যে নিজেদের ভূমি ত্যাগ করে অন্যত্রে চলে যাওয়ার শর্তে আর্থিক ক্ষতিপূরণ গ্রহণ করা নিয়ে সাধারণ মানুষের ভেতর মতপার্থক্য সৃষ্টি হয়। কেউ কেউ নতুন জীবনের সম্ভাবনা দেখতে পান, আবার কেউ পূর্বপুরুষদের ভিটেমাটি ত্যাগ করতে নারাজ। এই মতবিরোধের মাঝেই হাজির হয় সাগরের অজানা আতঙ্ক।
ফলে পরিবেশনাটি থেকে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে চলে আসে। জীবনের নিরাপত্তা নাকি শিকড়ের প্রতি টান—কোনটিকে মানুষ বেশি গুরুত্ব দেবে? চরম বিপদের মুখে একটি ছোট জনপদ কীভাবে ঐক্যবদ্ধ থাকে? আর যে প্রকৃতির ওপর নির্ভর করে তাদের জীবনধারণ, সেই পরিবেশই যখন বিপজ্জনক হয়ে ওঠে, তখন তাদের সামনে কী বিকল্প খোলা থাকে?
পরিবেশনাটির স্রষ্টারা জলবায়ু পরিবর্তন, জীবিকার অনিশ্চয়তা এবং স্থানীয় সংস্কৃতির মতো গুরুতর বিষয়গুলোও গল্পের ভেতরে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। তবে সেগুলোকে আলাদা করে কোনো বক্তৃতার মতো উপস্থাপন না করে বরং রহস্য এবং পারিবারিক টানাপোড়েনের মাধ্যমেই ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছেন।
অজানা প্রাণীকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা রহস্যই পরিবেশনাটির মূল চালিকাশক্তি। এই প্রাণীটি কখন আক্রমণ চালাবে, তার আসল পরিচয় কী, আর জনপদটির সঙ্গে এর সম্পর্ক ঠিক কোথায়—এমন নানা প্রশ্ন দর্শককে পরবর্তী অংশ দেখতে দারুণভাবে উৎসাহিত করছে বলে মত প্রকাশ করেছেন বিশ্লেষকেরা। ক্যালভিন কোনো অপ্রতিরোধ্য নায়ক নন। অতীতের বেদনা, পারিবারিক দায়িত্ব এবং নিজের ব্যর্থতার অনুভূতি তাঁকে দুর্বল করে তোলে। তবুও ভালোবাসার মানুষগুলোকে বাঁচাতে তিনি লড়াই চালিয়ে যান। চরিত্রের এই মানবিক দিকটি দর্শকদের মনে গভীর সহানুভূতির সৃষ্টি করে।
পাথুরে উপকূল, ধূসর রঙের আকাশ, চারপাশের কুয়াশা, উত্তাল জলরাশি এবং বিচ্ছিন্ন জনপদ মিলে এক অস্বস্তিকর আবহ তৈরি করেছে। বিশাল নাগরিক পরিবেশ কিংবা আধুনিক প্রযুক্তির পরিবর্তে প্রকৃতির শক্তির কাছে সম্পূর্ণ অসহায় মানুষের লড়াই এই পরিবেশনাটিকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে। প্রাণীর আক্রমণ ছাড়াও বাবা ও পুত্রের সম্পর্ক, ভেঙে যাওয়া পরিবার, অতীতের শোক এবং বাসিন্দাদের পারস্পরিক অবিশ্বাস গল্পকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। ফলে কেবল ভৌতিক বা দানবীয় বিষয়ে আগ্রহী নন, এমন সাধারণ দর্শকদেরও উপভোগ করার মতো যথেষ্ট উপাদান এখানে রয়েছে। একাধিক দীর্ঘ মৌসুমের পরিবর্তে ছয় খণ্ডের সংক্ষিপ্ত পরিবেশনা হওয়ায় দর্শকেরা খুব কম সময়েই সম্পূর্ণ গল্পটি উপভোগ করতে পারছেন। প্রতি খণ্ডে নতুন নতুন রহস্য উন্মোচিত হওয়ার সুযোগও তৈরি হয়েছে।
অভিনয়ে জশ হার্টনেটের প্রত্যাবর্তন এই পরিবেশনাটির বৈশ্বিক জনপ্রিয়তার পেছনে পরিচিত শিল্পীদের উপস্থিতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। বিশেষ করে জশ হার্টনেটের অভিনয় দর্শকদের দারুণভাবে আকৃষ্ট করেছে।
