
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
রাজধানীর গুলশান ২ এলাকায় অবস্থিত ১০৪ নম্বর রোডের নতুন প্রতিষ্ঠিত গ্যালারি হামিদুজ্জামানে গত ২ অক্টোবর থেকে একটি জমজমাট শিল্পকর্ম প্রদর্শনী শুরু হয়েছে। এই নান্দনিক আয়োজনটি বাংলাদেশের শিল্পকলার বিভিন্ন প্রজন্ম, নানা প্রবণতা এবং ভিন্ন ভিন্ন সংবেদনের পারস্পরিক সম্পর্ক খুঁজে দেখার একটি উপযুক্ত উপলক্ষ তৈরি করেছে। প্রদর্শনীতে স্থান পাওয়া প্রতিটি শিল্পীর কাজে স্বতন্ত্র বৈচিত্র্য বিদ্যমান থাকলেও সামগ্রিকভাবে সেখানে প্রকৃতি ও পরম্পরার একটি নিবিড় সেতুবন্ধু অত্যন্ত স্পষ্টভাবেই লক্ষণীয়। শিল্পরসিকদের জন্য উন্মুক্ত থাকা এই প্রদর্শনীটি আগামী ১ নভেম্বর ২০২৬ তারিখ পর্যন্ত প্রতিদিন নির্ধারিত সময়ে দর্শনার্থীদের স্বাগত জানাবে।
প্রদর্শিত শিল্পকর্মগুলোর ক্যানভাসজুড়ে কোথাও ফুটে উঠেছে রং ও রেখার নান্দনিক বিমূর্ত বিন্যাস, কোথাও আবার দৃশ্যমান হয়েছে প্রকৃতির অত্যন্ত নিবিড় উপস্থিতি। কোনো কোনো শিল্পীর কাজে আবার মানব অবয়বের মধ্য দিয়েই অন্তর্লোকের গভীরে অনুসন্ধান চালানোর প্রবণতাও বেশ জোরালোভাবে প্রকাশ পেয়েছে। এভাবেই প্রদর্শনীতে ঠাঁই পাওয়া শিল্পকর্মগুলো বিভিন্ন আঙ্গিক এবং অভিব্যক্তির মাধ্যমে শিল্পের বহুমাত্রিক ভাষাকে অত্যন্ত সফলভাবে ফুটিয়ে তুলেছে। এগুলো কেবল বাহ্যিক দৃশ্যমান কোনো বাস্তবতার সাদামাটা অনুলিপি নয়, বরং প্রতিটি শিল্পীর নিজস্ব একান্ত অনুভব, জীবনবোধের উপলব্ধি এবং অন্তর্দৃষ্টির অত্যন্ত সৃজনশীল এক প্রকাশ হিসেবে ধরা দিয়েছে।
বিশিষ্ট শিল্পী বীরেন সোমের ‘আমার মনের লাল রং’ এবং আরেক শিল্পী শাহানুর মামুনের ‘একাত্তরের চেতনা’ শীর্ষক শিল্পকর্ম দুটির মধ্যে রং ব্যবহারের ক্ষেত্রে একটি চমৎকার ও লক্ষণীয় সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায়। দুই শিল্পীর মধ্যে প্রজন্মগত ব্যবধান থাকা সত্ত্বেও ক্যানভাসে রং লেপনের ক্ষেত্রে তাদের স্বাধীনতা, পৃষ্ঠতলের সক্রিয়তা এবং দৃশ্য নির্মাণের সাধারণ প্রবণতায় একধরনের মিল রয়েছে। বীরেন সোমের ক্যানভাসে লাল রং কেবল একটি সাধারণ বর্ণ হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তা শিল্পীর মানসিক অনুভবের বিশাল এক বিস্তারে পরিণত হয়। অন্যদিকে শাহানুর মামুনের ল্যান্ডস্কেপধর্মী রঙের স্তর ও সুনিপুণ প্রয়োগ দৃশ্যমান প্রকৃতিকে পুরোপুরি অতিক্রম করে দর্শকের জন্য আবেগের নিজস্ব এক নতুন পরিসর তৈরি করে তুলছে।
বাংলাদেশের সমৃদ্ধ চিত্রকলায় প্রকৃতি বরাবরই একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং অপরিহার্য অনুষঙ্গ হিসেবে নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছে। আমাদের দেশের নদী, জল, আকাশ, মেঘ, দিগন্ত ও ঋতুবৈচিত্র্য এখানকার শিল্পীদের মননে নানা মাত্রায় ও নানাভাবে গভীর ছাপ ফেলে চলেছে। সুজলা-সুফলা এবং শস্য-শ্যামলা বাংলার এই অপরূপ প্রকৃতি কখনো সরাসরি দৃশ্যপট হয়ে, আবার কখনোবা রং ও রেখার বিমূর্ত কোনো ইশারায় বারবার ক্যানভাসে ফিরে আসে। বর্তমান এই প্রদর্শনীতেও প্রকৃতিকে কেবল চোখে দেখা সাধারণ কোনো ভূদৃশ্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয়নি; বরং এর মাধ্যমে শিল্পীর নিজস্ব অন্তর্জগতের সঙ্গে প্রকৃতির এক নিবিড় ও গভীর সম্পর্ক গভীরভাবে অনুভব করা সম্ভব হচ্ছে।
শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ারের জলরঙের ল্যান্ডস্কেপগুলোতে প্রকৃতির এই অত্যন্ত অন্তরঙ্গ ও সুকুমার রূপটি বিশেষভাবে ধরা পড়েছে। তাঁর রঙের সংযম, জলরঙের নান্দনিক স্বচ্ছতা এবং দৃশ্য নির্মাণের দারুণ মুনশিয়ানা প্রকৃতিকে নিছক অনুকরণ করার প্রবণতায় সীমাবদ্ধ রাখেনি। বরং সেই সব দৃশ্যের মধ্যে একধরনের অপূর্ব নৈঃশব্দ্য ও অনুভবের গভীরতা অত্যন্ত চমৎকারভাবে তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে শিল্পী মনিরুল ইসলামের জলরঙের বিমূর্তধর্মী কাজগুলোও তাদের নিজস্ব স্বতন্ত্র শিল্প–সুষমায় অত্যন্ত উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। সেখানে রং এবং রেখা পরিচিত সমস্ত বস্তুর নির্ধারিত সীমা ছাড়িয়ে নিজের মতো করে অর্থ ও অনুভূতির একটি সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র জগৎ নির্মাণ করেছে।
রনজিৎ দাসের দিগন্তবিস্তৃত ল্যান্ডস্কেপের ক্যানভাসে বাংলাদেশের নদীমাতৃক অনন্য ভূপ্রকৃতির একটি সংক্ষিপ্ত অথচ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ রূপ অত্যন্ত সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে। বিস্তৃত পরিসর, দূরত্বের নিখুঁত অনুভব এবং ভূদৃশ্যের অসাধারণ বিন্যাস যেকোনো দর্শককে প্রকৃতির সঙ্গে এক ধরনের নীরব সংলাপে সরাসরি যুক্ত করে নেয়। এ ছাড়া শিল্পী আবদুল মান্নানের আকাশ, মেঘ ও জমিনের নান্দনিক বিন্যাসেও বাংলার চিরায়ত প্রকৃতির প্রতি এক গভীর অনুরাগ ও মমত্ববোধ লক্ষ্য করা যায়। শিল্পী রোকেয়া সুলতানা, কনক চাঁপা চাকমা ও আনিসুজ্জামানের শিল্পকাজেও প্রকৃতির নানা রূপ ও বহুরঙা উপস্থিতির কারণে প্রদর্শনীর সামগ্রিক দৃশ্যভাষা আরও অনেক বেশি সমৃদ্ধ ও বহুমাত্রিক রূপ লাভ করেছে।
তবে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, ‘বিয়ন্ড বাউন্ডারিজ’ শিরোনামের এই প্রদর্শনীটি কেবল প্রকৃতিনির্ভর কিছু নির্দিষ্ট শিল্পের প্রদর্শনীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। প্রকৃতির সঙ্গে এ অঞ্চলের দীর্ঘদিনের আধ্যাত্মিক সম্পর্ক, প্রতীকী ভাষা এবং প্রাচ্যশৈলীর যে গভীর যোগসূত্র রয়েছে, তার চমৎকার পরিচয় মেলে বেশ কয়েকটি শিল্পকর্মে। শিল্পী আবদুস সাত্তারের ‘বুদ্ধ’ প্রতিকৃতিতে বুদ্ধের শান্ত মুখাবয়ব, প্রশান্ত অভিব্যক্তি এবং অলংকরণের মধ্য দিয়ে একটি গভীর ধ্যানমগ্নতার আবহ তৈরি করা হয়েছে। সেখানে অবয়বের সৌন্দর্য কেবল দৃশ্যগত আনন্দের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, তার সঙ্গে অত্যন্ত সুন্দরভাবে যুক্ত হয়েছে অন্তরের নিখাদ প্রশান্তি ও এক উচ্চাঙ্গের আধ্যাত্মিক অনুভব।
