
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
প্রায় পনেরো বছরের বেশি সময় ধরে শিক্ষকতা পেশা ও নানা প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত থাকার পর, এবার নিজে একজন শিক্ষার্থী হিসেবে নতুন অভিজ্ঞতা অর্জন করছেন এক বাংলাদেশি শিক্ষক। দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিদেশের একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন শিক্ষাব্যবস্থাকে একজন শিক্ষার্থীর দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখার এই সুবর্ণ সুযোগ তার পেশাগত জীবনকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করার পর, ২০১১ সালে বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারে যোগদান করেন তিনি। পরবর্তীতে তিনি যশোর জেলার মাইকেল মধুসূদন কলেজ, খুলনার ব্রজলাল কলেজ এবং খুলনা সরকারি কলেজে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে পাঠদান করেন।
এছাড়াও জাতীয় কারিকুলামের উচ্চমাধ্যমিক স্তরে এবং খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক শ্রেণিতে পাঠদানের অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। পাশাপাশি, সরকারি পাঁচটি শিক্ষা প্রকল্পের আওতায় শিক্ষক প্রশিক্ষণে মাস্টার ট্রেইনার হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।
মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ কলেজ, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট ছাড়াও আঞ্চলিক লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এবং অটিজম একাডেমিগুলোতে প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করার সুযোগ হয়েছে তার। বিদেশযাত্রার প্রাক্কালে তিনি জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনা একাডেমির প্রশিক্ষণ বিশেষজ্ঞ পদে কর্মরত ছিলেন।
২০২৬ সালের জানুয়ারি সেশনে যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব দ্য ওয়েস্ট অব স্কটল্যান্ডের লন্ডন ক্যাম্পাসে মাস্টার অব এডুকেশন ইন এডুকেশনাল স্টাডিজ বিষয়ে অধ্যয়ন শুরু করেন তিনি। সেখানে গিয়ে নিজেকে নতুন করে শিক্ষার্থী হিসেবে আবিষ্কার করাটাই তার কাছে সবচেয়ে বড় অভিজ্ঞতা হয়ে উঠেছে।
সেখানকার পাঠ্যক্রমে কেবল শ্রেণিকক্ষের লেকচার নয়, বরং স্বনির্ভর অধ্যয়ন, প্রবন্ধ রচনা, প্রতিফলনমূলক দিনলিপি তৈরি, পোর্টফোলিও, উপস্থাপনা এবং নীতিমালার ওপর বিতর্কসহ নানা ধরনের মূল্যায়ন রয়েছে। এই বহুমুখী অভিজ্ঞতা তাকে শুধু নতুন জ্ঞানই দেয়নি, বরং নিজের বিগত দিনের শিক্ষকতা পেশাকেও নতুনভাবে মূল্যায়ন করতে শিখিয়েছে।
বাংলাদেশে শিক্ষকতা করার সময় তার মূল দায়িত্বের বড় অংশজুড়ে ছিল শিক্ষার্থীদের কাছে বিষয়বস্তু সহজে বোধগম্য করা, প্রশ্নের সঠিক সমাধান দেওয়া এবং পরীক্ষার প্রস্তুতিতে সহায়তা করা। কিন্তু যুক্তরাজ্যে আসার পর তিনি উপলব্ধি করেছেন যে উচ্চশিক্ষার স্তরে শিক্ষার্থীদের নিজেদের পড়ালেখার দায়দায়িত্ব অনেক বেশি বহন করতে হয়।
শ্রেণিকক্ষে একজন অধ্যাপক কেবল কোনো নির্দিষ্ট ধারণা, তত্ত্ব বা বিষয়বস্তু সবার সামনে ব্যাখ্যা করেন। এরপর থেকে শুরু হয় শিক্ষার্থীর স্বাধীন অনুসন্ধান ও গবেষণা। এই তত্ত্বের পক্ষে জোরালো যুক্তি কী আছে, এর ত্রুটি কোথায় এবং অন্য গবেষকদের মতামত কী, তা নিয়ে ভাবতে হয়।
বাস্তব অভিজ্ঞতার সঙ্গে তাত্ত্বিক বিষয়ের সম্পর্ক কতটা এবং এ বিষয়ে নিজের ব্যক্তিগত অবস্থান কোথায়, তা খুঁজে বের করা জরুরি। অর্থাৎ, কেবল একটি সঠিক উত্তর জানা সেখানে যথেষ্ট নয়, বরং উত্তরটি কীভাবে তৈরি হলো তা জানা আবশ্যক।
একজন শিক্ষক হিসেবে এই বিষয়টি তাকে বিশেষভাবে নাড়া দিয়েছে, কারণ এতদিন তিনি নিজেই শিক্ষার্থীদের বিশ্লেষণী চিন্তা ও প্রশ্ন করার গুরুত্ব বোঝাতেন। বর্তমান সময়ে এসে তাকেও ঠিক একই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নিজেকে প্রমাণ করতে হচ্ছে।
বাংলাদেশের অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সাধারণত শিক্ষককেই জ্ঞানের প্রধান উৎস বা মূল কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়। শিক্ষার্থীরা নীরবে শিক্ষকের বক্তব্য শোনে, প্রয়োজনীয় নোট টুকে নেয় এবং পরীক্ষায় তা যথাসম্ভব নিখুঁতভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করে থাকে।
