
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
বাংলা প্রথম পত্রের মানবধর্ম কবিতার অনুধাবনমূলক প্রশ্নের আলোচনায় তসবি ও মালা প্রসঙ্গ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক হিসেবে এসেছে। মানুষ যখন পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করে কিংবা যখন সে মৃত্যুবরণ করে, তখন তার সঙ্গে কোনো তসবি বা মালা থাকে না। বাউল সাধক লালন ফকির আলোচ্য কবিতায় মানুষের জাত-পরিচয় নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন এবং মানুষকে জাতপাত নিয়ে অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি না করার শিক্ষা দিয়েছেন। পৃথিবীতে মানুষেরা কেউ তসবি আবার কেউ মালা ব্যবহার করে নিজেদের জাতের ভিন্নতা প্রমাণ করার অপচেষ্টা চালায়, যা সম্পূর্ণ অমূলক।
লালন ফকির পৃথিবীর সমস্ত মানুষকে সর্বদা সমান চোখে বিবেচনা করে তাদের ধর্মকে সম্পূর্ণ অভিন্ন বলে জোরালো ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি মানবসমাজে মানুষে মানুষে বিদ্যমান কোনো ধরনের জাতিগত কিংবা ধর্মীয় ভেদাভেদে কখনো বিশ্বাস করতেন না। তাঁর সুদৃঢ় মতে, মানবতাই হচ্ছে প্রতিটি মানুষের জীবনের একমাত্র বাস্তব সত্য এবং একমাত্র প্রকৃত ধর্ম। এই মানবতার সুমহান ধর্মেই প্রতিটি মানুষের জীবন সুন্দর ও মহীয়ান হয়ে ওঠে, যার কারণে তিনি সকলের ধর্ম অভিন্ন বলে চিহ্নিত করেছেন।
মানুষের প্রকৃত পরিচয় কখনোই জাতপাতের ওপর নির্ভর করে না বলেই এই বিষয় নিয়ে কখনো বাড়াবাড়ি করা একেবারেই উচিত নয়। সাধক লালন নিজে নিজের জাত সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ এবং তিনি নিজের জাত আসলে কী তা জানেন না। তবে তিনি খুব ভালো করেই উপলব্ধি করতে পেরেছেন যে জাত মানুষের মাঝে কৃত্রিম বিভেদ ও দূরত্ব সৃষ্টি করে। মনুষ্যত্বই যে মানুষের সর্বশ্রেষ্ঠ পরিচয়, সেই ভাবনায় তিনি বিশ্বাসী ছিলেন।
মূলে এক জল সে যে ভিন্ন নয় পংক্তিতে জলের বিভিন্ন উপাদানের মধ্য দিয়ে মূলত অভিন্ন মানবসত্তাকে অত্যন্ত সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। স্থানভেদে ভিন্ন অবস্থানে থাকার কারণে একই জলের নাম কখনো কূপজল আবার কখনো বা গঙ্গাজল হয়ে থাকে। উৎপত্তি ও উপাদানের দিক থেকে বিচার করলে মূলে সমস্ত জলই একই উৎস থেকে এসেছে। কূপের পানি দৈনন্দিন কাজে ব্যবহার করা হয় আর গঙ্গার পানিকে মানুষ পবিত্র মনে করে। জাতিধর্মের অন্তরালে পৃথিবীর সকল মানুষ একই স্রষ্টার একই উপাদানে সৃষ্ট, যা এই রূপকের মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে।
কূপজল ও গঙ্গাজল উভয় তরলেরই মূল উপাদান যেহেতু জল, তাই এরা মূলত একটি অভিন্ন সত্তা হিসেবে পরিগণিত হয়। জল যখন কোনো কূপে অবস্থান করে তখন তাকে সবাই কূপজল বলে এবং জল যখন গঙ্গার বুকে থাকে তখন তাকে পবিত্র গঙ্গাজল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই দুইয়ের মধ্যে কেবল জলের আধার বা পাত্রের ভিন্নতা রয়েছে, কিন্তু মূল উপাদান এক ও অভিন্ন। জাতপাত কিংবা বর্ণপ্রথাকে ছাপিয়ে জলের আসল পরিচয়ই এখানে প্রধান হয়ে ওঠে।
মানবধর্ম কবিতায় জেতের ফাতা বলতে মূলত জাতের নির্দিষ্ট কিছু চিহ্ন বা প্রতীককে খুব স্পষ্টভাবে বোঝানো হয়েছে। মরমি কবি লালন শাহ বংশমর্যাদা কিংবা জাতিগত পরিচয়ের কোনো ধরনের ভিন্নতাকে কখনো স্বীকার করেন না। তবে তিনি সমাজে দেখেছেন যে ধর্মীয় ও জাতিগত পরিচয়ের ওপর ভিত্তি করে মানুষের মাঝে কৃত্রিম পার্থক্য তৈরি করা হয়। বিভিন্ন ধর্ম ও জাতের মানুষ নিজেদের আলাদা করার জন্য তসবি বা মালার মতো নানা প্রতীক ব্যবহার করে, যা জেতের ফাতা হিসেবে চিহ্নিত।
যাওয়া কিংবা আসার বেলায় বলতে কবি মূলত মানুষের জীবনের জন্ম এবং মৃত্যুর সময়কালকে অত্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করেছেন। মানুষের যাবতীয় কর্মকাণ্ড জন্ম থেকে মৃত্যুর নির্দিষ্ট সীমারেখার মাঝেই আবদ্ধ থাকে। একটি সদ্যোজাত মানবশিশু যেমন কোনো ধরনের জাত-পরিচয় সঙ্গে নিয়ে পৃথিবীতে আসে না, ঠিক তেমনি মৃত্যুর মুহূর্তটিতেও মানুষের কোনো জাত বা পরিচয় অবশিষ্ট থাকে না। মানবজীবনের এই আগমন ও প্রস্থান উভয় মুহূর্তের রূপ ও বাস্তবতা সর্বদা এক এবং অভিন্ন।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।