
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
ইরান যুদ্ধের একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে মধ্যপ্রাচ্যে নিযুক্ত মার্কিন কূটনীতিকদের অনেকেই পরিবারসহ আকস্মিক ও দ্রুততার সঙ্গে অন্যত্র সরে গিয়েছিলেন এবং নিজেদের সন্তানদের জন্য নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনার ব্যবস্থা করেছিলেন। পরবর্তীতে বিভিন্ন ধরনের কঠিন পরিস্থিতি সামলে তাঁদের অনেকেই আবার স্ব স্ব কর্মস্থলে ফিরে আসেন। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে তাঁদের আবারও অবিলম্বে দপ্তর ছেড়ে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। হঠাৎ করে যুক্তরাষ্ট্রের এমন অতি সতর্কতামূলক ও কঠোর অবস্থানে চলে যাওয়ার পেছনে বড় কোনো কারণ রয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। চলতি বছরের শুরুর দিকে যখন ইরান যুদ্ধ চরম আকার ধারণ করেছিল, তখন মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন রাষ্ট্রে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস ও কূটনৈতিক মিশনগুলো থেকে তাদের কর্মীদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। সম্প্রতি ওই কূটনীতিক ও কর্মীরা নিজ নিজ কার্যালয়ে ফিরে পুনরায় কাজের পরিবেশ কিছুটা গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। ঠিক সেই মুহূর্তেই তাঁদের আবার নতুন করে দেশ ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হলো।
বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে সিএনএন-এর কাছে নিজেদের মতামত ব্যক্ত করতে গিয়ে একজন মার্কিন কূটনীতিক অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন যে, এই মুহূর্তের অবস্থাকে যদি বিশৃঙ্খল বলেও অভিহিত করা হয়, তবে সেটিও আসলে কম বলা হবে। এই পুরো পরিস্থিতি নিয়ে আমেরিকান ফরেন সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের (এএফএসএ) মুখপাত্র নিকি গেমার নিজের এক মন্তব্যে বলেছেন যে, চলতি বছরের শুরুর দিকে মার্কিন পরিবারগুলোকে যে চরম বিশৃঙ্খল ও অনিশ্চিত পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছিল, বর্তমান সময়ে ঠিক তারই পুনরাবৃত্তি ঘটতে দেখা যাচ্ছে। অনেক কূটনীতিক কর্মস্থলে ফিরে সবকিছু নতুন করে গুছিয়ে নেওয়ার ঠিক পরপরই আবার এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়ার নির্দেশ পেয়েছেন। স্বাভাবিকভাবেই তাঁরা বর্তমানে ভীষণভাবে হতাশ, চরম বিভ্রান্ত এবং তীব্র ক্ষুব্ধ হয়ে পড়েছেন।
গত ২১ অক্টোবর মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের পক্ষ থেকে অত্যন্ত কড়া ভাষায় একটি নতুন নির্দেশ জারি করা হয়। ওই আদেশে সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদসহ দেশটির মার্কিন দূতাবাস থেকে জরুরি নয় এমন সব কর্মী এবং তাঁদের পরিবারের সদস্যদের অবিলম্বে সৌদি আরব ত্যাগ করার নির্দেশ দেওয়া হয়। এই আকস্মিক পদক্ষেপে বাধ্য হওয়ার মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয় যে, সৌদি আরবের মাটিতে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের সশস্ত্র আক্রমণ আগের তুলনায় অনেক বেশি পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি সংঘটিত ইরান যুদ্ধের সূত্রপাত ঘটেছিল মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথভাবে চালানো এক সামরিক হামলার মধ্য দিয়ে। এরপর উভয় পক্ষের মধ্যকার ধারাবাহিক পাল্টাপাল্টি আক্রমণের ফলে যুদ্ধের শুরুর দিকের কয়েকটি সপ্তাহজুড়ে গোটা মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চল জুড়ে অত্যন্ত তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছিল।
