
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
১৬ বছর আগে সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করা এক শিক্ষক অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন যেন নিয়মানুযায়ী একদিন প্রধান শিক্ষক পদে উন্নীত হওয়া যায়। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত সেই পদোন্নতির মুখ দেখতে তাঁকে দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে অপেক্ষা করতে হয়েছে। যদিও গত জুনের দিকে আইনি প্রতিবন্ধকতা দূর হয়েছিল, তবুও আদালতের রায়ের অফিশিয়াল অনুলিপি হাতে পেতে প্রায় পাঁচ মাসের মতো সময় অতিক্রান্ত হয়ে গেছে। বর্তমানে তাঁরা শুনতে পাচ্ছেন যে পদোন্নতিসংক্রান্ত কার্যক্রম আবার শুরু হচ্ছে, তথাপি কবে নাগাদ পদোন্নতির সেই সুসংবাদযুক্ত চিঠি তাঁরা সরাসরি হাতে পাবেন, তা নিয়ে তাঁদের মনে এখনো সংশয়ের মেঘ রয়ে গেছে।
রংপুর অঞ্চলের একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের উল্লিখিত সহকারী শিক্ষকের মতো বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তের হাজার হাজার শিক্ষক বছরের পর বছর ধরে পদোন্নতির প্রহর গুণছেন। পদোন্নতি পাওয়ার বিষয়টি দীর্ঘদিন অবরুদ্ধ থাকায় এই শিক্ষকসমাজ কেবল নিজেদের কাঙ্ক্ষিত পদমর্যাদাই হারাননি, বরং এর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ আর্থিক সুযোগ-সুবিধা থেকেও তাঁরা পুরোপুরি বঞ্চিত হয়েছেন।
আইনগত দীর্ঘ পথ পরিক্রমা ও জটিলতা পেরিয়ে গত জুন মাসে দেশের সর্বোচ্চ আদালত তথা আপিল বিভাগে মামলাটির চূড়ান্ত নিষ্পত্তি ঘটে। তবে আদালতের রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি পেতে কিছুটা বিলম্ব হওয়ায় এর প্রশাসনিক আনুষঙ্গিক কার্যক্রমও যথাসময়ে গতি লাভ করতে পারেনি। সম্প্রতি সংশ্লিষ্ট আদালতের রায়ের সারসংক্ষেপ এবং প্রয়োজনীয় সব নির্দেশনার অনুলিপি হাতে পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর বা ডিপিই তাদের কার্যক্রম পুনরায় সচল করেছে। অধিদপ্তরের সরবরাহ করা সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের বিভিন্ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মোট ৩৬ হাজার ২৩৫টি প্রধান শিক্ষকের পদ খালি পড়ে রয়েছে। এই খালি পদগুলোতে সহকারী শিক্ষকদের যোগ্যতা সাপেক্ষে পদোন্নতি দেওয়ার উদ্দেশ্যে সর্বপ্রথম জ্যেষ্ঠতার তালিকা বা গ্রেডেশন প্রস্তুত করার কাজ চলছে।
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর এই পদোন্নতিপ্রক্রিয়া বর্তমানে ঠিক কোন পর্যায়ে রয়েছে, সে বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহীনা ফেরদৌসী গণমাধ্যমকে জানান যে, আদালতের রায়ের অনুলিপি হস্তগত হওয়ার পর এতদিন ধরে স্থবির হয়ে থাকা প্রশাসনিক কাজগুলো এখন আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু করা হয়েছে। এই মুহূর্তে শিক্ষকদের সঠিক জ্যেষ্ঠতার তালিকা বা গ্রেডেশন প্রস্তুত করার কাজটিকেই সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার ও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
