
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
ভোরবেলা আকাশ পানে ডানা মেলে উড়ে যায় সাদা বকটি। সারাবেলা খোলা প্রান্তর কিংবা জলাশয়ের চারপাশ চষে বেড়ায় সে।
দিনশেষে সূর্য ডুবলে সে ঠিকই ফিরে আসে মাছ বিক্রেতার কোলে। খাঁচা কিংবা কোনো বন্ধন ছাড়াই তাদের এই সখ্য গড়ে উঠেছে।
নিজের হাতে পরম যত্নে বকটিকে খাবার তুলে দেন ওই মাছ ব্যবসায়ী। কখনো সে বসে থাকে তার কোলে, কখনো বা মাছ কাটার টেবিলে।
দোকানের একটু দূরে মালিক গেলে কাঠের পিঁড়িতে দাঁড়িয়ে পাহারা দেয় পাখিটি। অচেনা কেউ সামনে এলেই সেটি তেড়ে গিয়ে ভয় দেখাতে শুরু করে।
তবে জসিম উদ্দিন ফিরে আসামাত্রই সেটি সম্পূর্ণ শান্ত হয়ে যায়। গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার চকপাড়া গ্রামে এই দৃশ্য এখন নিয়মিত।
ওই এলাকার চকপাড়া মেডিক্যাল মোড়ে জসিম উদ্দিনের মাছের একটি দোকান রয়েছে। ত্রিশ বছর বয়সী এই মাছ বিক্রেতার সঙ্গেই কানি বকটির এই গভীর মিতালি দেখা যায়।
প্রায় অর্ধযুগ মাস আগের এক সকালে বসতভিটার পাশের বাঁশঝাড় থেকে ছানাটি নিচে পড়ে গিয়েছিল। দশ থেকে বারো দিন বয়সী সেই কুড়িয়ে পাওয়া ছানাটিকে বাসায় নিয়ে আসেন তিনি।
এতটুকু একটা প্রাণী একা বেঁচে থাকতে পারবে কি না তা নিয়ে তখন শঙ্কা ছিল। এরপর থেকেই শুরু হয় তার নিবিড় পরিচর্যা ও লালনপালন।
মাছের আড়ত বা দোকানের ভেতরেই জায়গা হয় ছোট্ট ছানাটির। একপর্যায়ে সে আকাশে উড়তেও শিখে যায়।
সে সময় চাইলে তাকে খাঁচায় আটকে রাখা সম্ভব ছিল কিন্তু তিনি তা করেননি। বর্তমানে সকালবেলা দোকান খোলার সঙ্গে সঙ্গেই বকটি ডানা মেলে দূরে চলে যায়।
নিয়মিতভাবে প্রতি দিন গোধূলি লগ্নে সে আবার দোকানে ফিরে আসে। এভাবে প্রতিদিন সন্ধ্যা থেকে রাত নয়টা পর্যন্ত সে মাছের দোকানে বসে সময় কাটায়।
এরপর দোকানপাট বন্ধ করে ফেলা হলেও বকটি ভেতরেই অবস্থান করে। মানুষ আর পাখির এই অদ্ভুত বন্ধুত্বের খবর ইতোমধ্যে চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে।
নানা প্রান্তের মানুষ কানি বকটিকে দেখার জন্য প্রতিদিন ভিড় জমান দোকানে। কৌতূহলী অনেকে পাখিটিকে চওড়া দামে কেনার প্রস্তাবও দিয়েছেন।
কিন্তু জসিম উদ্দিন সাফ জানিয়ে দিয়েছেন তিনি বকটিকে কোনোভাবেই বিক্রি করবেন না। শৈশব থেকে তিল তিল করে পাখিটিকে বড় করেছেন তিনি।
পাখিটির প্রতি এখন তার ভীষণ রকম ভালোবাসা ও টান জন্মেছে। নিজহাতে তাকে প্রতিদিন নিয়মিত খাবার খাওয়ান এই মাছ বিক্রেতা।
অনেকে এসে বকটি অন্য কারও কাছে হস্তান্তরের পরামর্শ দিলেও তিনি শোনেননি। ভালোবাসার টানেই তিনি পাখিটিকে নিজের কাছে আগলে রেখেছেন।
পাখিটির তীক্ষ্ণ ঠোঁটের আঘাতে চোখের ক্ষতি হতে পারে বলে অনেকে তাকে সতর্ক করেছেন। তবে মানুষের এসব নেতিবাচক কথায় কান দেননি জসিম।
তিনি স্পষ্ট জানান যে কারও কোনো পরামর্শই তিনি আমলে নেন না। বকটি ভালোবেসে ফিরে আসে বলেই তিনিও তাকে সমানভাবে ভালোবাসেন।
তাকে কখনো কোনো ধরনের বন্দিদশায় রাখেননি এবং ভবিষ্যতেও রাখবেন না। বকটি স্বাধীনভাবে ঘুরে বেড়িয়ে আবার সন্ধ্যায় নিরাপদ আশ্রয়ে ফিরে আসে।
প্রতিদিন সন্ধ্যায় পাখিটির এভাবে ফিরে আসার পেছনে বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। অভ্যাস, নিরাপত্তা কিংবা খাবারের আকর্ষণের বিষয়গুলো এর সাথে জড়িত।
স্থানীয় পরিবেশকর্মী সাইদ চৌধুরী এই বন্ধুত্বের বিষয়ে নিজস্ব মতামত ব্যক্ত করেছেন। তার মতে জসিম কানি বকটিকে কোনো খাঁচায় আটকে রাখেননি।
তার ধারণা পাখিটি সত্যিই জসিমের মায়াজালে জড়িয়ে পড়েছে। সারা দিন বাইরে কাটিয়েও তাই সে সন্ধ্যার সময় তার কাছে ছুটে আসে।
পশুপাখিরা যেন সবসময় তাদের নিজস্ব প্রাকৃতিক পরিবেশে স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকতে পারে।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।