
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
হাড় ভেঙে গুঁড়ো হয়ে যাওয়ার মতো তীব্র শারীরিক যন্ত্রণা, মাথার ভেতর ভারী ভাব, চোখের পেছনের অংশে টনটনানি এবং পেশিতে অসহ্য কষ্ট ডেঙ্গু জ্বরের অন্যতম প্রধান লক্ষণ। অতীতে এই অস্বস্তির কারণে রোগটিকে হাড়ভাঙা জ্বর বা ব্রেকবোন ফিভার হিসেবে চিহ্নিত করা হতো। এ ধরনের যন্ত্রণায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা স্বাভাবিকভাবেই হাতের কাছে থাকা ব্যথানাশক বড়ি সেবনের কথা ভেবে থাকেন। তবে ডেঙ্গুর লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই ব্যথানাশক গ্রহণ করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। ডাইক্লোফেনাক, অ্যাসপিরিন, নাপ্রোক্সেন কিংবা আইবুপ্রোফেনের মতো ওষুধগুলো রক্তক্ষরণের আশঙ্কা বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই ডেঙ্গু নিশ্চিত হওয়ার জন্য অপেক্ষা না করে, কেবল সন্দেহ হলেই এজাতীয় ওষুধ থেকে বিরত থাকা বাধ্যতামূলক। কিন্তু প্রশ্ন জাগে, সাধারণ সময়ে কার্যকর এসব ওষুধ কেন ডেঙ্গুর মতো পরিস্থিতিতে বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়?
এই জটিল বিষয়টি পরিষ্কারভাবে অনুধাবন করতে হলে মানবদেহের অনুচক্রিকার কার্যপ্রণালী, কোষীয় রাসায়নিক ক্রিয়া এবং রোগপ্রতিরোধব্যবস্থার ভূমিকা সম্পর্কে সম্যক ধারণা থাকা প্রয়োজন। প্রথমে লক্ষ করা যাক, ডেঙ্গু ভাইরাস কীভাবে মানুষের দেহের ভেতরে প্রভাব বিস্তার করে। শরীরে প্রবেশের পর এই ভাইরাস সরাসরি আঘাত হানে হাড়ের মজ্জার ওপর। মানবদেহের এই মজ্জার ভেতরেই মূলত অণুচক্রিকা বা প্লাটিলেট উৎপন্ন হয়। একই সঙ্গে ভাইরাসের আক্রমণ প্রতিহত করতে গিয়ে শরীরের নিজস্ব রোগপ্রতিরোধব্যবস্থাও ভুলবশত সুস্থ অনুচক্রিকাগুলো ধ্বংস করে ফেলে। এর ফলস্বরূপ রক্তে অনুচক্রিকার পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে হ্রাস পেতে শুরু করে, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় থ্রম্বোসাইটোপেনিয়া বলা হয়ে থাকে।
প্লাটিলেট হলো রক্তের এমন এক অতি ক্ষুদ্র উপাদান, যা যেকোনো ধরনের রক্তপাত বন্ধ করতে বিশেষভাবে সাহায্য করে। মানবদেহের কোথাও কেটে গেলে অথবা রক্তনালি ক্ষতিগ্রস্ত হলে অনুচক্রিকাগুলো দ্রুত সেই নির্দিষ্ট স্থানে ছুটে যায়। এরপর তারা একে অপরের সঙ্গে দৃঢ়ভাবে যুক্ত হয়ে ক্ষতস্থানে একটি অস্থায়ী প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে তোলে। পরবর্তীতে রক্ত জমাট বাঁধার অন্যান্য প্রক্রিয়া সক্রিয় হয়ে রক্তপাত সম্পূর্ণ বন্ধ করে। তবে ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে বিপদ কেবল প্লাটিলেট কমে যাওয়ায় সীমাবদ্ধ থাকে না। বরং এই রোগের গুরুতর পর্যায়ে রক্তনালির ভেতরের আবরণ অত্যন্ত দুর্বল ও ভঙ্গুর হয়ে পড়ে। এর ফলে রক্তের তরল অংশ তথা প্লাজমা নালির বাইরে ছড়িয়ে পড়ে এবং শরীরের সামগ্রিক রক্তসঞ্চালন প্রক্রিয়া মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।
