
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
প্রকৃতিপ্রেমী হিসেবে পরিচিত তরুণ গায়িকা মাশা ইসলাম সুযোগ পেলেই ছুটে যান চারপাশের নানা প্রান্তে। জার্মান গণমাধ্যম ডিডব্লিউ ট্রাভেলের বাংলাদেশ সংক্রান্ত ভ্রমণ বিষয়ক ধারাবাহিক ভ্লগে সহ-সঞ্চালক হিসেবে কাজ করার পর তাঁর এই ঘোরাঘুরির শখ নতুন এক মাত্রা লাভ করেছে। দুর্গাপূজার ছুটির আগে তাঁর মন যখন বারবার পাহাড়ের টানে ব্যাকুল হয়ে উঠছিল, ঠিক সেই মুহূর্তে ঘটে গেল এক নাটকীয় ঘটনা। বান্দরবানে ট্রেকিং করার কথা ছিল তাঁর এক ঘনিষ্ঠ বন্ধুর, কিন্তু জরুরি ঝামেলায় পড়ে সেই বন্ধু যেতে না পেরে মাশাকে তাঁর পরিবর্তে যাওয়ার প্রস্তাব দেন। বিকেল পাঁচটার সেই মুহূর্তে বান্দরবানের বাস ছাড়ার কথা ছিল রাত আটটায়, আর হাতে মোটে তিন ঘণ্টা সময় থাকার পাশাপাশি সন্ধ্যা ছয়টায় একটি পূর্বনির্ধারিত সভাও ছিল। সব জটিলতা উপেক্ষা করে জীবনের ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তার কথা ভেবে তিনি ব্যাগ গুছিয়ে রওনা হয়ে যান এবং একদল অপরিচিত মানুষের সঙ্গে নতুন এক অভিযাত্রায় অংশ নেন।
দেশের বেসরকারি পর্যায়ে সর্বোচ্চ উচ্চতার পাহাড় সাকা হাফংয়ে ছিল তাঁদের চার দিনের এই দীর্ঘ ও রোমাঞ্চকর অভিযান। বাসের একদম শেষ আসনের ঝাঁকুনি সহ্য করে সকালে আলীকদম পৌঁছানোর পর সকালের খাবার ও শুকনো রেশনের ব্যবস্থা সেরে তাঁদের মূল হাঁটা শুরু হয় এবং সারাদিনের ক্লান্তিকর ট্রেকিং শেষে রাতে নিকোলাস পাড়ায় যাত্রা বিরতি হয়। সেখান থেকে পরবর্তী দিনে আবার হাঁটা শুরু করে অভিযانটির তৃতীয় দিন ভোরে তাঁরা কাঙ্ক্ষিত সাকা হাফংয়ের চূড়ায় পৌঁছাতে সক্ষম হন। উৎসবের আমেজে পর্যটকদের ভিড় থাকলেও পাহাড়ের কোল থেকে দেখা সেই অপরূপ ভোরের সূর্যোদয় এবং দীর্ঘ ক্লান্তি মাশার স্মৃতিতে চিরস্থায়ী হয়ে থাকবে।
মাশার কাছে পাহাড়ের এই ট্রেকিং কেবল ভ্রমণ নয়, বরং এটি নিজের ভেতরের শক্তিকে নতুন করে চ্যালেঞ্জ জানানোর একটি মাধ্যম। চরম প্রতিকূল পরিস্থিতি, খাওয়ার নির্দিষ্ট কোনো বন্দোবস্ত না থাকা, পোশাক পরিবর্তনের সুযোগের অভাব, শৌচাগারের অনুপস্থিতি এবং অবিরাম হেঁটে যাওয়ার ধকল সামলানো অত্যন্ত দুরূহ ছিল। চার দিনের এই সম্পূর্ণ যাত্রার প্রতিটা মুহূর্তই তাঁকে প্রতিনিয়ত পরীক্ষা করেছে এবং মনে করিয়ে দিয়েছে যে আর বুঝি সামনে এগোনো সম্ভব নয়, অথচ তারপরেও পথ চলতে হয়েছে। চূড়ায় ওঠার পর যে পরম শান্তি ও আনন্দের অনুভূতি পাওয়া যায়, তার সঙ্গে অন্য কিছুর তুলনা চলে না এবং এসব অভিযান মানুষের মনের জোরের চূড়ান্ত পরীক্ষা নেয়।