অবশ্য বর্তমানে দেশের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক ও অংশগ্রহণমূলক পাঠদানের ইতিবাচক চর্চা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। তা সত্ত্বেও বড় আকারের শ্রেণি কক্ষ, সময়ের সীমাবদ্ধতা এবং পরীক্ষাকেন্দ্রিক মূল্যায়নের মতো নানা বাস্তবতার কারণে শিক্ষককেন্দ্রিক শিক্ষার প্রভাব এখনো দৃশ্যমান।
যুক্তরাজ্যের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পৌঁছানোর পর যে বিষয়টি তাকে সবচেয়ে বেশি ভাবিয়ে তুলেছে, তা হলো সেখানকার উন্মুক্ত প্রশ্ন করার সংস্কৃতি। শিক্ষকের বক্তব্যের সঙ্গে কোনো মতপার্থক্য থাকলে শিক্ষার্থীরা যুক্তি দিয়ে নিজেদের মতামত প্রকাশ করতে পারে।
তারা যেকোনো তাত্ত্বিক ধারণার সীমাবদ্ধতা নিয়ে সাবলীলভাবে প্রশ্ন তুলতে পারে এবং যেকোনো গবেষণার পদ্ধতি নিয়ে মুক্ত আলোচনায় অংশ নেয়। এমনকি শিক্ষক প্রদত্ত ব্যাখ্যার বাইরে নিজস্ব বিকল্প ব্যাখ্যাও সেখানে উপস্থাপনের সুযোগ রয়েছে।
সেখানকার শিক্ষা পদ্ধতিতে প্রশ্ন করাকে শিক্ষার একটি অন্যতম মৌলিক অংশ হিসেবে গণ্য করা হয়, যা তাকে নিজের শিক্ষকতার দিনগুলোর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। তিনি আত্মজিজ্ঞাসা করেন যে, তারা কি শিক্ষার্থীদের কেবল উত্তর খোঁজা শেখাচ্ছেন, নাকি ভালো প্রশ্ন করাও শেখাচ্ছেন।
যুক্তরাজ্যের উচ্চশিক্ষার আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো স্বনির্ভর অধ্যয়ন বা নিজে নিজে পড়াশোনা করা। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক যা আলোচনা করেন, সেটাই শেষ কথা নয়, বরং তা পরবর্তী গভীর পড়াশোনার একটি সূচনা মাত্র।
বই, বিভিন্ন গবেষণামূলক প্রবন্ধ, গবেষণাপত্র ও নীতিমালার মতো নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে শিক্ষার্থীদের নিজেদেরই প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করতে হয়। এরপর সেমূহ পড়তে হয় এবং নিজস্ব উপলব্ধি দিয়ে তা সাজাতে হয়।
একটি ছোট লিখিত কাজ প্রস্তুত করতে গিয়েও কখনো কখনো অসংখ্য গবেষণামূলক লেখা খুঁটিয়ে পড়তে হয়। কেবল তথ্য সংগ্রহ করাই শেষ কাজ নয়, বরং তথ্যের উৎস কতটা নির্ভরযোগ্য তাও যাচাই করতে হয়।
গবেষকের মূল বক্তব্য কী, যুক্তির গভীরতা ও সীমাবদ্ধতা কোথায় এবং নিজের বক্তব্যের সঙ্গে তার সংযোগ কীভাবে স্থাপন করা যায়, তা ভাবতে হয়। বাংলাদেশে তিনি শিক্ষার্থীদের বেশি করে পড়তে বললেও, যুক্তরাজ্যে এসে বুঝেছেন কীভাবে পড়তে হবে তা শেখানোও সমান জরুরি।
দুই দেশের শিক্ষাব্যবস্থার তুলনামূলক পার্থক্য অনুধাবনের ক্ষেত্রে মূল্যায়নপদ্ধতি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সেখানকার বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাসাইনমেন্ট বা লিখিত কাজ করতে গিয়ে তিনি বুঝতে পেরেছেন যে তথ্য দেওয়া আর একাডেমিক যুক্তি তৈরি করা এক নয়।
একটি মানসম্মত লেখায় কেবল কী ঘটেছে তা উল্লেখ করলেই চলে না, বরং কেন ঘটেছে এবং গবেষকেরা কীভাবে তা ব্যাখ্যা করেছেন তা দেখতে হয়। তাদের মধ্যকার মিল বা অমিল এবং নিজের সুনির্দিষ্ট বিশ্লেষণ ফুটিয়ে তুলতে হয়।
এই ধরনের মূল্যায়ন একজন শিক্ষার্থীকে নিজ চিন্তা সুশৃঙ্খলভাবে গুছিয়ে নিতে বাধ্য করে। শিক্ষক হিসেবে তার মনে প্রশ্ন জেগেছে যে, তারা যদি কেবল শিক্ষার্থীদের তথ্য মুখস্থ ও স্মরণের ক্ষমতাই যাচাই করেন, তবে তাদের সৃজনশীলতা কতটুকু বিকশিত হচ্ছে।
আমাদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে শিক্ষককে সব সময় বিশেষ সম্মানের আসনে রাখা হয়, যদিও এই ধারা সময়ের সঙ্গে কিছুটা বদলাচ্ছে। তবে এমন একটি মুক্ত পরিবেশ প্রয়োজন যেখানে শিক্ষার্থীরা যথাযথ সম্মান বজায় রেখেই প্রশ্ন করতে পারে।
যুক্তরাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্যে যে শিক্ষাবিষয়ক স্বাধীন সংলাপের বা যুক্তিতর্কের সংস্কৃতি রয়েছে, তা তাকে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ ও আকৃষ্ট করেছে।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।