
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
খাদ্যদ্রব্যের বাজারে ভিন্নধর্মী চিত্র লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যেখানে কিছু সামগ্রীর মূল্য হ্রাস পেলেও বিপরীত দিকে অন্যগুলোর দর ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, উদ্যানজাত ফসলের ক্ষেত্রে স্বস্তি আসলেও আলু এবং ডিমের মতো প্রয়োজনীয় উপাদানের মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া পেঁয়াজ ও কাঁচা লঙ্কার বাজারদরও চড়া রয়েছে। এই ধরনের মিশ্র প্রবণতার ভেতরেই সামগ্রিক খাদ্য মূল্যস্ফীতি হ্রাসের ধারা পরিলক্ষিত হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাম্প্রতিক গবেষণা পত্রে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থ বছরের প্রথম তিন মাসে অর্থাত্ জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর মেয়াদে গড় খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমে সাত দশমিক তেরো শতাংশে নেমে এসেছে। এর আগের প্রান্তিকে এই সূচকটি আট দশমিক আটষট্টি শতাংশের ঘরে অবস্থান করছিল। মূলত কৃষিপণ্যের পাশাপাশি চাল ও আটা জাতীয় সামগ্রীর মূল্যহ্রাসের ফলেই খাদ্য মূল্যস্ফীতির এই পতন ঘটেছে।
তবে মাছ, গোশত, ডিম, দুধ এবং ডালজাতীয় আমিষসমৃদ্ধ খাবারের বাজারদর এখনও ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে। বর্তমান খাদ্য মূল্যস্ফীতিতে কেবল আমিষজাতীয় খাদ্যপণ্যের অংশীদারিত্ব একান্ন শতাংশের বেশি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে আলোচ্য প্রথম প্রান্তিকে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি হ্রাস পেয়ে গড়ে আট দশমিক একান্ন শতাংশে ঠেকেছে। পূর্ববর্তী এপ্রিল থেকে জুন প্রান্তিকে এই হার নয় দশমিক এক এক শতাংশ ছিল।
খাদ্যের খরচ কিছুটা নিম্নমুখী হলেও জ্বালানি শক্তির বাজারদর বৃদ্ধি পেয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, প্রথম প্রান্তিকে জ্বালানি খাতের মূল্যস্ফীতি গড়ে সতেরো দশমিক চার শতাংশে পৌঁছেছে, যা আগের প্রান্তিকে সতেরো শতাংশে সীমাবদ্ধ ছিল।
জ্বালানি খাতের মূল্যস্ফীতির প্রধান কারণ হিসেবে জ্বালানি কাঠ, কৃষিজাত অবশিষ্টাংশ, গোবর এবং পাটকাঠির ব্যবহারকে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই খাতটিতে মূল্যস্ফীতি বেড়ে একুশ দশমিক আট থেকে বেড়ে বাইশ দশমিক এক শতাংশে উন্নীত হয়েছে। অন্যদিকে তরল জ্বালানি ও লুব্রিকেন্টের মূল্যস্ফীতিও তেরো দশমিক আট থেকে বৃদ্ধি পেয়ে চৌদ্দ দশমিক সাত শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও প্রকাশ পেয়েছে যে, সমাপ্ত সেপ্টেম্বর মাসের শেষলগ্নে জ্বালানি উপকরণের মূল্য বাড়ানো হলেও পরিসংখ্যান সংস্থার প্রকাশিত ভোক্তা মূল্যসূচকে এর তাৎক্ষণিক প্রভাব দৃশ্যমান হয়নি। ফলে পরবর্তী মাসগুলোতে এই খাতে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও তীব্র আকার ধারণ করে কি না, সে বিষয়ে সংশয় রয়ে গেছে।
জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধির কারণে পরবর্তীতে যাতায়াত এবং পণ্য উৎপাদনের খরচেও বাড়তি চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। যদিও এই পর্যালোচনায় জ্বালানি মূল্য বৃদ্ধির ফলে পরিবহন বা উৎপাদন ব্যয় ঠিক কতখানি বেড়েছে, তার সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান তুলে ধরা হয়নি। সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী জ্বালানির দাম বাড়লে সকল খাতের খরচই বৃদ্ধি পায় এবং পরিসংখ্যান সংস্থার আগামী মাসের পরিসংখ্যানে তার প্রভাব পড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মূল্যস্ফীতির চিত্র পর্যালোচনায় আমদানীকৃত পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি একটি বড় উদ্বেগের বিষয় হিসেবে সামনে এসেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, প্রথম প্রান্তিকে সার্বিক মূল্যস্ফীতির ছাব্বিশ শতাংশ এসেছে বিদেশ থেকে আমদানিকৃত খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত সামগ্রী থেকে, যা আগের প্রান্তিকে চব্বিশ দশমিক নয় শতাংশ ছিল।
