
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
ইসরায়েলের রাজনৈতিক অঙ্গনে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন দল ও জোটের বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলেছে দেশটির বিরোধী জোট। এই বিরোধী জোটটির নেতৃত্ব দিচ্ছে ইয়াশার পার্টি, যার দলের প্রধান হলেন একজন সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকট। বর্তমান নির্বাচনী লড়াইয়ে আইজেনকটের সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গাটি অত্যন্ত সরল ও অনস্বীকার্য, আর তা হলো তিনি স্বয়ং বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নন। ইসরায়েলের ইতিহাসের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই নির্বাচনে অনেক ভোটারের কাছে কেবল এই একটিমাত্র কারণই ভোট দেওয়ার জন্য যথেষ্ট বলে বিবেচিত হতে পারে।
গতকাল মঙ্গলবার ইসরায়েলে দেশটির পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। চ্যানেল টুয়েলভের বরাতে আল–জাজিরার প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী, ভোটগ্রহণ শেষে প্রকাশিত বুথফেরত জরিপ বা এক্সিট পোল অনুযায়ী বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর ডানপন্থী জোট ৫২টি আসনে জয় পেতে চলেছে। অন্যদিকে, গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটটি পেতে পারে ৪৯টি আসন এবং ইসরায়েলি আরব দলগুলোর জোট আরব লিস্ট জিততে পারে ১৯টি আসন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিরোধী দলের নেতা আইজেনকট ‘মিজরাহি–মরোক্কান’ বংশোদ্ভূত একজন ব্যক্তি। ঐতিহাসিকভাবে ইউরোপীয় বংশোদ্ভূত ইহুদি এবং মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা ইহুদিদের মাঝে বৈষম্যের ধারা দীর্ঘদিনের। মরক্কো থেকে অভিবাসী হিসেবে আসা একটি পরিবারের সন্তান ৬৬ বছর বয়সী আইজেনকট অতীতে ইসরায়েলের শীর্ষ জেনারেলের দায়িত্ব পালন করেছিলেন এবং তাঁর শৈশব ও কৈশোর কেটেছিল তিবেরিয়াস ও ইলাতে অঞ্চলে।
এসব অঞ্চল মূলত ইসরায়েলের মূল রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রের বাইরে অবস্থিত হওয়ায় আইজেনকটের বেড়ে ওঠার এই প্রেক্ষাপটটি নেতানিয়াহুর জীবনযাত্রার সম্পূর্ণ বিপরীত। জেরুজালেমের অভিজাত পরিবেশ এবং ক্ষমতাবানদের নিজস্ব বৃত্তের ভেতরেই বেড়ে উঠেছেন বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। যদিও আইজেনকট নিজের জাতিগত পরিচয়ের বিষয়টি নিয়ে খুব একটা প্রকাশ্যে কথা বলেন না, তবুও বিশ্লেষকদের মতে তাঁর ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তার পেছনে এই পটভূমিরও একটি বিশেষ ভূমিকা রয়েছে।
বছরখানেক আগেও জনমত জরিপগুলোয় তাঁর ব্যক্তিগত সমর্থন ছিল কেবল এক অঙ্কের ঘরে। সেখান থেকে নাটকীয়ভাবে উঠে এসে গত ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনে নেতানিয়াহুকে ক্ষমতাচ্যুত করার লড়াইয়ে তিনি বিরোধীদের প্রধান মুখ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। এখন পর্যন্ত ইসরায়েলের ইতিহাসে মিজরাহি গোষ্ঠীর কোনো ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রী পদে আসীন হননি, ফলে আইজেনকট এই নির্বাচনে বিজয়ী হতে পারলে তিনিই হবেন দেশটির প্রথম মিজরাহি প্রধানমন্ত্রী।
পরিবার ও কর্মজীবনের দিক থেকে আইজেনকট ৯ ভাই–বোনের মধ্যে দ্বিতীয় এবং ব্যক্তিগত জীবনে তিনি পাঁচ সন্তানের জনক। জীবনের দীর্ঘ একটি সময় ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী বা আইডিএফের সেবায় কাটিয়ে দেওয়ার পর তিনি সরাসরি রাজনীতিতে নাম লেখান, যার ফলে রাজনীতিতে তিনি তুলনামূলকভাবে একজন নতুন মুখ।
