
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
১৯৭২ সালের জুন মাসে একটি আধুনিক শিল্পকলা গ্যালারি থেকে ফিলিপ্পো পালিজ্জির আঁকা ‘রিপোসো দেলা পাস্তোরেলা’ বা ‘রাখালিনীর বিশ্রাম’ শিরোনামের বিখ্যাত চিত্রকর্মটি চুরি হয়েছিল। এই শিল্পকর্মটি হারিয়ে যাওয়ার ঘটনাটি এতটাই গুরুতর আকার ধারণ করেছিল যে, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘ ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছিল।
পরবর্তী সময়ে দীর্ঘ দশক ধরে এই চিত্রকর্মটি বিভিন্ন অবৈধ শিল্পবাজারের আড়ালে হাতবদল হয়ে ঘুরে বেড়ায়। একপর্যায়ে সোয়াডস নামের একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির নিয়মিত অনলাইন অনুসন্ধানের মাধ্যমে একটি নিলামঘরের ওয়েবসাইটে ছবিটির বিক্রির বিজ্ঞাপন দেখতে পাওয়া যায়।
এই ডিজিটাল সূত্রের ধরেই ইতালীয় পুলিশ ছবিটির সঠিক অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হয়। অবশেষে ২০২৬ সালে ইতালির তুরিন শহর থেকে হারিয়ে যাওয়া এই মহামূল্যবান চিত্রকর্মটি সফলভাবে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।
কোনো শিল্পকর্মের নির্দিষ্ট কোনো অংশের অর্থ তাৎক্ষণিকভাবে বোঝা না গেলেও, সেটি যদি আদতে কোনো চুরি যাওয়া পূর্ণাঙ্গ শিল্পকর্মের টুকরা বা অংশবিশেষ হয়, তবে এই যন্ত্র নিখুঁতভাবে তা শনাক্ত করতে সক্ষম বলে জানিয়েছেন রাপিকাভোলি।
ইতালির পুলিশ বিভাগের দেওয়া আনুষ্ঠানিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের নভেম্বর মাসে এই বিশেষ প্রযুক্তি চালুর পর থেকে সোয়াডসের সরাসরি সহায়তায় তিন শতাধিক বড় চিত্রকর্ম ও ভাস্কর্য উদ্ধার করা হয়েছে।
পাশাপাশি ১ লাখ ৬৫ হাজারের অধিক ছোট আকারের মুদ্রা, পদক, চিঠি, পাণ্ডুলিপি, বিভিন্ন ধর্মীয় বস্তু, ডাকটিকিট ও নানা ধরনের কার্ড উদ্ধার করতেও এই প্রযুক্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
এভাবে উদ্ধার হওয়া বিভিন্ন শিল্পকর্ম ও প্রাচীন পুরাকীর্তিগুলোর সর্বমোট আর্থিক মূল্য ২০ কোটি ৩০ লাখ ইউরোরও বেশি, যার মার্কিন ডলারে পরিমাণ প্রায় ২২ কোটি ৬০ লাখ ডলার।
তবে রাপিকাভোলি এটাও স্পষ্ট করে জানিয়েছেন যে, এর মানে এই নয় যে একমাত্র সোয়াডস প্রযুক্তির মাধ্যমেই অতীতের সকল আলোচিত ও জটিল চুরির ঘটনার সমাধান করা সম্ভব হবে।
তাঁর ব্যক্তিগত মতানুযায়ী, এই আধুনিক প্রযুক্তিটি বিশেষ করে এমন সব শিল্পকর্ম খুঁজে বের করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত সহায়ক, যেগুলো সাধারণ মানুষের কাছে কম পরিচিত।
বিশেষ করে চোরেরা যখন কোনো মূল্যবান শিল্পকর্মের চেহারা পুরোপুরি বদলে ফেলে কিংবা সেগুলোকে টুকরা টুকরা করে কেটে বিক্রির চেষ্টা চালায়, তখন এই প্রযুক্তি দারুণ কার্যকর হয়।
উল্লেখ্য, কেবল ইতালিই একমাত্র দেশ নয় যারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করে হারিয়ে যাওয়া বা চুরি হওয়া শিল্পকর্ম উদ্ধারে সাফল্য অর্জন করেছে।
ইতিমধ্যে তুরস্ক তাদের নিজস্ব স্বয়ংক্রিয় এআই ব্যবস্থার সাহায্যে যুক্তরাজ্য থেকে চুরি হয়ে যাওয়া ১৫ শতকের বেশ কয়েকটি বিখ্যাত ও ঐতিহাসিক টাইলস উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে।
অন্যদিকে, ফ্রান্সের গবেষকেরা ‘আর্টে-ফ্যাক্ট’ নামের একটি বিশেষ মোবাইল অ্যাপ উদ্ভাবন করেছেন এবং জার্মানির বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান মিলে ‘কিকু’ নামের প্রযুক্তি চালু করেছে।
পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গবেষকেরা মেশিন লার্নিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে কম্বোডিয়া থেকে চুরি হয়ে থাকতে পারে এমন সব প্রাচীন ভাস্কর্য শনাক্ত করার কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
এছাড়া দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসি বাহিনীর লুট করে নেওয়া বিভিন্ন শিল্পকর্মের হারিয়ে যাওয়া ঐতিহাসিক নথিগুলো খুঁজে বের করার জন্য আলাদাভাবে এআইভিত্তিক বিশেষ ব্যবস্থা তৈরি করা হয়েছে।
সূত্র: আজকের পত্রিকা