
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
ইসরায়েলে ফিলিস্তিনি নাগরিকদের বিরুদ্ধে চলা অপরাধের তদন্তে তীব্র বৈষম্যের বাস্তব চিত্র প্রকাশিত হয়েছে আব্রাহাম ইনিশিয়েটিভসের ২০২৪ সালের প্রতিবেদনে। ওই প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে যে, ফিলিস্তিনি অধ্যুষিত জনপদগুলোতে ঘটা হত্যাকাণ্ডের মাত্র ১৫ শতাংশেরও কম ঘটনার ক্ষেত্রে পুলিশ অপরাধীকে চিহ্নিত করতে বা মামলার সঠিক সুরাহা করতে সক্ষম হয়েছে।
এর উল্টো চিত্র দেখা যায় ইহুদি নাগরিকদের বেলায়, যেখানে নিহতের ঘটনায় বিচার ও অপরাধী শনাক্তকরণের এই সফলতার হার প্রায় ৬৫ শতাংশের ঘরে গিয়ে ঠেকে।
রাষ্ট্রীয় সহিংসতা, বিভিন্ন মাত্রার বৈষম্য এবং ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলের নিরঙ্কুশ দখলদারির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সেখানকার ফিলিস্তিনি বাসিন্দারা বহু আগে থেকেই রাজনীতির পথ বেছে নিয়েছেন। ফিলিস্তিনিদের এই রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সূচনা হয়েছিল মূলত ১৯৫০-এর দশকেই।
তবে সে সময়কার কঠোর সামরিক শাসন ও রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের কারণে তাদের রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তোলা এবং সাধারণ জনজীবনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণের সুযোগগুলো মারাত্মকভাবে সংকুচিত ছিল। পরবর্তীতে ১৯৭০-এর দশকের সময়কালে ফিলিস্তিনি নাগরিকেরা আরও অনেক বেশি শক্তিশালী পার্লামেন্টারি ও তৃণমূলভিত্তিক রাজনৈতিক আন্দোলন গড়ে তোলার কাজে হাত দেন।
এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭৭ সালে আত্মপ্রকাশ করে ‘হাদাশ’ বা ‘ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট ফর পিস অ্যান্ড ইকুয়ালিটি’ নামের রাজনৈতিক দলটি। ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীর মধ্যে এই দলটি বর্তমান সময় পর্যন্ত অন্যতম প্রধান ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছে।
পরবর্তী কয়েক দশকের দীর্ঘ পথপরিক্রমায় আরও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের জন্ম হয়। এসব দলের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ‘বালাদ’ (ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক অ্যাসেম্বলি), ‘তা’আল’ (আরব মুভমেন্ট ফর রিনিউয়াল) এবং ‘রা’আম’ (ইউনাইটেড আরব লিস্ট)।
এরপর ১৯৮২ সালের দিকে গঠিত হয় ‘হাই ফলো-আপ কমিটি ফর আরব সিটিজেনস অব ইসরায়েল’ নামক অপর একটি প্ল্যাটফর্ম। ইসরায়েলের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষের প্রতিনিধিত্বকারী একটি অত্যন্ত প্রভাবশালী ও বড় ধরনের আমব্রেলা সংগঠনে রূপান্তরিত হয় এটি।
ইসরায়েলের পার্লামেন্টের বাইরে বসবাসকারী ফিলিস্তিনি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্বকারী অত্যন্ত জোরালো প্রধান কণ্ঠস্বর হিসেবে কাজ করে আসছে এই কমিটি। মূলত দেশের স্থানীয় পৌরসভাগুলোর সঙ্গে জাতীয় পর্যায়ের বিভিন্ন রাজনৈতিক আন্দোলনের নিবিড় সংযোগ স্থাপনের কাজটি তারা করে থাকে।
ফিলিস্তিনিদের সরাসরি নেতৃত্বে পরিচালিত রাজনৈতিক দলগুলো শুরু থেকেই ইসরায়েলের নেসেট নির্বাচনে নিয়মিতভাবে অংশগ্রহণ করে আসছে। যদিও এসব দল দীর্ঘ সময় ধরে মূলত যেকোনো সরকার গঠনকারী জোটের হিসাব-নিকাশের একেবারেই বাইরে অবস্থান করেছে।
পরবর্তীতে ২০১৫ সালে হাদাশ, বালাদ, তা'আল এবং রা'আম দলগুলো নিজেদের মধ্যে ঐক্যবদ্ধ হয়ে একটি যৌথ মোর্চা গঠন করে, যা ‘জয়েন্ট লিস্ট’ নামে পরিচিতি লাভ করে। ২০১৪ সালে নির্বাচনী অংশগ্রহণের ন্যূনতম ভোটের থ্রেশহোল্ড বা সীমা ২ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে সরাসরি ৩ দশমিক ২৫ শতাংশ করার ফলেই মূলত এই জোটের জন্ম হয়।
