
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
প্রাচীন উপনিষদের দর্শনে আত্মসংযম, নৈতিক শৃঙ্খলা এবং আত্মজিজ্ঞাসার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। বৃহদারণ্যক উপনিষদে বর্ণিত বিখ্যাত ‘দ’ অক্ষরের উপদেশে দমন, দান ও দয়া প্রদর্শনের মাধ্যমে মানুষের লোভ, ক্রোধ ও অহংকার নিয়ন্ত্রণের যে তাগিদ রয়েছে, তা থেকেই জ্ঞানের প্রকৃত অর্থ খুঁজে পাওয়া যায়।
বিভিন্ন প্রাচীন ও আধুনিক দর্শনেও একই সুর দেখতে পাওয়া যায়। যেমন ইসলাম ধর্মে সংযম পালনের পাশাপাশি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে, বৌদ্ধ দর্শনে দ্বেষ দূর করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে এবং খ্রিষ্টধর্মের নৈতিক শিক্ষায় প্রতিবেশীর প্রতি ভালোবাসা প্রদর্শনের দীক্ষা দেওয়া হয়েছে।
পৃথিবীর উন্নত দেশের উচ্চশিক্ষালয়গুলো যখন মহাকাশ গবেষণা, চিকিৎসা বিজ্ঞানের নবদিগন্ত উন্মোচন এবং জলবায়ু পরিবর্তন রোধের প্রযুক্তি নিয়ে ব্যস্ত, তখন আমাদের দেশের শিক্ষাঙ্গনে ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। এখানে বিভিন্ন ক্যাম্পাসে ধর্মীয় সংঘাত বা বৈরিতা নিয়ে নানা গবেষণা ও চর্চা হতে দেখা যায়।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে যে গুরুতর প্রশ্নগুলো উত্থাপিত হয়েছে, তা কেবল একটি নির্দিষ্ট শিক্ষাঙ্গনের সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং আমাদের উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো কি আদৌ যুক্তিবাদী, সংযত স্বভাবের এবং মানবিক গুণসম্পন্ন জনশক্তি তৈরি করতে পারছে?
নাকি উল্টো পরিচয়ের অন্ধ অহংকার দেখিয়ে অন্যদের অবমূল্যায়ন করার মানসিকতাকে নীরবে উৎসাহিত করা হচ্ছে? হাতে থাকা প্রাতিষ্ঠানিক সনদ কেবল প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনার প্রমাণ দেয়, কিন্তু এর মাধ্যমেই কেউ বিবেকবান মানুষ হয়ে উঠেছে এমন নিশ্চয়তা পাওয়া যায় না।
একজন প্রকৃত শিক্ষিত মানুষের পরিচয় তার আচরণে ফুটে ওঠে, যেখানে ভিন্ন মতামতের প্রতি পূর্ণ সম্মান থাকে, ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে সংযম দেখানো হয় এবং অন্যের অধিকারের সুরক্ষায় আন্তরিকতা থাকে।
এই ভূখণ্ডে কোনো বিশেষ ধর্মীয় পরিচয় কাউকে উৎকৃষ্ট নাগরিকের মর্যাদা দেয় না। একইভাবে কোনো রাজনৈতিক দলের সাংগঠনিক পদবি কাউকে দেশের প্রচলিত আইনের ঊর্ধ্বে স্থান দিতে পারে না।
দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের শিক্ষার্থী হওয়ার সুবাদে কেউ কখনো দায়মুক্তির সুযোগ পেতে পারে না। এই মৌলিক সত্যগুলো সমাজে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হলে কেবল উচ্চতর ডিগ্রির সংখ্যাই বাড়বে, কিন্তু শিক্ষার আসল সম্মান বা মান বৃদ্ধি পাবে না।
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের একটি বিখ্যাত বাণীর কথা এক্ষেত্রে স্মরণ করা যায়। তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলেছেন যে ভিতরের দিক থেকে ক্ষয়ে যাওয়ার পর কেবল বাইরের দিকে গবাদিপশুর মতো হিসাব বা সংখ্যা বাড়িয়ে কোনো লাভ হয় না।
আমাদের মনে এই প্রশ্ন জাগে যে, আমরা কি এমন একটি রাষ্ট্র দেখতে চাই যেখানে কেবল ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে দেশের সাধারণ নাগরিকেরা গভীরভাবে বিভক্ত হয়ে পড়বে? আমরা কি এমন উচ্চশিক্ষালয় প্রত্যাশা করি যেখানে স্লোগানের উচ্চস্বর যেকোনো যৌক্তিক আলোচনার গভীরতাকে পুরোপুরি ঢেকে দেবে?
এই জটিল পরীক্ষার সম্মুখীন শুধু সাধারণ শিক্ষার্থীরাই নয়, বরং এর সঙ্গে জড়িত শিক্ষক সমাজ, প্রশাসনিক কর্তাব্যক্তিরা, রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থাকেও সফলভাবে উত্তীর্ণ হতে হবে।
আজ শিক্ষাঙ্গনগুলোতে বিদ্বেষ ও বিভেদের যে বিষাক্ত বীজ রোপণ করা হচ্ছে, তার খেসারত হিসেবে ভবিষ্যতের পুরো সমাজকে এই বিষফল ভোগ করতে হবে।
সূত্র: আজকের পত্রিকা