শরীরের কোথাও প্রদাহ কিংবা কোনো ধরনের ক্ষত সৃষ্টি হলে বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক পদার্থ সক্রিয় হয়ে ওঠে, যার মধ্যে প্রোস্টাগ্ল্যান্ডিন অন্যতম। অ্যারাকিডোনিক অ্যাসিড নামক একটি পদার্থ থেকে COX-1 ও COX-2 নামক দুটি এনজাইমের সহায়তায় প্রোস্টাগ্ল্যান্ডিনসহ অন্যান্য রাসায়নিক উৎপন্ন হয়। এই উপাদানগুলো ব্যথা নিয়ন্ত্রণ, প্রদাহ সৃষ্টি এবং শরীরের নানা স্বাভাবিক কার্যক্রমে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই দুটি এনজাইমকে যদি কোনো কারখানার দুজন দক্ষ কারিগর হিসেবে কল্পনা করা হয়, তবে তাদের কাজ সম্পূর্ণ এক নয়। COX-1 শরীরের স্বাভাবিক বিভিন্ন কাজ পরিচালনা করে এবং এর সাহায্যেই থ্রম্বোক্সেন এ২ নামক অণুচক্রিকা সক্রিয়কারী উপাদান তৈরি হয়, যা প্লাটিলেটগুলোকে একসঙ্গে জমাট বাঁধতে সাহায্য করে।
অন্যদিকে COX-1 ও COX-2 উভয় এনজাইমই প্রোস্টাগ্ল্যান্ডিন তৈরিতে অংশ নিতে পারে। এই প্রোস্টাগ্ল্যান্ডিনের কিছু নির্দিষ্ট ধরন পাকস্থলীর ভেতরের সংবেদনশীল আস্তরণকে সুরক্ষা দিতে সাহায্য করে। এগুলো মিউকাস বা শ্লেষ্মা এবং বাইকার্বোনেট তৈরিতে বড় ধরনের ভূমিকা রাখে, যার ফলে পাকস্থলীর নিজস্ব অ্যাসিড সহজেই ভেতরের দেয়ালের কোনো ক্ষতি করতে পারে না। তবে প্রোস্টাগ্ল্যান্ডিনের সব ধরন একই রকম কাজ করে না; কিছু ধরন আবার শরীরের ব্যথা ও প্রদাহের অনুভুতি বাড়িয়ে তোলে। অন্যদিকে রক্তপাত শুরু হওয়ামাত্র থ্রম্বোক্সেন এ২ নামক রাসায়নিক আঠা প্লাটিলেটগুলোকে ডেকে সক্রিয় করে তোলে এবং তাদের একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে রক্ত জমাট বাঁধাতে বাধ্য করে।
এখন প্রশ্ন হলো, কোনো ব্যথানাশক ওষুধ যদি এই পুরো রাসায়নিক ব্যবস্থায় সরাসরি বাধা সৃষ্টি করে, তবে ঠিক কী ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। কেউ যখন তীব্র ব্যথা সহ্য করতে না পেরে ব্যথানাশক ওষুধ সেবন করেন, তখন সেটির উপাদান রক্তের প্রবাহে মিশে সরাসরি ওই দুটি এনজাইমকে পুরোপুরি অচল করে দেয়। এর ফলে সাময়িকভাবে ব্যথার অনুভূতি কমে গেলেও অনুচক্রিকার স্বাভাবিক কার্যকারিতা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। তখন মুহূর্তের মধ্যে থ্রম্বোক্সেন এবং প্রোস্টাগ্ল্যান্ডিন জাতীয় রাসায়নিক যৌগের উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। এখানেই মূলত বড় ধরনের বিপদের সূত্রপাত ঘটে, কারণ ডেঙ্গুর সময়ে শরীরের নিজস্ব রক্তপাত রোধ করার ব্যবস্থাপনা এমনিতেই অত্যন্ত চাপের মধ্যে থাকে।