শিল্পী আবদুস সাত্তারের শিল্পভাবনার প্রত্যক্ষ দীক্ষা লাভ করা শিল্পী আফরোজা জামিল কঙ্কার ‘আমাসের কথা’ শীর্ষক শিল্পকর্মে দ্বিমাত্রিক রং লেপনের মাধ্যমে নারী মুখাবয়বের নিজস্ব এক অনন্য প্রকাশ স্পষ্টভাবে লক্ষণীয়। অন্যদিকে শওকাতুজ্জামানের আঁকা মোরগের ছবিতে বিভিন্ন প্রাণীর অবয়বের মধ্য দিয়েই অভিব্যক্তির এক সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ভাষা তৈরি হয়েছে। সেখানে প্রতিটি পশুর চোখ, মুখ ও শরীরের দেহভঙ্গি নিছক জীবজগতের সাধারণ পরিচয়কে ছাড়িয়ে এক একটি জোরালো রূপক হয়ে ওঠার দারুণ সম্ভাবনা তৈরি করেছে। ঐতিহ্যিক ও আধুনিকতার এই মেলবন্ধন প্রদর্শনীটিকে শিল্পরসিকদের কাছে আরও অনেক বেশি আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
চিরাচরিত চিত্রকলার এই বিশাল আয়োজনের পাশাপাশি এবারের প্রদর্শনীতে ভাস্কর্যের জোরালো উপস্থিতি উপস্থিত সকল দর্শকের নান্দনিক অভিজ্ঞতাকে আরও বহুগুণ প্রসারিত করেছে। কাওসার হাসান টগর এবং আইভি জামানের নান্দনিক ভাস্কর্যগুলোতে দ্বিমাত্রিক ক্যানভাসের গণ্ডি পেরিয়ে ত্রিমাত্রিক রূপ, সুনির্দিষ্ট আয়তন এবং ত্রিমাত্রিক পরিসরের অনন্য আনন্দ সরাসরি অনুভব করা যায়। শিল্পমাধ্যমের এই নানাবিধ ভিন্নতা এই প্রদর্শনীর মূল নামের তাৎপর্যটাকেও যেন আরও অনেক বেশি স্পষ্ট করে তোলে। এর মাধ্যমে এটি প্রমাণিত হয় যে, প্রকৃত শিল্পের আসল প্রকাশ কোনো একটিমাত্র মাধ্যম কিংবা নির্দিষ্ট কোনো রীতির কঠোর কাঠামোর মধ্যে কখনোই আবদ্ধ থাকে না।
বর্তমান সময়ের বাংলাদেশের চিত্রকলার জগতের একটি অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য প্রবণতা হলো বাস্তব দৃশ্যের আলোকচিত্রনির্ভর উপস্থাপন এবং কারিগরি নিপুণতার ব্যাপক প্রদর্শন। অবশ্য বাস্তবতার খুব কাছাকাছি চলে যাওয়া কিংবা উচ্চমানের প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জন করা নিজে থেকে কোনো ধরনের সীমাবদ্ধতা নয়। কিন্তু শিল্পকর্ম যখন কেবল কোনো দৃশ্যের বিশ্বস্ত প্রতিরূপ বা ছবি নির্মাণ করার মধ্যেই পুরোপুরি থেমে যায়, তখন তার নিজস্ব অন্তর্লোক আবিষ্কার করার অমিত সম্ভাবনা অনেকটাই সংকুচিত হয়ে পড়তে পারে। ‘বিয়ন্ড বাউন্ডারিজ’ প্রদর্শনীতে নির্বাচিত কিছু নির্দিষ্ট কাজে রং, রেখার স্বতঃস্ফূর্ততা এবং বিমূর্ততার যে জোরালো উপস্থিতি দেখা গেছে, তা যেকোনো দর্শককে দৃশ্যজগতের বাইরে অনুভবের এক গভীর জগতে সহজেই প্রবেশের দারুণ সুযোগ করে দেয়।
উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, শিল্পী বিপাশা হায়াত, কাজী সহিত এবং কামাল উদ্দিনের শিল্পকর্মগুলোতে বাস্তবধর্মী উপাদান কিছুটা বিদ্যমান থাকলেও উপস্থাপনার নিজস্ব স্বাতন্ত্র্যের কারণে সেগুলো নিছক বাস্তবের গতানুগতিক প্রতিফলন হয়ে থাকেনি। বরং সেগুলো সম্পূর্ণ ভিন্ন এক ভাবার্থ ও গভীর ব্যঞ্জনায় অত্যন্ত সুন্দরভাবে সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছে। পরিশেষে বলা যায়, রাজধানীর গুলশান ২ এলাকায় ১০৪ নম্বর রোডে অবস্থিত নতুন এই গ্যালারি হামিদুজ্জামানে গত ২ অক্টোবর শুরু হওয়া এই নান্দনিক প্রদর্শনীটি বাংলাদেশের শিল্পকলার বিভিন্ন প্রজন্ম, নানা প্রবণতা এবং সংবেদনের পারস্পরিক সম্পর্ক নতুন করে উপলব্ধি করার এক অনন্য সুযোগ সৃষ্টি করেছে।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।