অতীতে ‘পার্ল হারবার’, ‘ব্ল্যাক হক ডাউন’ এবং ‘পেনি ড্রেডফুল’-এর মতো কাজের জন্য পরিচিত এই শিল্পী সাম্প্রতিক বছরগুলোতেও বৈচিত্র্যময় চরিত্রে অভিনয় করে চলেছেন। ‘ওপেনহেইমার’ ও ‘ট্র্যাপ’-এর মতো চলচ্চিত্রে কাজ সম্পন্ন করার পর ‘বিলো’র মাধ্যমে তিনি এমন একটি চরিত্রে ফিরেছেন, যেখানে শারীরিক শক্তির চেয়ে মানসিক দৃঢ়তা অধিক প্রকাশ পায়। ক্যালভিনের চরিত্রের ভেতর একই সঙ্গে রয়েছে জেদ, অসহায়ত্ব, ক্ষোভ ও পরিজনদের প্রতি গভীর ভালোবাসা। নিজের জীবনের দুর্ভাগ্যকে একসময় ভাগ্যের লিখন বলে মেনে নেওয়া মানুষটি বড় সংকটের মুখে এসে নিজেই দায়িত্ব নিতে সচেষ্ট হন। চরিত্রটির এই পরিবর্তন চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তোলার সুযোগ পেয়েছেন এই অভিনেতা।
শিল্পীর নিজস্ব বক্তব্য অনুযায়ী, পরিবেশনাটির প্রথম দুটি খণ্ডের চিত্রনাট্য তিনি এক ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে পড়া শেষ করেছিলেন। গল্পের স্বকীয় ধরন এবং চরিত্রের প্রতি গভীর আকর্ষণই তাঁকে এই কাজের প্রতি টেনে এনেছিল। নিউফাউন্ডল্যান্ডের জেলের চরিত্রে পুরোপুরি বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠতে তাঁকে স্থানীয় কথ্যরীতিও রপ্ত করতে হয়েছে।
ফন্ডা হাওয়ান্ডার চরিত্রে ম্যাকেঞ্জি ডেভিস গল্পটির মাঝে যুক্ত করেছেন অনুসন্ধিৎসা এবং বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি। অন্যদিকে চার্লি হিটনের ওয়েড চরিত্রটি পারিবারিক সংকটের পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের ভেতরের গভীর উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তার দিকটিকে পরিষ্কার করে তোলে। ‘স্ট্রেঞ্জার থিংস’-এ অভিনয়ের সুবাদে এই তরুণ শিল্পী বিশ্বজুড়ে দর্শকদের কাছে আগে থেকেই পরিচিত ছিলেন।
নির্মাতা ও পরিচালনার দায়িত্বে যাঁরা যুক্ত ছিলেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন কানাডার চিত্রনাট্যকার জেসি ম্যাককিওন। এর আগে তিনি ‘দ্য আমব্রেলা একাডেমি’ এবং ‘১৯-২’ পরিবেশনার সঙ্গে লেখক হিসেবে কাজ করেছিলেন। নিউফাউন্ডল্যান্ডের প্রকৃতি, বিচ্ছিন্ন জনপদ এবং সেখানকার সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার প্রতি তাঁর দীর্ঘদিনের আগ্রহ থেকেই এ ধরনের গল্প রচনার ভাবনা মাথায় এসেছে।
পরিবেশনাটির পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন জেমি চাইল্ডস, হেলেন শেভার এবং স্টিফেন ডান। চাইল্ডস এর আগে ‘দ্য স্যান্ডম্যান’ ও ‘হিজ ডার্ক ম্যাটেরিয়ালস’-এর মতো কাজে যুক্ত ছিলেন। শেভারের কাজের ঝুলিতে রয়েছে ‘দ্য পেঙ্গুইন’ ও ‘স্টেশন ইলেভেন’। আর স্টিফেন ডান পরিচিত মুখ ‘ক্লসেট মনস্টার’ ও ‘কুইয়ার অ্যাজ ফোক’-এর সঙ্গে কাজের সুবাদে।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।