বিভিন্ন ব্যথানাশক ওষুধের প্রভাবে অনুচক্রিকার স্বাভাবিক কাজ নানাভাবে বাধাগ্রস্ত হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, অ্যাসপিরিন মানবদেহের অণুচক্রিকায় COX-1 এনজাইমের কার্যক্রম দীর্ঘ সময়ের জন্য একেবারে বন্ধ করে দেয়। এর ফলে থ্রম্বোক্সেন এ২ উৎপাদন কমে যায় এবং প্লাটিলেটগুলোর একসঙ্গে জড়ো হওয়ার সহজাত ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে। আইবুপ্রোফেনের মতো কিছু ওষুধের প্রভাব অবশ্য তুলনামূলকভাবে সাময়িক হয়ে থাকে। তা সত্ত্বেও ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়ার সময়ে রক্তক্ষরণের তীব্র ঝুঁকি বিদ্যমান থাকায় এই জাতীয় ওষুধগুলো সম্পূর্ণ এড়িয়ে চলার নির্দেশ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে প্রোস্টাগ্ল্যান্ডিনের মাত্রা হ্রাস পেতে থাকায় পাকস্থলীর মিউকাসের সুরক্ষামূলক আস্তরণটি অত্যন্ত পাতলা ও দুর্বল হয়ে পড়ে।
এই অবস্থায় পাকস্থলীর ক্ষতিকর হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড সরাসরি তার নিজের ভেতরের দেওয়াল ও আস্তরণকে পুড়িয়ে ফেলতে শুরু করে এবং সেখানে রক্তক্ষরণকারী ক্ষতের জন্ম দেয়। এবার যদি দুটি ভিন্ন ঘটনা একসঙ্গে মিলিয়ে পর্যালোচনা করা হয়, তবে দেখা যাবে একদিকে ব্যথার ওষুধের কারণে পাকস্থলীর দেওয়ালে তৈরি হয়েছে গভীর ক্ষত, আর অন্যদিকে প্লাটিলেটগুলো রক্ত জমাট বাঁধাতে সম্পূর্ণ অক্ষম। এই মারাত্মক ফলাফলের কারণে ক্ষতের মুখ দিয়ে অবিরাম ও অনিয়ন্ত্রিত রক্তক্ষরণ শুরু হতে পারে। এমতাবস্থায় রক্তবমি হওয়া, কালো রঙের পায়খানা হওয়া কিংবা নাক ও মাড়ি দিয়ে রক্ত পড়ার মতো লক্ষণগুলোকে কোনোক্রমেই অবহেলা করা উচিত নয়। এ ধরনের কোনো লক্ষণ প্রকাশ পাওয়া মাত্রই রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া আবশ্যক।
পরিস্থিতি কেবল পাকস্থলীর অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণেই সীমাবদ্ধ থাকে না, এর পরিধি আরও অনেকদূর পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে। ডেঙ্গু ভাইরাসের সুনির্দিষ্ট ও ক্ষতিকর বৈশিষ্ট্যের কারণে মানবদেহের অতি সূক্ষ্ম রক্তনালিগুলোর ছিদ্রগুলো ধীরে ধীরে অনেক বড় হয়ে যায়। এর ফলে রক্তরস বা প্লাজমা নালির ভেতর থেকে বেরিয়ে এসে চারপাশের খালি জায়গায় জমা হতে শুরু করে। এর সঙ্গে ব্যথানাশক ওষুধের কারণে নতুন করে যুক্ত হওয়া অনিয়ন্ত্রিত অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ মিলে পুরো চিকিৎসাধীন পরিস্থিতিকে এক অত্যন্ত ভয়াবহ ও প্রাণঘাতী রূপ দিয়ে থাকে।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।