মহাপরিচালক আরও উল্লেখ করেন যে, দীর্ঘদিন ধরে পদোন্নতির কার্যক্রম বন্ধ থাকায় শিক্ষকদের ব্যক্তিগত চাকরির নথি, সার্ভিস বুক, বদলিকৃত নানা তথ্যসহ অন্যান্য সব জরুরি কাগজপত্র এখন পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই-বাছাই করতে হচ্ছে। কোনো একজন যোগ্য শিক্ষকও যেন ভুল বা অসম্পূর্ণ তথ্যের মারপ্যাচে পড়ে তালিকা থেকে বাদ না পড়েন, সেই বিষয়টি নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই মাঠপর্যায় থেকে সংগৃহীত তথ্যাদি সঠিকভাবে যাচাই করা হচ্ছে। জ্যেষ্ঠতার এই তালিকা সম্পূর্ণ চূড়ান্ত হওয়ার পরেই পর্যায়ক্রমে ও ধাপে ধাপে পদোন্নতির অফিশিয়াল আদেশ জারি করা হবে।
তবে তালিকা পুরোপুরি প্রস্তুত করা এবং তা নিখুঁতভাবে যাচাইয়ের দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষ করে ঠিক কোন সময়ে পদোন্নতির চূড়ান্ত আদেশ প্রদান করা সম্ভব হবে, সে বিষয়ে এখনো নির্দিষ্ট করে কিছু বলা যাচ্ছে না। ফলে দীর্ঘদিন ধরে চরম প্রত্যাশার মধ্যে দিন কাটানো শিক্ষকদের মনের ভেতরে থাকা অনিশ্চয়তা ও ভীতি পুরোপুরি দূর হয়নি।
প্রাথমিক স্তরের শিক্ষকদের এই পদোন্নতিকে কেন্দ্র করে অতীতে যে দীর্ঘমেআই আইনি বিরোধ তৈরি হয়েছিল, তার মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল মূলত জাতীয়করণের আওতায় আসা শিক্ষকদের জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণের বিষয়টি। ২০১৩ সালের পহেলা জানুয়ারি দেশের মোট ২৬ হাজার ১৯৩টি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে সরকারিভাবে জাতীয়করণ করা হয়। ওই সময় প্রণীত বিশেষ বিধিমালার ৯ এর ১ উপবিধি অনুযায়ী, জাতীয়করণকৃত শিক্ষকদের পূর্ববর্তী কর্মজীবনের ৫০ শতাংশ সময়কে কার্যকর চাকরিকাল হিসেবে গণ্য করে জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণের বিধান রাখা হয়েছিল। তবে এর পাশাপাশি তাঁদের অবস্থান যেন সরাসরি সরকারিভাবে নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকদের ঠিক নিচে রাখা হয়, তেমন একটি বিশেষ শর্তও জুড়ে দেওয়া হয়েছিল।
জাতীয়করণের সুফলভোগী শিক্ষকদের পক্ষ থেকে সরকারি এই বৈষম্যমূলক বিধানের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে একটি রিট মামলা দায়ের করা হয়। পরবর্তীতে হাইকোর্ট সরকারের আরোপ করা ওই নির্দিষ্ট শর্তটি বাতিল বলে ঘোষণা করলেও আপিল বিভাগ সেই রায় খারিজ করে দিয়ে পরিশেষে সরকারের প্রণীত বিধিমালার পক্ষেই তাদের চূড়ান্ত রায় প্রদান করেন। আদালতের সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০১২ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সরাসরি প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া সরকারি শিক্ষকেরাই মূলত জ্যেষ্ঠতার তালিকায় সবার আগে অগ্রাধিকার পাবেন। অন্যদিকে ২০১৩ সালে কিংবা তার পরবর্তী সময়ে সরাসরি নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকদের ক্ষেত্রে জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণের প্রক্রিয়ায় জাতীয়করণ হওয়া শিক্ষকদের অতীতের চাকরির মেয়াদের অর্ধেক সময় কার্যকর চাকরিকাল হিসেবে বিবেচনায় নেওয়া হবে। বর্তমানে এই নির্দিষ্ট নিয়মটি কঠোরভাবে অনুসরণ করেই জেলাভিত্তিক জ্যেষ্ঠতার তালিকা প্রণয়নের কাজ চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
