
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
ভোরে রান্নাঘরে প্রবেশ করেই বড় ধরনের একটি বিস্ময়কর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে। বাজারের বর্তমান পরিস্থিতিতে ডিমের হালি প্রতি মূল্য ষাট টাকা অতিক্রম করার উপক্রম হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে খুচরা বাজারের ডিমের ঝুড়িগুলোর দিকে তাকালে প্রখ্যাত গ্রিক গল্পকার ঈশপের সেই ঐতিহ্যবাহী সোনার ডিম উৎপাদনকারী হাঁস ও মুরগির কথা গভীরভাবে মনে পড়ে যায়। বর্তমান সময়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় এই আমিষজাত খাদ্যপণ্যটির বাজারদর চরম ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে। ভবিষ্যতের পরিণতির কথা একমাত্র সৃষ্টিকর্তাই ভালো জানেন।
বর্তমান সময়ে বিপণন কেন্দ্রে সাজিয়ে রাখা ডিমগুলোর দিকে তাকালে এক ধরনের তীব্র আক্ষেপ মনে জাগে। এর পেছনে একটি শৈশবের স্মৃতি জড়িয়ে রয়েছে; বিদ্যালয় জীবনের শিক্ষকেরা পরীক্ষার উত্তরপত্রে আমাকে যে পরিমাণে লাল কালির শূন্য বা আন্ডা প্রদান করেছিলেন, সেই প্রাপ্তিগুলো যদি বাস্তবে পোলট্রি খামারের ডিম হিসেবে ফিরে আসত তবে কেমন হতো।
তাহলে বর্তমান সময়ে আমার পরিচয় কী হতে পারত? সহজ উত্তর হলো, আমি দেশের অন্যতম প্রধান ‘দ্য গ্রেট আন্ডা সম্রাট’ হিসেবে পরিচিত হতাম। সেক্ষেত্রে আমাকে জীবিকা নির্বাহের জন্য কোনো ধরনের চাকরি কিংবা ব্যবসা বাণিজ্য পরিচালনার পেছনে দৌড়াতে হতো না।
আমার শৈশব ও কৈশোরের শিক্ষাজীবনের স্মৃতি রোমন্থন করলে এখনো শরীরের পশম দাঁড়িয়ে যায়। বিশেষ করে গণিত এবং হিসাববিজ্ঞান বিষয়ের উত্তরপত্রগুলো দেখতে অবিকল আধুনিক প্রযুক্তির পোলট্রি খামারের মতো লাগত। আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গণিত বিষয়ের শিক্ষক কালাম স্যারের কথা বিশেষভাবে বলতে হয়, যিনি তাঁর স্ত্রীর ওপর জমানো সকল ক্ষোভ ও রাগ আমার খাতার ওপর প্রয়োগ করতেন। তিনি অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে উত্তরপত্রে বিশাল আকৃতির লাল রঙের গোল গোল শূন্য বসিয়ে নিচে নিজের স্বাক্ষর প্রদান করতেন।
বিদ্যালয় থেকে ছুটির পর নিজ বাসগৃহে প্রবেশ করা মাত্রই ভিন্ন এক পরিস্থিতির সূচনা ঘটত। আমার মা এক হাতে ঘর ঝাড়ু দেওয়ার ঝাড়ু এবং অন্য হাতে রুটি তৈরির বেলন উঁচিয়ে দরজায় অপেক্ষা করতেন। খাতার ফলাফল দেখা মাত্রই তিনি উচ্চস্বরে চিৎকার করে বলতেন, পরীক্ষার খাতায় আবারও শূন্য বা আন্ডা নিয়ে হাজির হয়েছিস! তোর এই শূন্য দিয়ে কি আমি এখন তরকারি রান্না করে তোকে খাওয়াব?
অতীতে ফেলে আসা সেই দিনগুলোতে শিক্ষক কালাম মহাশয় যখন শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের মাঝে মূল্যায়ন করা উত্তরপত্র বিতরণ করতেন, তখন আমি অত্যন্ত বিনীত ভঙ্গিতে তাঁকে বলতাম। স্যার, উত্তরের বাকি অংশের জন্য নম্বর কাটার প্রয়োজন নেই, আমাকে সরাসরি একটি শূন্য বা আন্ডা প্রদান করুন। কারণ সামান্য নম্বরে কোনো ডিম পাওয়া যায় না, অথচ একটি শূন্য পেলে আমার সংগ্রহে থাকা ডিমের সংখ্যা এক ডজন পূর্ণ হয়ে যেত। পরবর্তীতে সেই সংগৃহীত পণ্য আমি পাইকারি বাজারে বিক্রির জন্য পাঠিয়ে দিতে পারতাম।
সে সময় শিক্ষক মহোদয় সম্ভবত চরম রাগ ও ক্ষোভের বশে বলতেন, তুই একটি আস্ত গাধা! ঠিকমতো পড়াশোনা না করলে ভবিষ্যতে কি ডিম বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করবি নাকি?
