
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
হেমন্তকালের এক সকালে পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় মহানন্দা নদীর পাড়ে সমবেত হন একদল মানুষ। ভারতের সীমানাঘেঁষা ওই নদীর ওপারে তখন মৃদু আলো ফুটতে শুরু করেছে। ঠিক তখনই উত্তর দিকের সুদূর দিগন্তে চোখ পড়লে নজরে আসে সাদা রঙের কিছু বরফাবৃত চূড়া। ভোরের প্রথম রশ্মি যখন ওই পাহাড়গুলোর গায়ে এসে পড়ে, তখন সেগুলো পাল্টে ফেলে রূপ। কখনো গোলাপি, কখনো সোনালি আবার কখনো উজ্জ্বল সাদার ঝিলিক দেখা যায় সেখানে। আকাশজুড়ে ভেসে থাকা ওই দৃশ্য দেখে মনে হতে পারে কেউ বুঝি বরফের পাহাড় সাজিয়ে রেখেছে।
প্রতিবছর এই মনোমুগ্ধকর দৃশ্য উপভোগ করতে দেশের নানা প্রান্ত থেকে বহু পর্যটক ভিড় করেন পঞ্চগড়ে। তাদের প্রধান গন্তব্য থাকে তেঁতুলিয়া, আর লক্ষ্য থাকে নিজ দেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে হিমালয়ের কাঞ্চনজঙ্ঘা অবলোকন করা। তবে প্রশ্ন জাগে, দেশের সীমান্ত থেকে এত দূরের পর্বত কীভাবে দেখা সম্ভব? আমরা আসলে এটার কতটুকু দেখতে পাই? আর হিমালয় ও কাঞ্চনজঙ্ঘা কি একই বিষয়? এসব প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর খুঁজতে হলে জানতে হবে এই পর্বতের ভৌগোলিক অবস্থান ও পরিচয়।
অনেকেই তেঁতুলিয়ায় গিয়ে হিমালয় দেখার কথা বললেও ভৌগোলিক দিক থেকে এই দুটি নামের মধ্যে তফাত রয়েছে। এশিয়ার বিস্তীর্ণ উত্তরাঞ্চলজুড়ে রয়েছে হিমালয় নামক সুবিশাল এক পর্বতমালা। বিশ্বের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ এভারেস্টসহ বহু উঁচু পর্বত এই পর্বতমালারই অংশ। অন্যদিকে কাঞ্চনজঙ্ঘা হলো হিমালয়েরই একটি বিশেষ পর্বতগুচ্ছ, যার প্রধান শৃঙ্গটি সমুদ্রপৃষ্ট থেকে প্রায় ২৮ হাজার ১৬৯ ফুট বা ৮ হাজার ৫৮৬ মিটার উঁচুতে অবস্থিত। উচ্চতার বিবেচনায় এটি এভারেস্ট এবং কে-টু এর পরেই বিশ্বের তৃতীয় সর্বোচ্চ পর্বত হিসেবে পরিচিত।
নেপাল ও ভারতের সিকিম রাজ্যের সীমান্ত এলাকায় অবস্থিত কাঞ্চনজঙ্ঘার রয়েছে পাঁচটি প্রধান শৃঙ্গ। এই নামের প্রচলিত অর্থটিকে বরফের পাঁচটি মহামূল্যবান ভান্ডারের সঙ্গে তুলনা করা হয়। অর্থাৎ তেঁতুলিয়া থেকে দর্শনার্থীরা পুরো হিমালয় পর্বতমালা দেখতে পান না, তারা মূলত দেখেন হিমালয়ের এই কাঞ্চনজঙ্ঘা পর্বতগুচ্ছের অতি দূরবর্তী একটি রূপ। দেশের মাটি থেকে ঠিক কতটা দেখা যায়, তা নিয়ে পর্যটকদের কৌতূহলের অন্ত নেই। তেঁতুলিয়া থেকে এই পর্বতের পাদদেশ, উপত্যকা বা সম্পূর্ণ অংশ দেখার সুযোগ নেই।
দূরত্ব, পৃথিবীর বক্রতা, বায়ুমণ্ডলের বর্তমান অবস্থা এবং মাঝখানের ভূপ্রকৃতির কারণে পর্বতের নিচের অংশটি সম্পূর্ণ আড়ালে থেকে যায়। তেঁতুলিয়া থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘার সরলরৈখিক দূরত্ব প্রায় ১৫০ কিলোমিটারের মতো। এত দূরে অবস্থিত হওয়া সত্ত্বেও পর্বতটি দৃশ্যমান হওয়ার মূল কারণ এর বিশাল উচ্চতা। সাধারণত সমতল ভূমি থেকে এতটা দূরের নিচু কোনো বস্তু খালি চোখে দেখা যায় না। কিন্তু এর চূড়া চারপাশের বাকি ভূপ্রকৃতির চেয়ে অনেক বেশি উঁচুতে থাকায় আবহাওয়া অনুকূল থাকলে উত্তর দিগন্তে তা স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে।