এর বিপরীতে দেশীয় পণ্যসামগ্রীর অবদান পঁচাত্তর দশমিক এক শতাংশ থেকে হ্রাস পেয়ে তোত্তর শতাংশে নেমে এসেছে। অর্থাৎ মূল্যস্ফীতির সূচকে স্থানীয় খাদ্যপণ্যের অবদান কমলেও আমদানীকৃত সামগ্রীর প্রভাব বৃদ্ধি পেয়েছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের তথ্যমতে, মাল্টা, আপেল, নাশপাতি এবং আঙুরের মতো ফলমূলের ওপর সরকার ধারাবাহিকভাবে শুল্ক ও করারোপ বাড়িয়ে চলেছে। যার প্রত্যক্ষ প্রভাব হিসেবে বাজারে এসব ফলমূলের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। সেই সঙ্গে বিভিন্ন খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের ক্ষেত্রেও আমদানি শুল্কের হার বাড়ানো হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারেও বহু পণ্যের দর ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের বিশিষ্ট অধ্যাপক সায়েমা হক এই প্রসঙ্গে মন্তব্য করেছেন যে, দেশে বিগত চার বছরের বেশি সময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রবণতা বজায় রয়েছে। এই কারণে মূল্যস্ফীতি বড় ব্যবধানে না কমলে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে এর কোনো ইতিবাচক অনুভূতি তৈরি হয় না। তিনি আরও যোগ করেন যে, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর খাদ্য বাবদ ব্যয় তুলনামূলকভাবে বেশি হয়ে থাকে এবং খাদ্যের দর বৃদ্ধি পেলে তাদের খাদ্য তালিকা কাটছাঁট করা ছাড়া বিকল্প কোনো পথ থাকে না। দীর্ঘমেয়াদী খাদ্য মূল্যস্ফীতি তাই তাদের জীবনযাত্রায় গভীর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
আমিষজাতীয় খাবারের মূল্যবৃদ্ধি প্রসঙ্গে এই অর্থনীতিবিদ জানান যে, এর ফলে জনগণের পুষ্টির চাহিদা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে দুধের দাম বাড়লে শিশুদের পুষ্টির ওপর এবং ডিমের দাম বাড়লে প্রাপ্তবয়স্ক তথা শ্রমজীবী মানুষের আমিষের ঘাটতি তৈরি হয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে সরাসরি খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা না ঘটলেও পুষ্টির ঘাটতি নিশ্চিতভাবেই দেখা দিচ্ছে।
মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বগতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না সাধারণ মানুষের মজুরি বৃদ্ধির হার। বাস্তব পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাজার থেকে খাদ্যসামগ্রী ক্রয়, বাসা ভাড়া পরিশোধ, যাতায়াত এবং চিকিৎসাবাবদ ব্যয় মেটানোর পর মানুষের হাতে উদ্বৃত্ত অর্থ খুব বেশি থাকছে না।
পরিসংখ্যান সংস্থার সাম্প্রতিক একটি জরিপের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সাতচল্লিশ শতাংশ পরিবারকে নিত্যদিনকার সংসার খরচ নির্বাহের জন্য ঋণ গ্রহণ করতে হচ্ছে। গত দুই বছর ধরে মূল্যস্ফীতির তীব্র চাপের কারণে সাধারণ মানুষকে নিয়মিত এই পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হচ্ছে। এই পুরো সময়জুড়ে পণ্যের মূল্য যে অনুপاطে বৃদ্ধি পেয়েছে, খেটে খাওয়া মানুষের মজুরি তার তুলনায় অনেক ধীরগতিতে বেড়েছে। এর ফলে মানুষের আয় নামমাত্র বাড়লেও সেই অর্জিত অর্থ দিয়ে আগের মতো সমান পরিমাণ পণ্য ও পরিষেবা ক্রয় করা সম্ভব হচ্ছে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যানে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, গত দুই বছর ধরে মূল্যস্ফীতির সূচক ক্রমাগত মজুরি বৃদ্ধির হারকে পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে গেছে। এর ফলে নাগরিকদের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতা উভয়ই হ্রাস পেয়েছে।
চলতি অর্থ বছরের প্রথম প্রান্তিকে মজুরি ও মূল্যস্ফীতির মধ্যকার ব্যবধান পূর্বের প্রান্তিকের তুলনায় কিছুটা কমলেও সেপ্টেম্বরের শেষভাগে তা আবার প্রসারিত হতে শুরু করে। এর মূল কারণ হলো মূল্যস্ফীতি সন্তোষজনক পর্যায়ে না কমলেও বিপরীত দিকে মজুরি বৃদ্ধির গতি আরও শ্লথ হয়ে যাওয়া। এর ফলে জনগণের প্রকৃত আয় এবং ক্রয়ক্ষমতার ওপর নতুন করে চাপ সৃষ্টি হয়েছে।
পরিশেষে বলা যায়, কিছু পণ্যের মূল্য কিছুটা হ্রাস পেলেও সামগ্রিকভাবে অনেক জিনিসের দাম এখনও ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মজুরি বৃদ্ধির ধীরগতির প্রবণতা, যা সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে সংকুচিত করছে। সার্বিক এই পরিস্থিতিতে খাদ্য মূল্যস্ফীতি সামান্য নিম্নমুখী হলেও খুচরা বাজারের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ক্ষেত্রে জনজীবনে পুরোপুরি স্বস্তি ফিরে আসেনি বলেই বাজার বিশ্লেষকেরা অভিমত ব্যক্ত করেছেন।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।