
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
প্রকৃতির জন্য তৎপরতা স্লোগানকে সামনে রেখে আর্মেনিয়ার রাজধানী ইয়েরেভানে জাতিসংঘ বিশ্ব প্রাণবৈচিত্র্য সম্মেলনের ১৭তম আসর অনুষ্ঠিত হচ্ছে। গত ১৯ অক্টোবর শুরু হওয়া এই আন্তর্জাতিক মহাআয়োজন শেষ হবে আগামী ৩০ অক্টোবর। কৃষিজ, ভূমিজ, বন, জলাভূমি, দ্বীপ, সমুদ্র, উপকূল এবং পাহাড়ি প্রাণবৈচিত্র্য সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিয়ে এই সম্মেলন সাজানো হয়েছে। মূল সম্মেলনের পাশাপাশি একই সময়ে লিডার্স ফর নেচার সামিট, কার্টেজেনা প্রটোকলের ১২তম সভা, নায়োগা প্রটোকলের ষষ্ঠতম সভা এবং মন্ত্রীদের উচ্চপর্যায়ের সভাও অনুষ্ঠিত হয়েছে।
ব্রাজিলের রিও ধরিত্রী সম্মেলনে ১৯৯২ সালে গৃহীত প্রাণবৈচিত্র্য সনদের বা সিবিডির প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে প্রতি দুই বছর পর পর রাষ্ট্রপক্ষের এই সম্মেলন আয়োজিত হয়। এর আগে কানাডার মন্ট্রিলে ২০২২ সালে কুনমিং-মন্ট্রিল গ্লোবাল বায়োডাইভার্সিটি ফ্রেমওয়ার্ক বা কেএমজিবিএফ প্রণয়ন করা হয়েছিল। প্রাণবৈচিত্র্য সুরক্ষার এই বৈশ্বিক কর্মকাঠামোটি ২০৫০ সালের মধ্যে প্রকৃতিমুখী জীবনব্যবস্থা কায়েম করতে মোট চারটি দীর্ঘমেয়াদি এবং তেইশটি স্বল্পমেয়াদি কর্মভিত্তিক লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
স্থলভাগ, জলাভূমি এবং সমুদ্রের বাস্তুতন্ত্রের অন্তত ত্রিশ শতাংশ কার্যকরভাবে সংরক্ষণ করা এবং দখল ও অবক্ষয়ের হাত থেকে ত্রিশ শতাংশ বাস্তুতন্ত্র ফিরিয়ে আনা এই লক্ষ্যগুলোর অন্তর্ভুক্ত। এছাড়া প্রাণবৈচিত্র্য সংরক্ষণের কাজে বছরে দুইশো বিলিয়ন মার্কিন ডলার তহবিল সংগ্রহ করা, লোকায়ত ঐতিহ্যবাহী জ্ঞানের স্বীকৃতি ও সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং আদিবাসী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ ও অধিকার রক্ষা করার কথা রয়েছে। সিবিডি সনদ স্বাক্ষরকারী সব দেশকে ২০৩০ সালের মধ্যে এই তেইশটি লক্ষ্য বাস্তবায়ন করার কথা থাকলেও বিশ্বনেতৃত্ব বরাবরই তাদের সেই অঙ্গীকার ভঙ্গ করে আসছেন।
বিশ্বের নানা প্রান্তের বাস্তুতন্ত্র থেকে প্রতিদিন কোনো না কোনো প্রাণপ্রজাতি হারিয়ে যাচ্ছে এবং বাস্তুতন্ত্রের অবক্ষয় ঘটেই চলেছে। বিশ্বজুড়ে জেঁকে বসা প্রবল মানুষকেন্দ্রিক বা অ্যানথ্রোপোসেন্ট্রিক উন্নয়নচিন্তা মৌমাছি থেকে হাতি কিংবা অণুজীব থেকে শুরু করে বটগাছ—কারোরই জীবনরেখা নিরাপদ রাখছে না। বর্তমান বিশ্বে চলমান যুদ্ধ, অস্ত্রবাণিজ্য, অন্যায় খাদ্যব্যবস্থা, জবরদখল, ডিজিটাল উপনিবেশ স্থাপন, দূষণ এবং নব্য উদারতাবাদী বা নিওলিবারেল বাহাদুরি এই গ্রহকে ক্রমশ বৈচিত্র্যহীন করে তুলছে। মানুষসহ প্রতিটি প্রাণপ্রজাতির নিজ দায়িত্বে বেঁচে থাকা এবং স্বাভাবিকভাবে বিকশিত হওয়ার মৌলিক শর্তগুলো এভাবে নানা উপায়ে চুরমার করে দেওয়া হচ্ছে।
