
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
মধ্যরাতের পর রাজধানীতে এক ব্যক্তির অদ্ভুত এক ছিনতাইয়ের শিকার হওয়ার লোমহর্ষক অভিজ্ঞতা সামনে এসেছে। রাত সাড়ে বারোটার দিকে বাসায় ফেরার তাড়া থাকলেও কোনো গণপরিবহন বা অটোরিকশা না পেয়ে চরম বিপাকে পড়েন তিনি। মগবাজার এলাকার একটি গলিতে ল্যাম্পপোস্টের নিচে ২৫-২৬ বছর বয়সের এক তরুণের দেখা পান তিনি, যার মুখে ছিল আউলাঝাউলা দাড়ি। কোনো দরদাম ছাড়াই ওই বাইকার তাকে মোহাম্মদপুর পৌঁছে দিতে রাজি হন এবং বলেন, ওঠেন, যা আছে দেবেন।
বাইকে ওঠার পর চালক তাকে একটি ভাঙা হেলমেট পরতে দেন। তবে মোহাম্মদপুর যাওয়ার ধৈর্য না দেখিয়ে বাইকটি কাকরাইলের একটি অন্ধকার ও জনশূন্য গলিতে প্রবেশ করান চালক। সেখানে গাড়ি থামিয়ে কোমর থেকে ছুরি উঁচিয়ে তিনি জানান যে তিনি কোনো বাইকার নন, বরং একজন ছিনতাইকারী এবং দ্রুত সব জিনিস বের করতে বলেন। ভুক্তভোগী তৎক্ষণাৎ তার মানিব্যাগ বের করে দেন, যেখানে নোট ও কয়েন মিলিয়ে মাত্র ১৫৬ টাকা এবং একটি ব্যাংক ডেবিট কার্ড ছিল। এরপর তাকে একটি এটিএম বুথে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে অ্যাকাউন্টে মোটে ৩৪ টাকা ব্যালান্স দেখে ছিনতাইকারী অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে প্রশ্ন করেন যে এত কম টাকা নিয়ে তিনি কেন রাস্তায় নেমেছেন এবং বাসায় কোনো টাকা নেই কি না।
উত্তরে ভুক্তভোগী হালকা লাফিয়ে বেশ খুশি মনে জানান যে বাসায় টাকা আছে, তবে সাথে একটি বিশেষ সমস্যাও রয়েছে। তিনি জানান, তার বাসায় এক লাখ টাকা রাখা থাকলেও তা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না এবং ছিনতাইকারী যদি সেই টাকা খুঁজে বের করতে পারে, তবে সে ওই টাকার অর্ধেক পাবে। ছুরি হাতে সরাসরি তাকিয়ে লাল চোখে ছিনতাইকারী তখন তাকে ফাজলামি ও বিটলামি করার অভিযোগ এনে ভুঁড়ি ফাঁসালে জান যাওয়ার হুমকি দেন। তখন অত্যন্ত কাতার গলায় বিশ্বাস করার অনুরোধ জানালে, ছিনতাইকারী বিটলা মুরুব্বিকে বাসায় না নিয়ে খালপাড়ে নিয়ে জবাই করার হুমকি দেয়।
মৃত্যু খুব কাছে চলে এলে মানুষের মধ্যে আর ভয় কাজ করে না উল্লেখ করে সেই ব্যক্তি আহ্লাদের সুরে ছিনতাইকারীর নাম জানতে চান। নিজের নাম বাবুল বলে পরিচয় দেওয়ার পর, সেই তরুণকে তিনি পুনরায় বাসায় গিয়ে টাকা খুঁজে পেলে নগদ পঞ্চাশ হাজার টাকা দেওয়ার প্রস্তাব দেন। প্রস্তাবে রাজি হয়ে বাবুল তাকে নিয়ে সোজা বাসায় চলে আসেন এবং পুরো বাড়ির নিয়ন্ত্রণ তার হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়। বাবুল তখন বেডরুমের আলমারি খোলেন, বিছানার তলা ও ওয়ার্ডরোবের ড্রয়ার টানেন, এমনকি চালের ড্রাম পর্যন্ত উল্টে দেখেন, কিন্তু কোথাও কোনো টাকা পাওয়া যায় না।
পরিশেষে ঘেমেটেমে ভুক্তভোগীর সামনে দাঁড়িয়ে জ্বলন্ত চোখে কর্কশ গলায় বাবুল জানতে চান যে টাকা কোথায় এবং তাকে ঘোরানোর ফলাফল সম্পর্কে তার কোনো ধারণা আছে কি না। অত্যন্ত শীতল গলায় যখন বাবুল পুনরায় টাকার সন্ধান চান, তখন ভুক্তভোগী জানান যে টাকা তার স্ত্রীর কাছে রয়েছে। এই কথা শোনার সাথে সাথেই বাবুলের পুরো চেহারা পাল্টে যায় এবং গোড়াকাটা লতানো গাছের মতো নুয়ে পড়ে তিনি আক্ষেপ করেন যে আগে কেন তা বলা হয়নি, কারণ বউয়ের টাকার খোঁজ বের করতে পারলে কি তিনি আর ছিনতাই করতেন।
দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভুক্তভোগী জানান যে গত তেত্রিশ বছর ধরে তিনিও নিজে সেই টাকার খোঁজ করে চলেছেন এবং বাবুল যদি তা বের করে দিতে পারেন তবে তাকে অর্ধেক টাকা অবশ্যই দেওয়া হবে। কোনো উত্তর না দিয়ে বাবুল তখন নিজের ছুরিটি পকেটে ঢুকিয়ে দরজার দিকে হেঁটে যেতে শুরু করেন। পেছন থেকে চেষ্টা করবেন কি না জানতে চাইলে, দরজার কাছে গিয়ে ফিরে তাকিয়ে বাবুল জানান যে তিনি রাস্তায় ছিনতাই করেন, কিন্তু বাসায় বাসায় এমন ক্যাচাল করার লাইসেন্স তিনি এখনও পাননি। পরবর্তীতে বাবুল বাইকে উঠে চলে যান এবং একা মনে সেই ব্যক্তি ভাবতে থাকেন যে তেত্রিশ বছর কেটে গেলেও কেউ কথা রাখেনি, ঠিক যেমন ছেলেবেলায় এক বৈষ্টুমী তার আগমনী গান হঠাৎ থামিয়ে শুক্লা দ্বাদশীর দিন অন্তরাটুকু শুনিয়ে যাওয়ার কথা বললেও কত চন্দ্রভুক অমাবস্যা পেরিয়ে গেলেও সেই বৈষ্টুমী আর ফিরে আসেনি।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।