সেই সময়কার সেই আগ্রাসী সামরিক পদক্ষেপের জোরালো জবাব দেওয়ার উদ্দেশ্যে ইসরায়েল এবং মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন মিত্রদেশের ভূখণ্ডে গড়ে ওঠা মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে ইরান একের পর এক শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছিল। যদিও বর্তমানে হরমুজ প্রণালি ও এর আশেপাশের এলাকায় কেবল পাল্টাপাল্টি হামলা সীমিত রয়েছে এবং যুদ্ধের শুরুর দিকের মতো সেই ভয়াবহ তীব্রতা আর দেখা যাচ্ছে না, তবুও ওয়াশিংটন কেন এত দ্রুততা ও হুড়োহুড়ি করে বিভিন্ন দেশের দূতাবাস ও কূটনৈতিক মিশনগুলো থেকে তাদের কর্মীদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করছে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। গত ২১ অক্টোবর মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর থেকে জারি করা সেই একই নির্দেশিকায় সৌদি আরবের মার্কিন দূতাবাস থেকে জরুরি নয় এমন কর্মী ও তাঁদের পরিবারকে অবিলম্বে সরিয়ে নেওয়ার জন্য ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের ক্রমাগত আক্রমণকেই প্রধান কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছিল।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে বারবার অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে সতর্ক করে বলা হয়েছে যে, এই ধরনের মারাত্মক সংঘাতগুলো যেকোনো মুহূর্তে আরও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার তীব্র আশঙ্কা রয়েছে। তবে কেবল সৌদি আরব একা নয়, বরং জর্ডান, বাহরাইন, কুয়েত, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং লেবাননের মতো মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি রাষ্ট্রে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস ও কূটনৈতিক মিশনগুলো থেকেও অত্যন্ত নিরবচ্ছিন্ন ও গোপনীয় প্রক্রিয়ায় নিজেদের কর্মীদের সরিয়ে নিচ্ছে মার্কিন প্রশাসন ওয়াশিংটন। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এএফপি এবং সংবাদমাধ্যম সিএনএনসহ বিশ্বের প্রভাবশালী বিভিন্ন গণমাধ্যম সূত্রে বিশ্বস্ত সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে এই চাঞ্চল্যকর খবরটি নিশ্চিত করা হয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর কেন হঠাৎ করে এই ধরনের কঠোর ও নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল, তার প্রকৃত কারণ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য উন্মোচিত হয় ঠিক তার দুই দিন পর।
গত ২৩ অক্টোবর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মর্যাদাপূর্ণ সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস তাদের প্রকাশিত এক বিশেষ প্রতিবেদনে অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করে জানায় যে, খোদ মার্কিন জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালক জে ক্লেটন পররাষ্ট্র দপ্তরের দপ্তরে একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ মেমো বা দাপ্তরিক স্মারক প্রেরণ করেছেন। ওই স্মারকে অত্যন্ত জোরালোভাবে একটি ভীতিকর সতর্কবার্তা প্রদান করা হয়েছে, যার বিষয়বস্তু জানার পর থেকেই মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের অন্দরে একধরনের প্রচণ্ড চাপা উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার পরিবেশ তৈরি হয়েছে। মার্কিন জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালক জে ক্লেটনের প্রেরিত ‘অগোপনীয়’ প্রকৃতির এই মেমোটির একটি অবিকল অনুলিপি ইতোমধ্যে অ্যাক্সিওসসহ আন্তর্জাতিক অঙ্গনের বেশ কয়েকটি স্বনামধন্য গণমাধ্যমের হাতে এসে পৌঁছেছে।
উক্ত মেমোতে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দারা অত্যন্ত বিশ্বস্ত সূত্রে জানতে পেরেছেন যে, মধ্যপ্রাচ্যসহ পৃথিবীর অন্যান্য বিভিন্ন অঞ্চলেও কর্মরত মার্কিন কূটনীতিক ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগতভাবে নিশানা করার তৎপরতা ও পরিকল্পনা ইরান সরকার ‘উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করেছে’। এমনকি মার্কিন নাগরিকদের ওপর পরিচালিত হতে যাওয়া ভয়াবহ প্রাণঘাতী হামলার বেশ কিছু গোপন পরিকল্পনা ইতোমধ্যে ‘প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে’ পৌঁছে গেছে। অ্যাক্সিওস সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালক জে ক্লেটন গত ২৩ অক্টোবর