তখন তীব্র আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল যে ছোট দলগুলো যদি এককভাবে নির্বাচনে অংশ নেয়, তবে তাদের পক্ষে পার্লামেন্টে প্রবেশ করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে। ফলে সম্মিলিত শক্তির প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়।
এরই ফলশ্রুতিতে ২০২০ সালের মার্চের জাতীয় নির্বাচনে জয়েন্ট লিস্ট অভাবনীয়ভাবে ১৫টি আসন নিজেদের দখলে নিতে সক্ষম হয়। এর মাধ্যমে এই রাজনৈতিক জোটটি ইসরায়েলের নেসেটের তৃতীয় বৃহত্তম পার্লামেন্টারি ব্লকে উন্নীত হয়েছিল।
তবে দুঃখজনকভাবে পরবর্তী সময়ে অভ্যন্তরীণ নানা মতবিরোধ ও দ্বন্দ্বের জেরে এই শক্তিশালী জোটটি শেষ পর্যন্ত ভেঙে যায়। এর ফলে ফিলিস্তিনিদের সম্মিলিত রাজনৈতিক শক্তি ও প্রভাব অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েছিল।
দীর্ঘ বহু দশক ধরে ফিলিস্তিনিদের নেতৃত্বাধীন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যেকোনো ধরনের সহযোগিতা করাকে ইসরায়েলি রাজনীতিতে একটি নিষিদ্ধ বিষয় হিসেবে দেখা হতো। অধিকাংশ সাধারণ ইহুদি ইসরায়েলি ভোটার এ ধরনের রাজনৈতিক অংশীদারত্ব বা বন্ধুত্বের তীব্র বিরোধিতা করতেন।
অন্যদিকে, ফিলিস্তিনি নাগরিকদের নিজেদের মধ্যেও নানা ধরনের মতপার্থক্য ও ভিন্নমত বিদ্যমান ছিল। ইসরায়েলের সরকারি জোটে অংশ নিলে আদৌ কোনো অর্থবহ পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে তারা নিজেরাও একমত হতে পারেননি।
অবশেষে ২০২১ সালের দিকে এসে রাজনীতির সেই পুরনো ও শক্ত প্রাচীর ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। ওই বছর নাফতালি বেনেট এবং ইয়ার লাপিদের যৌথ নেতৃত্বে গঠিত সরকার গঠনকারী জোটে সরাসরি যোগ দেয় ফিলিস্তিনি দল রা’আম।
রা’আম দলের ঝুলিতে থাকা মাত্র চারটি আসন পার্লামেন্টে প্রয়োজনীয় সামান্য ও নড়বড়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বিরাট ভূমিকা রেখেছিল। আর এর ফলেই প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর টানা দীর্ঘ ১২ বছরের ক্ষমতার শাসনের অবসান ঘটেছিল।
এবার ২০২৬ সালের আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে হাদাশ, বালাদ ও তা’আল দলগুলো নিজেদের মধ্যকার দূরত্ব ঘুচিয়ে আবারও একত্র হয়ে জয়েন্ট লিস্ট গঠন করেছে। অন্যদিকে, রা’আম দল সম্পূর্ণ পৃথক একটি রাজনৈতিক দল হিসেবেই নিজেদের স্বাধীন অস্তিত্ব বজায় রেখেছে।
বিভিন্ন রাজনৈতিক পূর্বাভাস অনুযায়ী, ইসরায়েলের এই দুটি নির্বাচনী জোট সম্মিলিতভাবে প্রায় ১৮ থেকে ২০টি আসন পর্যন্ত লাভ করতে পারে। যদি এমনটি সত্যি ঘটে, তবে আগামী দিনে সরকার গঠন নিয়ে জোটের দর-কষাকষির টেবিলে ফিলিস্তিনি দলগুলোর প্রভাব বহুগুণ বেড়ে যাবে।
এর ফলে ইসরায়েলের পরবর্তী সরকার গঠনে কারা শেষ পর্যন্ত ক্ষমতায় বসবে, তা নির্ধারণের ক্ষেত্রে এই দলগুলোর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। একই সঙ্গে পার্লামেন্টে নিজেদের এই শক্ত প্রতিনিধিত্বকে সঠিকভাবে কাজে লাগিয়ে ফিলিস্তিনি নাগরিকেরা নিজেদের জন্য কোনো অর্থবহ পরিবর্তন আনতে পারবেন কি না, তাও নির্ধারিত হবে।
সব মিলিয়ে ইসরায়েলের জটিল রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণের ক্ষেত্রে ফিলিস্তিনি নাগরিকদের ভূমিকা বর্তমানে দিন দিন আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। দীর্ঘ কয়েক দশকের রাষ্ট্রীয় বৈষম্য, দমন-পীড়ন ও রাজনৈতিক প্রান্তিকীকরণের কঠিন বাস্তবতার মধ্যেও তাদের এই অবিরাম সংগ্রাম একটুও থামেনি।
এখন সবচেয়ে বড় যে প্রশ্নটি সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে তা হলো, পার্লামেন্টের আসন ও জোটের রাজনীতিতে অর্জিত এই প্রভাবকে তারা শেষ পর্যন্ত নিজেদের সমান অধিকার আদায়ের মূল শক্তিতে রূপান্তর করতে পারবেন কি না।
সূত্র: আজকের পত্রিকা