খালি চোখে আমরা বরফে ঢাকা যে সাদা রেখা দেখি, তা কোনো সাধারণ মেঘের দল নয়। এটি পুরোপুরি বরফাবৃত আসল পর্বতশৃঙ্গ। তবে এত দূরের চূড়াগুলোকে আলাদাভাবে চেনার জন্য দরকার সঠিক ভৌগোলিক ধারণা। দূরত্বের কারণে কাঞ্চনজঙ্ঘাকে অনেক সময় আকাশে ভেসে আছে বলে মনে হয়। বিশেষ করে নিচের অংশ যখন কুয়াশা বা ধোঁয়াশায় ঢাকা থাকে, তখন এই অনুভূতি আরও প্রবল হয়। পর্বতটি সারা বছর নির্দিষ্ট স্থানেই স্থির থাকে, তবে বছরের কেবল নির্দিষ্ট কিছু মাসেই এর দেখা মেলে।
এই রহস্যের চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে আবহাওয়ার ওপর। বর্ষাকালে বাংলাদেশের আকাশে মেঘের আধিক্য থাকে অনেক বেশি। বাতাসে প্রচুর জলীয় বাষ্প ও বৃষ্টির কারণে তখন দূরের কোনো পর্বতশৃঙ্গ দেখা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। বর্ষার ঋতু বিদায় নেওয়ার পর শরৎ ও হেমন্তকালে মাঝেমধ্যেই আকাশ পরিষ্কার থাকে। ওই সময় বাতাসে মেঘ এবং দৃশ্যমানতা কমিয়ে দেয় এমন উপাদানের উপস্থিতি কম থাকায় কাঞ্চনজঙ্ঘা স্পষ্ট হয়ে ধরা দেয়।
সাধারণত অক্টোবরের মাঝামাঝি থেকে নভেম্বরের শেষ পর্যন্ত সময়টিকে কাঞ্চনজঙ্ঘা দর্শনের সবচেয়ে উপযোগী মৌসুম ধরা হয়। যদিও সেপ্টেম্বরের শেষদিকেও কখনো কখনো এর দেখা পাওয়ার সৌভাগ্য হয় অনেকের। অনুকূল আবহাওয়া থাকলে ডিসেম্বর কিংবা জানুয়ারি মাসেও এটি দৃশ্যমান হতে পারে। তবে শীত যত বেশি জেঁকে বসে, উত্তরাঞ্চলে ঘন কুয়াশার উপদ্রব তত বাড়তে থাকে। ফলে শীতকালে আকাশ মেঘমুক্ত থাকলেও কুয়াশার চাদরে ঢাকা পড়ে যেতে পারে কাঞ্চনজঙ্ঘা।
তাই শীতকাল মানেই পর্বতটি দেখতে পাওয়ার নিশ্চিত কোনো ব্যাপার নয়। বরং মেঘ ও কুয়াশামুক্ত ঝকঝকে আকাশই এখানে সবচেয়ে বড় শর্ত। এমনকি ২০২৬ সালের আগস্টেও নির্ধারিত সময়ের আগে পঞ্চগড় থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা দৃশ্যমান হওয়ার খবর সামনে এসেছে। এই ব্যতিক্রমী ঘটনা প্রমাণ করে যে পর্বত দেখার বিষয়টি ক্যালেন্ডারের পাতার নির্দিষ্ট তারিখের চেয়ে সম্পূর্ণ নির্ভর করে আবহাওয়ার ওপর।
দেশে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার জন্য সবচেয়ে পরিচিত এবং জনপ্রিয় স্থান হলো পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া। তবে শুধু তেঁতুলিয়া থেকেই এটি দেখা যায়, এমন ধারণা পুরোপুরি ঠিক নয়। পরিষ্কার আবহাওয়া থাকলে পঞ্চগড় জেলার অন্যান্য উন্মুক্ত স্থান থেকেও পর্বতটির দেখা মেলে। এমনকি পার্শ্ববর্তী ঠাকুরগাঁও জেলা থেকেও একাধিকবার এই পর্বত দৃশ্যমান হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। তেঁতুলিয়া ডাকবাংলো ও মহানন্দা নদীর তীর কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার প্রধান ও সবচেয়ে জনপ্রিয় কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।