যদিও আইনি জটিলতার অবসান ঘটিয়ে কার্যক্রম পুনরায় শুরু হয়েছে, তবুও বর্তমান প্রশাসনিক গতিপ্রকৃতি নিয়ে দারুণভাবে উদ্বিগ্ন ও চিন্তিত হয়ে পড়েছেন ভুক্তভোগী শিক্ষকেরা। নাম প্রকাশ করার শর্তে রাজধানী ঢাকার একজন সহকারী শিক্ষক নিজের হতাশা প্রকাশ করে জানান যে, তাঁদের জীবনের মূল্যবান ১৩টি বছর কেবল মামলা-মোকদ্দমা এবং আইনি মারপ্যাঁচের পেছনেই পুরোপুরি অপচয় হয়েছে। জুনের দিকে রায় ঘোষিত হওয়ার পরও কেবল অফিশিয়াল নথিপত্রের দীর্ঘসূত্রতার কারণে প্রায় পাঁচ মাস পদোন্নতির সমস্ত কার্যক্রম একেবারে বন্ধ ছিল। এখন প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের কাছে তাঁদের একটানা জোর দাবি হলো, আর যেন নতুন কোনো আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বা অজুহাতে সময় নষ্ট করা না হয়। অতি দ্রুত যেন জ্যেষ্ঠতার তালিকা প্রকাশ্যে এনে পদোন্নতির আদেশ দিয়ে দেওয়া হয়।
যাঁদের চাকরির অবসর গ্রহণের সময় দ্রুত ঘনিয়ে আসছে, সেই বয়োবৃদ্ধ শিক্ষকেরা আরও গভীর উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার মধ্য দিয়ে সময় পার করছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এমন আরেকজন শিক্ষক আক্ষেপ করে বলেন যে, তাঁর নিজের চাকরির মেয়াদ আর মাত্র দেড় বছরের মতো অবশিষ্ট আছে। এখন যদি জেলা পর্যায় থেকে তথ্য যাচাই-বাছাই এবং ফাইল চালাচালির কাজে আবার অতিরিক্ত সময় অপচয় হয়, তবে জীবনের এই অন্তিম মুহূর্তে এসে তিনি আর পদোন্নতির মুখ দেখতে পাবেন না।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের মোট ৬৫ হাজার ৬২০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অর্ধেকেরও বেশি প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে কোনো নিয়মিত বা স্থায়ী প্রধান শিক্ষক নেই। খুব শীঘ্রই এই পদোন্নতিপ্রক্রিয়া যদি সফলভাবে চূড়ান্ত করা সম্ভব হয়, তবে একসঙ্গে প্রায় ৩৬ হাজার ২৩৫ জন জ্যেষ্ঠ সহকারী শিক্ষক পদোন্নতি লাভ করে সরাসরি প্রধান শিক্ষক পদে উন্নীত হতে পারবেন। এর ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা তীব্র নেতৃত্বসংকট চিরতরে দূর হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
একই সঙ্গে দেশের শিক্ষাখেত্রে নতুন কর্মসংস্থান ও নিয়োগের এক বিশাল দিগন্ত উন্মোচিত হবে। এত বিপুল পরিমাণ সহকারী শিক্ষক পদোন্নতি পেয়ে অন্য পদে চলে গেলে তাঁদের পূর্বের খালি হওয়া পদগুলোতে ব্যাপক শূন্যতা সৃষ্টি হবে। পূর্বে থেকেই জমে থাকা শূন্য পদ এবং পদোন্নতির ফলে সৃষ্ট নতুন পদ মিলে একযোগে প্রায় ৩৮ হাজার ৪৩৩টি সহকারী শিক্ষকের পদ শূন্য হয়ে পড়বে। সম্প্রতি সরকারিভাবে নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত প্রায় ১৪ হাজার ৩৮৪ জন সহকারী শিক্ষক তাঁদের নির্ধারিত ওরিয়েন্টেশন বা পরিচিতি পর্ব শেষ করে ইতোমধ্যে নিজ নিজ স্কুলে যোগদান করেছেন। তবে এই পদোন্নতিপ্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত হওয়ামাত্রই মাঠপর্যায়ে তৈরি হওয়া এই বিশাল শূন্যতা দ্রুত পূরণ করার স্বার্থে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরকে বাধ্য হয়ে খুব শীঘ্রই আবার নতুন সহকারী শিক্ষক নিয়োগের গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করতে হবে।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।