সামরিক ক্যারিয়ারের সূচনা ঘটে ১৯৭৮ সালে যখন তিনি গোলানি ব্রিগেডে যোগদান করেন। দীর্ঘ ৪০ বছরের সুদীর্ঘ সামরিক জীবনে নানা ধাপে পদোন্নতি পেয়ে তিনি ২০১৫ সালে আইডিএফের চিফ অব স্টাফের মর্যাদাপূর্ণ পদে উন্নীত হন। ২০১৯ সাল পর্যন্ত তিনি এই দায়িত্বে বহাল ছিলেন এবং সেই সময় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর অধীনেই তাঁকে দায়িত্ব পালন করতে হয়েছিল।
২০২২ সালে অপর এক সাবেক চিফ অব স্টাফ বেনি গ্যান্টজের হাত ধরে আইজেনকট মূলধারার রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। পরবর্তীতে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে ইসরায়েলে রক্তক্ষয়ী হামলার পর এই দুজনেই নেতানিয়াহুর গঠিত জরুরি যুদ্ধকালীন মন্ত্রিসভায় যোগ দেন। তবে যুদ্ধ–পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে কোনো স্পষ্ট কৌশল বা পরিকল্পনা না থাকার কথা উল্লেখ করে তাঁরা দুজনই ২০২৪ সালের জুনে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করে বেরিয়ে আসেন।
এদিকে এই দীর্ঘ যুদ্ধ আইজেনকটের ব্যক্তিগত পরিবারেও গভীর ক্ষত ও শোকের সৃষ্টি করেছে। সংঘাত শুরুর ঠিক দুই মাস পর ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে গাজায় চলা তীব্র লড়াইয়ের সময় তাঁর ২৫ বছর বয়সী ছোট ছেলে গাল মর্মান্তিকভাবে নিহত হন। এছাড়া তাঁর পরিবারের দুই ভাতিজাও এই যুদ্ধে প্রাণ হারান।
গাজার বিষয়ে তাঁর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা হলো আগামী ১৮ মাসের মধ্যে সেখানে হামাসের শাসনের অবসান ঘটানো। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য তিনি হয় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবেন অথবা তাঁর নিজের ভাষায় কিছু ‘সৃজনশীল’ সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।
গাজা যুদ্ধে নিজ সন্তানের প্রাণ হারানোর মর্মান্তিক ঘটনাই মূলত আইজেনকটকে সক্রিয় ও সরাসরি রাজনীতিতে আসার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রণোদনা হিসেবে কাজ করেছে। ২০২৬ সালের এপ্রিলে প্রভাবশালী ইদিয়োথ আহরোনথ পত্রিকায় প্রকাশিত এক লেখায় আইজেনকট উল্লেখ করেছিলেন যে, তিনি গালের কবরের পাশে দাঁড়িয়েই শপথ নিয়েছিলেন যে তার ও তার সতীর্থদের দেওয়া এই ত্যাগের মূল্য কখনো বৃথা যেতে দেবেন না।
নির্বাচনের আগে পরিচালিত সর্বশেষ জনমত জরিপগুলোতে দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে কে সবচেয়ে বেশি উপযুক্ত, এমন প্রশ্নের জবাবে নেতানিয়াহুর চেয়ে বেশ ভালোভাবেই এগিয়ে ছিলেন আইজেনকট। তবে বুথফেরত জরিপের চূড়ান্ত ফলাফল বলছে যে এবারের নির্বাচনে কোনো রাজনৈতিক জোটই এককভাবে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারছে না, যা পরবর্তীতে সরকার গঠনের প্রক্রিয়াটিকে বেশ জটিল করে তুলেছে।
ইসরায়েলের প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থায় কোনো দল বা জোট নির্বাচনে সর্বাধিক আসন পেয়ে প্রথম হলেও দেশের প্রেসিডেন্ট স্বয়ংক্রিয়ভাবে তাঁকে সরকার গঠনের আমন্ত্রণ জানান না। বরং যিনি সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনা নিয়ে একটি টেকসই জোট গঠন করতে সক্ষম হবেন, কেবল সেই আইনপ্রণেতার ওপরই সরকার গঠনের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়, যেখান থেকেই মূলত শুরু হয় জটিল আসন ও সমীকরণের হিসাব–নিকাশ।
জনমত জরিপ প্রকাশ পাওয়ার আগেই বিভিন্ন মহলে আভাস দেওয়া হয়েছিল যে সরকারি কিংবা বিরোধী কোনো জোটই সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার ম্যাজিক ফিগার ৬১ আসন হয়তো অর্জন করতে পারবে না। বর্তমান বুথফেরত জরিপের ফলাফলও ঠিক সেই দিকেই ইঙ্গিত প্রদান করছে। অবশ্য এর আগে আইজেনকট নিজেই মন্তব্য করেছিলেন যে ৬১টি আসন এককভাবে না পেলেও তিনি সরকার গঠনের সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাবেন।
বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর সঙ্গে আইজেনকটের ব্যক্তিত্বের পার্থক্য বেশ স্পষ্ট। সাবেক সামরিক পরিকল্পনাবিদ আইজেনকট তাঁর সামগ্রিক চরিত্র, আচরণ ও মেজাজের দিক থেকে নেতানিয়াহুর চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা একজন মানুষ।
আইজেনকটের নির্বাচনী প্রচারণায় ব্যবহৃত বিলবোর্ডে তাঁকে একজন দক্ষ যোদ্ধা, পরীক্ষিত নেতা এবং দেশের মানুষকে ঐক্যবদ্ধকারী ব্যক্তি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। তাঁর রাজনৈতিক দলের নাম রাখা হয়েছে ‘ইয়াশার’, যার হিব্রু অর্থ হলো ‘সোজা’।
তাঁর নির্বাচনী প্রচারের মূল প্রতিশ্রুতিগুলো মূলত অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন বিষয় এবং প্রশাসনিক জবাবদিহিকেন্দ্রিক। এর অংশ হিসেবে তিনি ৭ অক্টোবরের নিরাপত্তা ব্যর্থতা খতিয়ে দেখতে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রীয় তদন্ত কমিশন গঠনের জোরালো প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, অথচ যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু এই ধরনের কোনো তদন্তের তীব্র বিরোধিতা করে আসছেন।
এছাড়া দেশের সকল নাগরিকের জন্য বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগ চালুকরণ কিংবা জাতীয় সেবার সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন গাদি আইজেনকট। অন্যদিকে, বর্তমান ক্ষমতাসীন জোট সরকার এমন কিছু নির্দিষ্ট দলের ওপর রাজনৈতিকভাবে নির্ভরশীল, যারা কট্টরপন্থী অর্থোডক্স ইহুদিদের সামরিক বাহিনী ও জাতীয় সেবামূলক কাজ থেকে ব্যাপক ও স্থায়ী ছাড় দেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছে।
অবশ্য জাতীয় নিরাপত্তার মৌলিক প্রশ্নে আইজেনকট যথেষ্ট কট্টরপন্থী অবস্থান বজায় রাখেন এবং এই বিষয়ে নেতানিয়াহুর নীতিমালার সঙ্গে তাঁর অনেক গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানের মিল রয়েছে। নেতানিয়াহুর প্রায় সব প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীর মতো তিনিও গাজা উপত্যকা, লেবানন ও ইরানে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর চালানো অভিযানের বিষয়টিকে সার্বিকভাবে সমর্থন জুগিয়েছেন।
সেনাবাহিনীতে দায়িত্ব পালনের সময় আইজেনকট ‘দাহিয়েহ মতবাদ’–এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত বলে পরিচিতি লাভ করেছিলেন। এই সামরিক মতবাদের মূল লক্ষ্য হলো ভবিষ্যতে যেকোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীর সম্ভাব্য হামলা প্রতিহত করার উদ্দেশ্যে বেসামরিক অবকাঠামোগুলোর ওপর অত্যন্ত ব্যাপক ও চণ্ডাত্মক শক্তি প্রয়োগ করা। এটি মূলত এমন এক কৌশল যার মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ বা সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু না করেই গোপন এবং স্বল্পমাত্রার সামরিক অভিযান পরিচালনা করে প্রতিপক্ষের সামরিক সক্ষমতাকে ভেতর থেকে দুর্বল করে দেওয়া হয়।
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও আঞ্চলিক নীতির বিষয়েও আইজেনকট ও নেতানিয়াহুর মূল লক্ষ্যগুলো প্রায় একইরকম, যার মূল কথা হলো ইরানকে যেকোনো মূল্যে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনে বাধা দেওয়া এবং তেহরানপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর নেটওয়ার্ককে পুরোপুরি ভেঙে দেওয়া। তবে সাম্প্রতিক সংঘাতের ক্ষেত্রে সরকারের সুনির্দিষ্ট কোনো কার্যকর কৌশল না থাকার কঠোর সমালোচনা করে আইজেনকট মন্তব্য করেছেন যে, সামরিক সাফল্যের পাশাপাশি অবশ্যই জোরালো কূটনৈতিক উদ্যোগও গ্রহণ করা উচিত।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।