বর্তমান সময়ে এসে জীবন যখন মধ্যবিত্তের কাঠখোট্টা বয়সে এসে উপনীত হয়েছে, তখন নিত্যপণ্যের বাজারদরের ভয়াবহ উল্লম্ফন দেখে মনে তীব্র বাসনা জাগে। অতীতের সেই শিক্ষাজীবনে খাতার পাতায় পাওয়া শূন্যগুলো যদি অলৌকিক উপায়ে বর্তমানে আমার বাসাবাড়ির হিমশৈত্যে এসে জমা হতো! তবে বর্তমান জীবনের সমস্ত কষ্ট এবং মধ্যবিত্ত পরিবারের নিত্যদিনের আর্থিক টানাপোড়েন মুহূর্তের মধ্যে একটি সুস্বাদু ডিমের পোচের মতো মিলিয়ে যেত।
আমি তখন অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী ও বিজয়ের হাসি হেসে শিক্ষককে প্রতিউত্তর দিয়ে বলতাম, স্যার, আপনার অকৃপণ আশীর্বাদে আমি বর্তমান সময়ে এই লাভজনক ব্যবসার পূর্ণাঙ্গ ডিলারশিপ অর্জন করেছি। আপনি অনুগ্রহ করে উত্তরপত্রে লাল কালির প্রয়োগ আরও একটু তীব্রভাবে করুন, যেন প্রস্তুত হওয়া ডিমের আকৃতি দেশি হাঁসের ডিমের মতো বেশ বড় হয়।
একটু গভীরভাবে চিন্তা করলে দেখা যায়, আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের সকল অর্থনৈতিক সমীকরণ ও হিসাব সম্পূর্ণ বদলে যেত। অর্থসংকট কিংবা আর্থিক সামর্থ্য নিয়ে আমাকে কখনোই কোনো ধরনের দুশ্চিন্তা করতে হতো না।
আমার সম্পূর্ণ মনোযোগ ও কৌতূহল কেবল আন্ডা ইনডেক্সের ওঠানামার দিকে নিবদ্ধ থাকত। এলাকার সংযোগ সড়কের মোড়ে অবস্থিত খুচরা দোকানে আমার ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের নামে একটি বড় সাইনবোর্ড ঝুলতে দেখা যেত। যেখানে লেখা থাকত, এই প্রতিষ্ঠানে অর্গানিক পদ্ধতিতে উৎপাদিত, পাশাপাশি হিসাববিজ্ঞান ও গণিত বিষয়ে ফেল করা খাঁটি খাতার ডিম সুলভ মূল্যে পাওয়া যায়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক এবং ইনস্টাগ্রামের পাতায় আমার নতুন নতুন ছবি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ত। আমার ছবি সংকলনের পেছনে থাকত একটি বিশাল আকৃতির ডিমের ট্রাক। ছবিগুলোর ক্যাপশনে লেখা থাকত, আমাদের বিদ্যালয়ের শ্রদ্ধেয় শিক্ষকগণই হলেন আমার বর্তমান সফলতার মূল অনুপ্রেরণা। তাঁরা সেদিন আমাকে ওই খাতার নম্বর না দিলে আজ আমি এত বড় ডিমের পাইকারি আড়তের মালিক হতে পারতাম না।
পরিশেষে বলতে হয়, মানুষের জীবন সত্যিই বড়ই অদ্ভুত ও রহস্যময়। শৈশবের দিনগুলোতে যে শূন্য বা আন্ডা পাওয়ার আতঙ্কে রাতের ঘুমে ব্যাঘাত ঘটত এবং মায়ের শাসনের মুখে পড়ে চোখের জল ফেলতে হতো, বর্তমান মধ্যবিত্ত বয়সে এসে সেই একই জিনিসের জন্য মন আকুল হয়। নিত্যপণ্যের বাজারের আকাশছোঁয়া দামের ধাক্কায় মনে হয়, যদি অতীতের সেই শূন্যগুলো জাদুবলে বর্তমানের ফ্রিজে জমা হতো, তবে জীবনের সব দুঃখ এক নিমেষে দূর হয়ে যেত।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।