গত ২৬ অক্টোবর সকালে ঢাকা থেকে বিমানযোগে ইয়েরেভান বিমানবন্দরে অবতরণ করার পর আর্মেনিয়ার সাতটি উভচর ও শতাধিক হ্রদ এক স্নিগ্ধ অভ্যর্থনা জানায়। আর্মেনিয়ার এন্ডেমিক নীল প্রজাপতিকে এবারের এই সম্মেলনের প্রধান লোগো হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। বিমানবন্দর থেকে ট্যাক্সিতে করে রিপাবলিক স্কয়ারের দিকে যাওয়ার সময় ককেশাস পর্বতমালার দিকে তাকিয়ে লেখকের মনে পড়ে যায় বাংলাদেশের মধুপুর শালবনের একটি ফলের মাছির কথা। আর্মেনিয়ার নীল প্রজাপতির মতোই ওই মাছিটি মধুপুর বনের একটি এন্ডেমিক প্রাণী। যেসব প্রজাতি কেবল একটি সুনির্দিষ্ট নির্দিষ্ট বাস্তুতন্ত্রেই বসবাস করে এবং পৃথিবীর আর কোথাও যাদের প্রাকৃতিকভাবে দেখা মেলে না, মূলত তাদেরই এন্ডেমিক বলা হয়।
মধুপুর শালবনের ভেতরে হলুদ গোত্রের দুটি উদ্ভিদও এন্ডেমিক হিসেবে পরিচিত, যেগুলোকে বনের মান্দি আদিবাসীরা দিগ্গি সামজক বলে অভিহিত করেন। এই গাছগুলো মধুপুর শালবনের আদিবাসীদের লোকায়ত চিকিৎসা এবং তাদের বহু ধরনের আধ্যাত্মিক কৃত্যের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। ইয়েরেভানের মেরিডিয়ান এক্সিবিশন সেন্টারে নিবন্ধনের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে সম্মেলনের ভেতরে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গেই চারপাশের পরিবেশ বিষণ্ন হয়ে ওঠে। সেখানে টাঙানো একটি ব্যানারে লেখা রয়েছে যে, প্রবল বৃষ্টি, ভূমিধস ও ঘূর্ণিঝড় সেনিয়ারের কারণে ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রায় ২০২৫ সালে আটান্নটি তাপানুলি ওরাংওটাং মারা গেছে। বাংলাদেশের পাহাড়ি ঢল, আকস্মিক বন্যা, পাহাড়ধস, উত্তরাঞ্চলের খরা কিংবা প্রাকৃতিক বনে লাগা অগ্নিকাণ্ডের ফলে দেশের অভ্যন্তরে ঠিক কত প্রাণপ্রজাতি চিরতরে হারিয়ে গেছে, তার সঠিক হিসাব কারোরই জানা নেই।
একটি পাখি, মাছ, সরীসৃপ, উভচর প্রাণী, নদী, বন, গাছ কিংবা পতঙ্গের জীবন কি আদৌ কোনো জীবন-মরণের যন্ত্রণা মাথায় নিয়ে পরবর্তী কোনো সম্মেলনের জন্য অপেক্ষা করে থাকবে? নাকি আমরা বিশ্বজুড়ে সব ধরনের অঙ্গীকার বাস্তবায়নের পেছনে প্রকৃত ও দায়িত্বশীল তৎপরতা দেখতে পাব? ইয়েরেভানের চলমান এই সম্মেলন এখন পর্যন্ত এই কঠিন প্রশ্নগুলোর কোনো সঠিক উত্তর দিতে পারেনি। সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক পর্ব শুরু হওয়ার ঠিক আগে গত ১৬ অক্টোবর আয়োজিত লিডার্স ফর নেচার সামিটে বিশ্বনেতৃত্ব ইয়েরেভান ঘোষণায় খোলাখুলিভাবে এই স্বীকারোক্তি দিয়েছেন যে, বিশ্বজুড়ে প্রাণপ্রকৃতি সুরক্ষায় এ পর্যন্ত গৃহীত পদক্ষেপগুলো ২০৩০ সালের মধ্যে কাঙ্ক্ষিত বৈগোলিক লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য যথেষ্ট নয়।