এই সংবেদনশীল মেমোটি দেশটির বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর দপ্তরে পাঠিয়েছিলেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বেশ কয়েকজন মার্কিন কর্মকর্তার বরাڌ দিয়ে বিশ্বের প্রভাবশালী দৈনিক নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে যে, মধ্যপ্রাচ্যের মাটিতে অবস্থানরত সাধারণ মার্কিন নাগরিকদের জীবনের প্রতি ইরানের পক্ষ থেকে যে হুমকি তৈরি হয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতি অনুযায়ী সেটি এখন তাদের ‘সর্বোচ্চ পর্যায়ে’ অবস্থান করছে। বিগত দিনে শুরু হওয়া এই ইরান যুদ্ধ সংঘটিত হওয়ার পর থেকে এ যাবৎকালের মধ্যে এত বেশি উচ্চমাত্রার হুমকি বা ভীতি এর আগে কখনোই দেখা যায়নি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেশ কয়েকজন মার্কিন কর্মকর্তা অ্যাক্সিওসকে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন যে, এই গোয়েন্দা তথ্যের নিখুঁত সত্যতার কারণেই মূলত মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত মার্কিন কর্মকর্তাদের সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় রাখা হয়েছে। এ ছাড়া, বৃহত্তর পরিসরে আঞ্চলিক সংঘাত চারদিকে ছড়িয়ে পড়ার প্রবল আশঙ্কার কারণে সেখানকার বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন দূতাবাস ও মিশনের কূটনৈতিক কর্মী সংখ্যা উল্লেখযোগ্যহারে কমিয়ে আনা হচ্ছে।
জে ক্লেটনের পাঠানো এই কঠোর সতর্কবার্তাটি ঠিক এমন এক স্পর্শকাতর সময়ে এসে উপস্থিত হয়েছে, যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসরায়েল যৌথভাবে এমন জোরালো ইঙ্গিত দিয়ে যাচ্ছে যে তারা যেকোনো মুহূর্তে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করতে পারে। তাদের এই আক্রমণাত্মক মনোভাবের পাল্টা জবাব দিয়ে তেহরান সরকারের পক্ষ থেকেও অত্যন্ত কঠোর ভাষায় হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, যদি মার্কিন বা ইসরায়েলি বাহিনী নতুন করে কোনো সামরিক আগ্রাসন চালায়, তবে তাদের এবারের তরফ থেকে দেওয়া পাল্টা জবাব অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী হবে। পেন্টাগনের দেওয়া তথ্য অনুসারে, চলমান এই ইরান যুদ্ধের কারণে এ পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন রণক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মোট ২১ জন সেনা সদস্য নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া সব মিলিয়ে প্রায় সাড়ে সাতশ জনেরও বেশি মার্কিন সেনা সদস্য বিভিন্ন মাত্রায় গুরুতর আহত হয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালক তাঁর মেমোতে ইরানের সম্ভাব্য যে ভয়ংকর পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করেছেন, তেহরান যদি শেষ পর্যন্ত সত্যিই সেই ধ্বংসাত্মক পথে পা বাড়ায়, তবে এর প্রভাব কেবল মধ্যপ্রাচ্যের গণ্ডির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং পৃথিবীর অন্যান্য বিভিন্ন দেশের ভূখণ্ডেও অবস্থানরত মার্কিন নাগরিকরা চরম হামলার প্রধান নিশানা হয়ে উঠতে পারেন। মেমোতে অন্তর্ভুক্ত করা এই চাঞ্চল্যকর গোয়েন্দা তথ্যগুলো কতটা বেশি আতঙ্কের জন্ম দেওয়ার মতো, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে চলছে গভীর বিশ্লেষণ। নিউইয়র্ক টাইমস সংবাদমাধ্যমটি এই সংবেদনশীল মেমোটির বিষয়বস্তু নিয়ে অত্যন্ত বিস্তারিত একটি বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে নাম প্রকাশ করতে অনিচ্ছুক মার্কিন প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে যে, সাম্প্রতিক বিগত সপ্তাহগুলোতে রাষ্ট্রদূতসহ অন্যান্য শীর্ষস্থানীয় মার্কিন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে পরিচালিত হতে পারে এমন হামলার হুমকির বিষয়বস্তু অত্যন্ত পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে মূল্যায়ন করে দেখা গেছে।
