
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
আধুনিক কৃত্রিম হীরার ব্যবহার বৃদ্ধির এই ধারাটি চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান প্রযুক্তিগত লড়াইয়ে নতুন মাত্রা যোগ করতে সক্ষম। উন্নত সেমিকন্ডাক্টর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অবকাঠামোর তাপ ব্যবস্থাপনায় এই উপাদানের ভূমিকা বাড়লে, উৎপাদন খাতে বেইজিংয়ের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ ওয়াশিংটনের সরবরাহ শৃঙ্খলের জন্য কৌশলগত দুর্বলতা হিসেবে দেখা দিতে পারে।
বিখ্যাত পরামর্শক প্রতিষ্ঠান কেন রিসার্চের এনগেজমেন্ট ম্যানেজার মানন গোয়েঙ্কা এই প্রসঙ্গে মন্তব্য করেছেন যে, হীরা শিল্পের এই কাঠামোগত রূপান্তর সামগ্রিক পরিবর্তনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক। এর বৈশ্বিক প্রযুক্তি সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর সুদূরপ্রসারী ও সরাসরি প্রভাব রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
বিভিন্ন বাজার বিশ্লেষক ও সংশ্লিষ্ট শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মতে, উন্নত চিপ, তাপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং কোয়ান্টাম কম্পিউটিং প্রযুক্তির মতো ক্ষেত্রগুলোতে চাহিদা বৃদ্ধি পেলে কৃত্রিম হীরা ব্যবসার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হতে পারে। হীরার কিছু অনন্য ভৌত বৈশিষ্ট্য আধুনিক ইলেকট্রনিক্স ও কম্পিউটিং সরঞ্জামের কার্যকারিতা বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে। বিশেষ করে ভারী ও উচ্চক্ষমতার যন্ত্রপাতিতে অতিরিক্ত তাপ দ্রুত অপসারিত করতে এই উপাদান অত্যন্ত কার্যকরী ভূমিকা পালন করতে পারে।
কৃত্রিম হীরা শিল্পের এই রূপান্তর এমন এক সময়ে ঘটছে যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যাপক প্রসারের কারণে তথ্যকেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা বাড়ানোর তীব্র চাপ তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার বা আইইএ-এর প্রকাশিত ২০২৫ সালের একটি প্রতিবেদনে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে যে, আগামী দশকের শুরুতে অর্থাৎ ২০৩০ সালের মধ্যে এই ডেটা সেন্টারগুলোর বিদ্যুৎ খরচের পরিমাণ দ্বিগুণের চেয়েও বেশি বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ৯৪৫ টেরাওয়াট-ঘণ্টায় গিয়ে ঠেকবে।
বিশ্লেষকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানের এই বিশাল বিদ্যুৎ খরচের পরিমাণটি প্রায় সম্পূর্ণ জাপানের এক বছরের মোট বিদ্যুৎ ব্যবহারের সমপরিমাণ। মূলত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রযুক্তিগত ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ার কারণেই বিশ্বজুড়ে বিদ্যুতের এই অতিরিক্ত চাহিদার সৃষ্টি হয়েছে।
বাজার বিশেষজ্ঞদের অভিমত হলো, ইলেকট্রনিক্সের তাপ নিয়ন্ত্রণের কাজে কৃত্রিম হীরার বহুমুখী ব্যবহার খুব শীঘ্রই নিকট ভবিষ্যতে একটি বিশাল অর্থনৈতিক বাজার গড়ে তুলতে পারে। তবে চিপ বা অর্ধপরিবাহী উৎপাদনের মূল কাঁচামাল হিসেবে এই উপাদানের ব্যাপক বাণিজ্যিক ও সার্বজনীন ব্যবহার হতে এখনো বেশ কিছুটা সময় বাকি রয়েছে।
চিপ প্রস্তুতকারক শিল্পে ব্যবহারের জন্য হীরার কাঠামোগত বিশুদ্ধতা পরম মাত্রার হতে হয় এবং এর উৎপাদন প্রক্রিয়া ও মানদণ্ডও বেশ কঠোর হয়ে থাকে। এর বিপরীতে, ধাতব কাটা বা ড্রিলিংয়ের মতো সাধারণ কাজে যে ধরনের হীরা ব্যবহৃত হয়, সেগুলোর ক্ষেত্রে বিশুদ্ধতা ও উৎপাদন মানের শর্তগুলো তুলনামূলকভাবে অনেকটাই শিথিল থাকে।
বিশ্বের বেশ কিছু শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের ক্রমবর্ধমান আগ্রহ স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, আগামী দিনগুলোতে প্রসেসর এবং অন্যান্য ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতিতে কৃত্রিম হীরার চাহিদা আরও তীব্র আকার ধারণ করবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক কম্পিউটিংয়ের ব্যাপক বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে আধুনিক যন্ত্রপাতিগুলোতে তাপ উৎপাদনও বহুগুণ বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বিভিন্ন হার্ডওয়্যার ও সার্ভারের মূল কার্যক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী রাখতে উন্নত শীতলীকরণ বা কুলিং প্রযুক্তির ব্যবহার ও গুরুত্ব দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। চীনের স্থানীয় বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায় যে, প্রযুক্তি জায়ান্ট হুয়াওয়ে এবং তাইওয়ান সেমিকন্ডাক্টর ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি বা টিএসএমসি চিপ ঠান্ডা করার কাজে কৃত্রিম হীরার প্রয়োগ নিয়ে নানা ধরনের গবেষণা ও অনুসন্ধান চালিয়ে যাচ্ছে।
অন্যদিকে, চীনের মূল বাজারে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান লেনোভো সম্প্রতি একটি নতুন গ্রাহক ল্যাপটপ অবমুক্ত করেছে, যেটির ভেতরের শীতলীকরণ ব্যবস্থায় হীরা এবং তামা একত্রে ব্যবহার করা হয়েছে বলে দাবি করেছে নির্মাতা প্রতিষ্ঠানটি। গত বছরের জুন মাসে চিপ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান ইন্টেলের প্রধান নির্বাহী লিপ-বু ট্যান গণমাধ্যমকে জানান যে, তিনি ব্যক্তিগতভাবে ডায়মন্ড ফাউন্ড্রি নামের একটি প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করেছেন।
উল্লেখ্য যে, এই নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানটি আধুনিক চিপ তৈরির উপযোগী বিশেষ হীরার ওয়েফার উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে। এই ধরনের উদ্যোগগুলো স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে কৃত্রিম হীরার ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা কেবল প্রসেসর ঠান্ডা করার মাঝেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং আগামী দিনে চিপ তৈরির মূল উপাদান হিসেবেও এটি নিজেদের স্থান পাকাপোক্ত করতে পারে।
সূত্র: আজকের পত্রিকা