
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
কক্সবাজার জেলার উখিয়া উপজেলার ইনানী এলাকায় মাটির গভীরে নলকূপ স্থাপনের সময় আকস্মিকভাবে গ্যাস বেরিয়ে সৃষ্টি হওয়া আগুন গত চার দিন ধরে ধারাবাহিকভাবে জ্বলছে। এই দীর্ঘ সময় ধরে গ্যাসের প্রবাহ ও অগ্নিশিখা বন্ধ না হওয়ায় স্থানীয় পর্যায়ে বড় ধরনের কোনো বড় দুর্ঘটনা ঘটার শঙ্কা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। সম্ভাব্য বিপদের ঝুঁকি এড়াতে এবং জনসাধারণের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ওই জায়গার চারপাশের অন্তত ২০০ বর্গমিটার পরিধিভুক্ত এলাকায় সব ধরনের লোকসমাগম নিষিদ্ধ করে ১৪৪ ধারা জারি করেছে স্থানীয় প্রশাসন।
গত শুক্রবার প্রাক্কালে সরকারের জ্বালানি খাতের নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা বাংলাদেশ পেট্রোবাংলা এবং রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাপেক্সের উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদল সরাসরি ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে পরিস্থিতি খতিয়ে দেখেছে। গ্যাস উদগীরণ থামানোর উপায় খোঁজার পাশাপাশি এর ভূগর্ভস্থ উৎস এবং সম্ভাব্য মজুতের পরিধি সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট ধারণা লাভের উদ্দেশ্যে তাঁরা মাঠপর্যায়ে সার্বিক পরিস্থিতি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন।
উখিয়া উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা পান্না আক্তার স্বাক্ষরিত দাপ্তরিক আদেশে জানানো হয়েছে যে, পরবর্তী কোনো নতুন নির্দেশনা না আসা পর্যন্ত এই নিষেধাজ্ঞা বলবৎ থাকবে। প্রাকৃতিক গ্যাসের উৎস শনাক্ত হওয়ায় কারিগরি টিম সেখানে পৌঁছেছে এবং উদ্ভূত পরিস্থিতি শান্তিপূর্ণভাবে মোকাবিলা করতে এবং মানুষের জীবন রক্ষা করতেই এই কঠোর প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
উচ্চপর্যায়ের এই পরিদর্শন দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন পেট্রোবাংলার অপারেশন ও মাইনস বিভাগের পরিচালক প্রকৌশলী মো. শোয়েব, যাঁর সঙ্গে বাপেক্সের ভূতাত্ত্বিক বিভাগের মহাব্যবস্থাপক শামসিয়া মুকতাদিরসহ বেশ কয়েকজন বিশেষজ্ঞ কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন। মাঠের অবস্থা সরেজমিন ঘুরে দেখার পর পেট্রোবাংলার পরিচালক গণমাধ্যমকে জানান যে, প্রাথমিক ধারণার ভিত্তিতে এটি ভূগর্ভের কোনো অগভীর গ্যাসের স্তর বা শ্যালো রিজার্ভার হতে পারে।
সাধারণত আমাদের দেশে ভূগর্ভের দেড় থেকে পাঁচ কিলোমিটারের ভেতর গ্যাসের খনি বা মজুত পাওয়া যায়, তবে ইনানীতে গ্যাসের আসল উৎস ও প্রকৃত পরিমাণ কতখানি তা নিয়ে পুরোপুরি নিশ্চিত হতে টানা পনেরো দিন ধরে পর্যবেক্ষণ চালানো হবে। এই নির্দিষ্ট সময়সীমায় আগুনের শিখার উচ্চতা এবং সেখান থেকে গ্যাস নির্গমনের মাত্রা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করবেন বিশেষজ্ঞরা।
উক্ত পনেরো দিনের পর্যবেক্ষণকাল পেরিয়ে যাওয়ার পর যদি দেখা যায় যে আগুনের শিখার উচ্চতা বৃদ্ধি পেয়েছে কিংবা আগের অবস্থাতেই অপরিবর্তিত রয়েছে, তবে সেই আগুন নেভানোর প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে একটি রিলিফ কূপ খননের পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হবে। এই বিশেষ পরিস্থিতিতে সাইড ট্র্যাকিং প্রযুক্তি প্রয়োগ করে রিলিফ কূপ খনন করার মাধ্যমে গ্যাসের অবিরত নির্গমন পুরোপুরি বন্ধ করার চেষ্টা চালানো হবে, যা গোটা পৃথিবীতে এ জাতীয় আকস্মিক সংকট মোকাবেলায় সফলভাবে ব্যবহার করা হয়ে থাকে।
পেট্রোবাংলার দায়িত্বশীল এই কর্মকর্তা আরও উল্লেখ করেন যে, মূল জায়গার আশপাশে অবস্থিত ভিন্ন কয়েকটি ভূতাত্ত্বিক স্তর থেকেও গ্যাস বের হয়ে আগুন জ্বলতে দেখা গেছে, যা ভূগঠনে সামান্য কোনো পরিবর্তন ঘটার কারণে হতে পারে বলে অনুমান করা হচ্ছে। পরবর্তী সময়ে বাপেক্স ওই এলাকায় ত্রিমাত্রিক বা থ্রিডি ভূকম্পন জরিপ পরিচালনা করবে এবং জরিপ থেকে প্রাপ্ত তথ্যাদি বিশ্লেষণ করে গ্যাসের বাণিজ্যিক মজুত পাওয়ার সম্ভাবনা কতখানি তা যাচাই করা হবে।