পাশাপাশি ২০২৩ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী প্রাণবৈচিত্র্যের ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে এনে ২০৫০ সালের মধ্যে মানুষ ও প্রকৃতির শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করার নতুন অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। জাতীয় অর্থনীতিতে প্রাণবৈচিত্র্যের অন্তর্ভুক্তি ঘটানো, বাস্তুতন্ত্রের পুনরুদ্ধার ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং অর্থায়নের বৈশ্বিক আহ্বান ও সীমাবদ্ধতার বিষয়গুলোকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে বাস্তবমুখী তৎপরতা চালাতে বিশ্বনেতৃত্ব ইয়েরেভান ঘোষণার মাধ্যমেই রাজনৈতিক অঙ্গীকার করেছেন। কেএমজিবিএফের প্রথম বৈশ্বিক পর্যালোচনা অনুষ্ঠিত হচ্ছে এই ইয়েরেভান সম্মেলনে। ২০৩০ সালের মধ্যে প্রাণবৈচিত্র্য সুরক্ষায় গৃহীত তেইশটি বৈশ্বিক লক্ষ্য অর্জনে বিভিন্ন দেশের সম্মিলিত অগ্রগতি এবং জাতীয় প্রাণবৈচিত্র্য কৌশল ও কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন ও অর্থায়নের ঘাটতি নিয়ে সেখানে বিস্তারিত আলোচনা চলছে।
প্রাণবৈচিত্র্য রক্ষায় প্রয়োজনীয় অর্থায়ন ও তহবিল সংগ্রহ করা এবং লোকায়ত ঐতিহ্যবাহী জ্ঞানের সুরক্ষা দেওয়ার মতো বিষয়গুলোও আলোচ্যসূচিতে রয়েছে। এছাড়া এসব জ্ঞান থেকে সরাসরি কিংবা জেনেটিক সম্পদের ডিজিটাল সিকোয়েন্স বা ডিএসআই তথ্য ব্যবহারের মাধ্যমে যে সুফল তৈরি হয়, তার ন্যায্যবণ্টন কীভাবে হবে এবং এই ক্ষেত্রে উন্নয়নশীল দেশ, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠী কীভাবে উপকৃত হবে, তা নিয়ে আলোচনা চলছে। প্রকৃতির জন্য তৎপরতা প্রতিপাদ্যের আওতায় আয়োজিত এই সম্মেলনে প্রাণবৈচিত্র্য ও জলবায়ু সংকট মোকাবিলা, ওয়ান হেলথ স্বাস্থ্যচিন্তা, বাস্তুতন্ত্রের পুনরুদ্ধার, প্রাণবৈচিত্র্যের ওপর মানুষের চাপ কমানো, আগ্রাসী প্রজাতি রোধ এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা নিয়ে তীব্র দেনদরবার চলছে।
প্রাণপ্রকৃতি সুরক্ষার জন্য প্রতি বছর দুইশো বিলিয়ন মার্কিন ডলার তহবিল দেওয়ার অঙ্গীকারটি এখনো কাঠামোগতভাবে পুরোপুরি সুনির্দিষ্ট ও স্পষ্ট রূপ লাভ করেনি। এর আগে সর্বশেষ কালি প্রাণবৈচিত্র্য সম্মেলনে জেনেটিক সম্পদ থেকে প্রাপ্ত ডিজিটাল সিকোয়েন্স তথ্য বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের মাধ্যমে অর্জিত লাভের ন্যায্য ও সমতাভিত্তিক বণ্টনের উদ্দেশ্যে একটি কালি তহবিল গঠিত হয়েছিল। পরবর্তীতে ২০২৫ সালে ইতালির রোম শহরে আনুষ্ঠানিকভাবে সেই তহবিলটি চালু করা হয়। জেনেটিক সম্পদ-সংর্কান্ত ডিজিটাল তথ্য ব্যবহার করে লাভবান হওয়া বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানির কাছ থেকে লভ্যাংশ সংগ্রহ করে তা উন্নয়নশীল দেশ, আদিবাসী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সক্ষমতা এবং অধিকার সুরক্ষার কাজে ব্যয় করার কথা রয়েছে। এই সংগৃহীত তহবিলের ঠিক পঞ্চাশ শতাংশই আদিবাসী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অগ্রাধিকার ও অধিকার সুরক্ষায় খরচ করা হবে, যেখানে নারী ও যুবসমাজকে বিশেষ প্রাধান্য দেওয়ার জোরালো অঙ্গীকার করা হয়েছে।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।