নদীর উঁচু পাড়ে দাঁড়িয়ে উত্তর দিগন্তের পসরা দেখা যায়। সামনে বয়ে চলা মহানন্দা, ওপারে ভারতের ভূখণ্ড আর দূরে বরফে ঢাকা পাহাড়—সব মিলিয়ে এই পরিবেশ পর্যটকদের দারুণভাবে টানে। এ ছাড়া তেঁতুলিয়ার বাংলাবান্ধা ও শালবাহানের খোলা জায়গা থেকেও অনুকূল আবহাওয়ায় কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা সম্ভব। কেবল সীমান্তবর্তী তেঁতুলিয়ায় যাওয়া বাধ্যতামূলক নয়, পরিষ্কার দিনে পঞ্চগড় জেলা শহরের করতোয়া সেতু কিংবা উঁচু কোনো ভবন থেকেও পর্বতটি দেখা যাওয়ার কথা জানা যায়।
ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার আকচা ইউনিয়নের বুড়িরবাঁধ ও বালিয়াডাঙ্গী সড়কের আশপাশসহ জেলার বিভিন্ন ফাঁকা স্থান থেকেও কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার খবর প্রকাশিত হয়েছে। পাশাপাশি উত্তরবঙ্গের দিনাজপুর, নীলফামারী এবং লালমনিরহাটের কিছু নির্দিষ্ট এলাকা থেকেও বিশেষ আবহাওয়ায় দূরের হিমালয় দেখার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন ভ্রমণপিপাসুরা। তবে এসব এলাকার দৃশ্যমানতা তেঁতুলিয়া বা পঞ্চগড়ের মতো নিয়মিত নয়, যে কারণে পর্যটনের নির্ভরযোগ্য গন্তব্য হিসেবে পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁওকেই বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়।
কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার ক্ষেত্রে কেবল মাস নির্বাচনই যথেষ্ট নয়, দিনের কোন সময়টিতে দেখা হচ্ছে তাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভোরবেলা সূর্য ওঠার আগে কিংবা ঠিক পরপরই এই পর্বতের সৌন্দর্য সবচেয়ে বেশি বিকশিত হয়। প্রথম ভোরের আলো যখন বরফের ওপর পড়ে, তখন সেখানে তৈরি হয় কখনো গোলাপি, কখনো সোনালি আভা। সূর্যের অবস্থানের সঙ্গে সঙ্গে পর্বতের সেই রঙেও পরিবর্তন আসে। কিছুক্ষণ পর সোনালি সেই আভা মিলিয়ে গিয়ে শৃঙ্গগুলো আবার ঝকঝকে সাদা রূপ ধারণ করে।
সকালে চমৎকার দেখা গেলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেক সময় ধোঁয়াশা তৈরি হতে পারে। আবার কোনো কোনো দিন বিকেলের পড়ন্ত আলোতেও পর্বতটিকে একদম নতুন রূপে দেখা যায়। তবে নির্দিষ্ট কোনো সময়ে উপস্থিত হলেই যে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা মিলবে, তার কোনো পাকা নিশ্চয়তা নেই। তাই ভ্রমণপিপাসুদের অন্তত দুই দিনের পরিকল্পনা নিয়ে যাওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে। এতে প্রথম দিন আবহাওয়া খারাপ থাকলেও পরের দিন কাঙ্ক্ষিত দৃশ্য দেখার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।