পূর্বপরিচিতি ছাড়াই একদম আকস্মিক সিদ্ধান্তে অপরিচিত একটি ভ্রমণ দলের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার অভিজ্ঞতাটি মাশার জন্য অত্যন্ত চমৎকার ছিল। দলের সবাই অত্যন্ত সহযোগিতাপূর্ণ মনোভাব দেখানোর ফলে চার দিন খুব সুন্দরভাবে কেটে যায় এবং দলের অনেকের কাছে তিনি জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী হওয়ায় তাঁরা প্রায়শই গানের অনুরোধ জানাতেন। এভাবে গান গাওয়ার মধ্য দিয়ে মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে সবার সঙ্গে সম্পর্কের গভীরতা আরও বৃদ্ধি পায় এবং দলের বাইরেও ছুটিতে ঘুরতে যাওয়া অন্যান্য পর্যটকদের অনেকেই তাঁকে সেখানে দেখতে পেয়ে ভীষণ অবাক হয়ে আনন্দ প্রকাশ করেন।
এই সম্পূর্ণ ভ্রমণের আরেকটি বড় কঠিন দিক ছিল ইন্টারনেট সংযোগ বা নেটওয়ার্কের বাইরে অবস্থান করা। মাশা জানান, সবসময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নোটিফিকেশনে ভরা যান্ত্রিক জীবন থেকে দূরে থাকার মধ্যে এক ধরনের স্বস্তি কাজ করলেও অন্যদিকে পরিবারের মানুষজন সবসময় দুশ্চিন্তার মধ্যে থাকেন। তবে শেষ পর্যন্ত সুস্থ ও নিরাপদে নিজের গন্তব্যে ফিরে আসতে পারায় তিনি ভীষণ আনন্দিত ও সন্তুষ্ট।
ব্যাপক ভ্রমণপ্রিয় মাশার গান ও জীবনযাত্রায় প্রকৃতির এই সান্নিধ্য গভীর প্রভাব বিস্তার করে। ভ্রমণের মাধ্যমে শিল্পীরা মানসিকভাবে সমৃদ্ধ হন এবং মানুষের অজস্র অজানা গল্প জানার সুযোগ পান, যা পরবর্তী সময়ে তাঁদের কাজের বড় প্রেরণা হিসেবে কাজ করে। এই অর্জিত গল্প ও অভিজ্ঞতা থেকেই মূলত নতুন কোনো ভাবনার জন্ম হতে পারে বলে তিনি বিশ্বাস করেন।
ভ্রমণ ও উপস্থাপনার পাশাপাশি মাশার সংগীত চর্চাও নিয়মিতভাবে চলমান রয়েছে। দুর্গাপূজা উপলক্ষে মুক্তি পাওয়া 'চিরকুট' চলচ্চিত্রের 'চলে যেতে যেতে' গানটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশ প্রশংসা কুড়িয়েছে এবং খুব শীঘ্রই তাঁর নতুন একটি একক অ্যালবাম প্রকাশিত হতে যাচ্ছে, যার মধ্যে 'শ্রাবণী রোদ' গানটি ইতিমধ্যে প্রকাশিত হলেও দ্বিতীয় গান 'ফড়িংয়ের ছল' দ্রুতই মুক্তি পাবে। 'বনলতা এক্সপ্রেস'-এর পর তিনি গেমের পাশাপাশি অভিনয়ের সঙ্গেও যুক্ত থাকতে চান। বর্তমান সময়ে যেহেতু বিভিন্ন বৈচিত্র্যময় ধারার চলচ্চিত্র নির্মিত হচ্ছে, তাই একটু প্রস্তুতি নিলে তিনি অভিনব এই দুই মাধ্যমে সমানতালে কাজ চালিয়ে যেতে পারবেন বলে দৃঢ় আশাবাদী। এছাড়া ভ্রমণ নিয়ে তাঁর আলাদা পরিকল্পনা রয়েছে এবং অনেক দিন ধরেই নিজের অফিশিয়াল ইউটিউব চ্যানেলে নিয়মিত ভ্রমণ বিষয়ক ভ্লগ তৈরি করার তীব্র ইচ্ছা থাকলেও কাজের ব্যস্ততার কারণে তা এখনো বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।