যদি পরবর্তীতে অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক কোনো গ্যাসের মজুত খুঁজে পাওয়া যায়, তবে সেখানে নতুন কূপ খনন করার সুনির্দিষ্ট উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে, আর পর্যবেক্ষণের মাঝপথে গ্যাসের প্রাকৃতিক প্রবাহ নিজে থেকেই কমে যায় বা বন্ধ হয় তবে সেই অনুযায়ী পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। অন্যদিকে, বাপেক্সের ভূতাত্ত্বিক বিভাগের মহাব্যবস্থাপক শামসিয়া মুকতাদির গণমাধ্যমকে জানান যে, এ ধরনের অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতি সফলভাবে সামাল দেওয়ার মতো যথেষ্ট অভিজ্ঞতা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাপেক্সের রয়েছে এবং নিজস্ব ব্যবস্থাপনাতেই এই সংকট মোকাবেলা সম্ভব।
নিরাপত্তার বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেই তাঁদেরকে অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে, কারণ যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা ঘটার ঝুঁকি রয়ে গেছে। বিভিন্ন সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী জানা যায়, বাপেক্স ও পেট্রোবাংলার কর্মরত বিশেষজ্ঞ ছাড়াও দেশের বেশ কয়েকজন অবসরপ্রাপ্ত মহাব্যবস্থাপককে যুক্ত করে গত বৃহস্পতিবার পেট্রোবাংলার কার্যালয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
উক্ত সভায় প্রাথমিক আলোচনায় এটি ধারণা করা হয়েছিল যে মাটির নিচ থেকে নির্গত হওয়া এই গ্যাসটি থার্মোজেনিক কিংবা বায়োজেনিক উভয় প্রকৃতির হতে পারে এবং বিষয়টি বাস্তবে যাচাই করতে এই উচ্চপর্যায়ের বিশেষজ্ঞ টিমকে ইনানীতে পাঠানো হয়। গত ২৭ অক্টোবর মঙ্গলবার প্রাতঃকালে সাতটার দিকে ইনানী মেরিন ড্রাইভ সংলগ্ন ছোট সেতুর কাছে মোস্তফা সিকদারের বাড়ির আঙিনায় গভীর নলকূপ বসানোর সময় হঠাৎ গ্যাস বের হয়ে এই আগুনের সূত্রপাত ঘটেছিল।
গত শুক্রবার রাত এগারোটা পর্যন্তও সেই আগুন কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি এবং সেনাবাহিনী, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ, পুলিশ বাহিনী, ফায়ার সার্ভিস এবং বাপেক্সের প্রশিক্ষিত বিশেষজ্ঞরা সার্বক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থলে অবস্থান করছেন। দীর্ঘ সময় ধরে এভাবে আগুন জ্বলতে থাকায় তা নিজ চোখে দেখার জন্য দূরদূরান্ত থেকে শত শত মানুষ মেরিন ড্রাইভ ও ছোট সেতু এলাকার চারিপাশে ভিড় জমাচ্ছেন।
জনগণের নিরাপত্তা রক্ষা ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমাতেই মূলত বৃহস্পতিবার রাত থেকেই ওই এলাকার অন্তত ২০০ বর্গমিটার জায়গায় অনির্দিষ্টকালের জন্য ১৪৪ ধারা জারি করেছে উপজেলা প্রশাসন, যার পরও সাধারণ মানুষের কৌতূহলী ভিড় ঠেকানো যাচ্ছে না। কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান সংবাদমাধ্যমকে জানান যে, নানা ধরনের চেষ্টা চালানো সত্ত্বেও নলকূপের মুখ থেকে বের হওয়া গ্যাসের আগুন নেভানো সম্ভব হচ্ছে না।
জেলা প্রশাসন, বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, ফায়ার সার্ভিস এবং বাপেক্সের টেকনিক্যাল টিম ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে কাজ করছে এবং শুক্রবার সকালেও বাপেক্সের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ঢাকায় থেকে এসে পরিস্থিতি সচক্ষে পর্যবেক্ষণ করেছেন। এর আগে বাপেক্সের বিশেষজ্ঞ টিম আগুনের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে সভা করে প্রশাসনকে নির্দিষ্ট কিছু নির্দেশনা প্রদান করেছে এবং সেই নির্দেশনা মোতাবেকই লোকসমাগম নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের নিয়োজিত কর্মীরা জানান যে, গত মঙ্গলবার সকালেও নলকূপের আগুন কিছুটা কম থাকলেও বিকেল পাঁচটার পর থেকে এর তীব্রতা দ্রুত বৃদ্ধি পেতে শুরু করে এবং শুক্রবার রাত পর্যন্ত একই রকম তীব্রতা বজায় ছিল। এর আগে ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশ সদস্যরা ঘটনাস্থলে প্রচুর পানি ও বালু ছিটিয়ে সেই আগুন নিভিয়ে ফেলার ব্যর্থ চেষ্টা চালান এবং স্থানীয় বাসিন্দারাও আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সাধ্যমতো সাহায্য করেছিলেন।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের কক্সবাজার অঞ্চলের জ্যেষ্ঠ স্টেশন কর্মকর্তা দোলন আচার্য্য সংবাদমাধ্যমকে পরিষ্কার করে জানান যে, বাপেক্স থেকে আসা বিশেষজ্ঞ দলের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা অনুযায়ী মাটির নিচের প্রাকৃতিক গ্যাস পুরোপুরি শেষ না হওয়া পর্যন্ত এই আগুন স্বাধীনভাবে জ্বলতে দেওয়া ছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।