প্রাপ্ত সেই মূল্যায়ন থেকে জানা যায় যে, মধ্যপ্রাচ্যের পাশাপাশি ইরান সরকার ইউরোপ মহাদেশের ভেতরেও সম্ভাব্য কিছু সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তু আগে থেকেই চিহ্নিত করে রেখেছে। মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাতে দৈনিক নিউইয়র্ক টাইমস আরও অত্যন্ত উদ্বেগের সঙ্গে উল্লেখ করেছে যে, মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে বসবাসরত মার্কিন নাগরিকদের প্রতি তেহরানের হুমকি এখন ইতিহাসের ‘সর্বোচ্চ পর্যায়ে’ পৌঁছে গেছে। ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এমন ভয়ংকর মাত্রার হুমকি এর আগে কখনো পরিলক্ষিত হয়নি। এমনকি কিছু কিছু অত্যন্ত সংবেদনশীল গোয়েন্দা তথ্যে এমন ইঙ্গিতও স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে যে, প্রশিক্ষিত ইরানি এজেন্টরা এরই মধ্যে খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিজেদের ভূখণ্ডের ভেতরেও সুচারুভাবে সক্রিয় হয়ে উঠেছেন। অত্যন্ত গোপনীয় এই মেমোটির বিষয়বস্তু নিয়ে ওয়াশিংটন তথা মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখনো পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ্যে কোনো ধরনের মন্তব্য করা হয়নি।
নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মার্কিন প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন যে, ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের তরফ থেকে আসা লাগাতার হামলার হুমকি এবং সেই সঙ্গে ‘মার্কিন কূটনীতিক ও কর্মকর্তাদের সরাসরি লক্ষ্য করে ইরানের সম্ভাব্য সন্ত্রাসী হামলার পরিকল্পনা’—এই দুই সুনির্দিষ্ট ও শক্তিশালী কারণেই মূলত বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত মার্কিন কূটনৈতিক মিশনে কর্মরত কর্মীর সংখ্যা ব্যাপক হারে হ্রাস করার এই কঠোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। যদিও মার্কিন প্রশাসনের ভেতরেই ভিন্ন মত রয়েছে, যার প্রমাণ মিলেছে আরেক মার্কিন কর্মকর্তার বক্তব্যে। ওই কর্মকর্তা নিউইয়র্ক টাইমসকে ভিন্ন এক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে জানিয়েছেন যে, খোদ যুক্তরাষ্ট্রের নিজের দেশের ভেতর এবং বিশ্বের অন্যান্য রাষ্ট্রে বড় ধরনের হামলার এই পরিকল্পনাগুলো বাস্তবে সফলভাবে রূপায়ণ করার মতো পর্যাপ্ত সক্ষমতা ইরানের হাতে বেশ সীমিত রয়েছে। তাঁর নিজস্ব ভাষ্য অনুযায়ী, ইরানের নীতিনির্ধারকদের পরিকল্পনা তালিকায় যেসব ভয়ংকর ছক রয়েছে, তার সম্পূর্ণটা কার্যকর করার মতো বাস্তব সামরিক সামর্থ্য দেশটির নেই।
এখন প্রশ্ন উঠতে পারে যে, আসলেই কি ইরানের সেই প্রয়োজনীয় সামরিক সক্ষমতা নেই? যদি তর্কের খাতিরে ধরে নেওয়াও হয় যে তাদের সেই সামর্থ্য নেই, তবে প্রশ্ন জাগে—যুক্তরাষ্ট্র তবে কেন এত তাড়াহুড়ো করে তাদের দূতাবাসের কর্মীদের নিরাপদে সরিয়ে নিচ্ছে? এই প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট উত্তর পেতে হলে একবার চোখ বুলিয়ে নেওয়া যাক ঠিক কী ধরনের বিধ্বংসী অস্ত্রভাণ্ডার রয়েছে ইরানের হাতে এবং সেগুলোর প্রকৃত সক্ষমতা বা শক্তি কেমন। আধুনিক প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের সুনির্দিষ্ট মতামত অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি ও সামরিক সমীকরণে ইরানের সামরিক শক্তির অন্যতম প্রধান ও শক্তিশালী স্তম্ভ হলো দেশটির সুবিশাল ক্ষেপণাস্ত্রভান্ডার। বিভিন্ন প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞের দীর্ঘ পর্যালোচনা ও পরিসংখ্যান বলছে যে, মধ্যপ্রাচ্যের অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় খোদ ইরানের নিজস্ব ক্ষেপণাস্ত্রভান্ডারটি আয়তনে সবচেয়ে বড় এবং প্রযুক্তির দিক থেকে অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। অত্যন্ত শক্তিশালী ও ধ্বংসাত্মক ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং দীর্ঘ পাল্লার ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র—উভয় ধরনের আধুনিক ক্ষেপণাস্ত্রই বর্তমানে অত্যন্ত সুসজ্জিতভাবে রয়েছে এই মধ্যপ্রাচ্যের দেশটির শক্তিশালী সামরিক বাহিনীর হাতে।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।