
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
কক্সবাজার জেলার উখিয়া উপজেলার ইনানী এলাকায় গভীর নলকূপ খননকাজের সময় প্রাকৃতিকভাবে বের হওয়া গ্যাসের শিখা এখনও অবিরাম জ্বলছে। গত মঙ্গলবার প্রাতঃকালে ইনানী মেরিন ড্রাইভের ছোট একটি সেতুঘেঁষা আবাসিক প্রাঙ্গণে এই অগ্নিকাণ্ডের সূচনা ঘটেছিল। বুধবার অপরাহ্ণ পর্যন্ত দীর্ঘ প্রায় দেড় দিন অতিবাহিত হলেও সেই আগুন নিভিয়ে ফেলা সম্ভব হয়নি।
জাতীয় জ্বালানি অনুসন্ধান প্রতিষ্ঠানের কারিগরি প্রতিনিধিদল জানিয়েছে, ভূগর্ভস্থ মিথেন গ্যাসের ভান্ডার নিজে থেকেই নিঃশেষ না হওয়া পর্যন্ত শিখাটি প্রজ্জ্বলিত থাকতে দেওয়া ছাড়া বিকল্প কোনো পথ নেই। এই মুহূর্তে জোরপূর্বক অগ্নি নির্বাপনের চেষ্টা করা হলে গ্যাস অন্য কোনো ফাঁকফোকর দিয়ে ছড়িয়ে পড়ে বড় ধরনের মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
ঘটনার দিন বিকালের পর থেকেই লেলিহান শিখার প্রচণ্ডতা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেতে শুরু করে যা আজও সমানভাবে বজায় রয়েছে। এর আগে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও দমকল কর্মীরা যৌথভাবে বালু ও জল ছিটিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালিয়েছিলেন এবং স্থানীয় বাসিন্দারাও তাদের সহায়তা করেছিলেন। তবে সার্বিক ঝুঁকি বিবেচনা করে বর্তমানে অগ্নি নির্বাপনের যাবতীয় সক্রিয় প্রচেষ্টা স্থগিত রাখা হয়েছে।
দুপুরের দিকে নির্ধারিত স্থানে গিয়ে দেখা যায় যে, বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের উচ্চপদস্থ প্রতিনিধি ও কারিগরি বিশেষজ্ঞরা চারপাশ থেকে গোটা পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। পুলিশ সদস্যরা উৎসুক জনতাকে ঘটনাস্থল থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছেন এবং উত্তর-পশ্চিম কোণ থেকে বয়ে চলা বাতাসের বেগে আগুনের শিখা দুলছিল। দূর-দূরত্ব থেকে উৎসুক মানুষ ভিড় জমাচ্ছেন এবং জনতাকে নিরাপদ দূরত্বে রাখতে পুলিশের সঙ্গে তাদের কিছুটা বাক্যবিনিময়ও ঘটছে।
দমকল বাহিনীর জ্যেষ্ঠ স্টেশন কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে জানান যে, অগ্নিকাণ্ডের তীব্রতা আগের তুলনায় আরও বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষজ্ঞ দলের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ভূগর্ভস্থ গ্যাসের সরবরাহ পুরোপুরি ফুরিয়ে না যাওয়া পর্যন্ত আগুন জ্বলতে দেওয়া ছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই। গ্যাস অন্যত্র অপসারিত হলে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ ধারণ করতে পারে।
ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে ভূতাত্ত্বিক জরিপ দলের প্রধান গণমাধ্যমকে স্পষ্ট করেছেন যে, মাটির নিচের গ্যাসের স্তর সম্পূর্ণ শূন্য না হওয়া পর্যন্ত শিখা জ্বলতে দেওয়া বাঞ্ছনীয়। কৃত্রিম উপায়ে আগুন নেভাতে গেলে ভূগর্ভস্থ স্তরে তা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ার প্রবল ঝুঁকি রয়েছে। সম্ভাব্য ঝুঁকি এড়াতে উৎপত্তিস্থলের চারপাশে আড়াই শ বর্গমিটার এলাকা অবরুদ্ধ রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে এবং পরবর্তীতে শিখা নিভে গেলে নতুন পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
বিভিন্ন দপ্তরের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের ধারণা অনুযায়ী, এই প্রাকৃতিক অগ্নিকাণ্ড আরও চার থেকে পাঁচ দিন পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে। এর মধ্যে গ্যাস বের হওয়া নলকূপের মুখটিও ধীরে ধীরে প্রসারিত হচ্ছে। সাগরে নিম্নচাপের সংকেত এবং দমকা হাওয়ার গতিবেগ বৃদ্ধি পাওয়ায় সার্বিক পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, তা নিয়ে সবার মনে গভীর দুশ্চিন্তা কাজ করছে।
এই দুর্ঘটনার প্রভাবে মেরিন ড্রাইভ সংলগ্ন প্রায় পনেরো কিলোমিটার এলাকার বিদ্যুৎ সংযোগ সাময়িকভাবে বিচ্ছিন্ন রাখা হয়েছে। এর ফলে ওই অঞ্চলের বহু হোটেল, রিসোর্ট ও কয়েকটি গ্রামের হাজার হাজার মানুষ বিদ্যুৎহীন অন্ধকার অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। একই সঙ্গে প্রধান সড়কে যানবাহন চলাচল সীমিত করা হয়েছে এবং নিরাপত্তার স্বার্থে বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা মাঠে অবস্থান করছেন।
স্থানীয় দমকল দপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জানান যে, মঙ্গলবার সকালে জালিয়াপালং ইউনিয়নের একটি বাড়িতে নলকূপ বসানোর সময় আকস্মিক গ্যাস উদগীরণ থেকে এই অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়। ফায়ার সার্ভিসের বেশ কয়েকটি ইউনিট দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে কাজ শুরু করলেও ব্যর্থ হয়ে তা বন্ধ করে দেয়। বর্তমানে জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের সুনির্দিষ্ট পরামর্শ মেনে মাটির নিচের গ্যাসের মজুত প্রাকৃতিকভাবে শেষ হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে সবাই।
পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জানান, জ্বলন্ত আগুন বৈদ্যুতিক তারে স্পর্শ করে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটাতে পারে। সেই আশঙ্কা থেকেই একটি নির্দিষ্ট সীমানার দীর্ঘ এলাকাজুড়ে বিদ্যুৎ প্রবাহ সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা হয়েছে। এর দরুন সাধারণ গ্রাহকদের মারাত্মক ভোগান্তি পোহাতে হলেও দ্রুত বিকল্প উপায়ে বিদ্যুৎ সচল করার চেষ্টা চলছে।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।