
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
সাহিত্যকর্ম যেমন উপন্যাস, ছোটগল্প কিংবা নাটকে মানুষের পূর্ণাঙ্গ জীবন কখনোই পুরোপুরি ফুটে ওঠে না। একটি উপন্যাসের সমাপ্তিতে লেখক আফসানেহ চরিত্রটিকে এক দূরবর্তী স্থানে পাঠিয়ে দেন, যেখানে তার চাচা বিশাল বাড়ি ও ব্যবসায়ের মালিক। এই পরিণতি থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে আফসানেহর মানসিকতার কোনো পরিবর্তন ঘটে না; বরং একটিমাত্র সত্যকে আঁকড়ে ধরেই সে তার জীবন অতিবাহিত করে এবং কোনো অবস্থাতেই আপস করে না। বর্তমান সময়ে বিভিন্ন মাধ্যমের বদৌলতে বালুচ নারীদের আপসহীন লড়াইয়ের চিত্র আমাদের সামনে আসছে। তেত্রিশ বছর বয়সি নেত্রী মাহরাঙের সামনেও দীর্ঘ সময় ও পথ পড়ে রয়েছে, আর তিনি যেন ঠিক এভাবেই নিজের সংগ্রাম অবিরাম চালিয়ে যেতে পারেন, সেটাই সবার ঐকান্তিক প্রত্যাশা।
আমার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধুর সঙ্গে সিন্ধু প্রদেশের এক ভদ্রলোকের সাক্ষাৎ হয়েছিল, যা থেকে জানা যায় যে সিন্ধিদের মনেও প্রতিনিয়ত স্বাধীনতার স্বপ্ন লালিত হচ্ছে। ইতিপূর্বে যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী এক পাকিস্তানির সঙ্গেও আমার দেখা হয়েছিল, যিনি মূলত লাহোর ও পাঞ্জাবের মানুষ, অথচ তাঁরও নিজের দেশে ফিরে যাওয়ার কোনো তাগিদ বা আগ্রহ নেই। কারণ হিসেবে দেখা যায়, চরম দুর্নীতি, সামরিক শাসন এবং ব্যর্থ গণতান্ত্রিক লড়াইয়ের কারণে দেশটি আজ সর্বাঙ্গীন ক্ষতবিক্ষত। এই সামগ্রিক পরিস্থিতিতে বালুচদের নতুন জাগরণ এবং সিন্ধু অঞ্চলের মানুষের স্বাধীনতার আকাক্সক্ষা—সব মিলিয়ে বালুচ ও সিন্ধি নারীদের মুক্তির আন্দোলন আরও বেশি গতিশীল হয়ে উঠবে। যদি চেতনার জায়গাটিতে আফসানেহ, মাহরাঙ এবং ইলা মিত্রকে একটি সুতোয় গেঁথে ফেলা সম্ভব হয়, তবে এই মুক্তি সংগ্রাম কোনোভাবেই ব্যর্থ হতে পারে না।
অতীতে সৈয়দ মুজতবা আলীর বিখ্যাত ‘দেশে বিদেশে’ গ্রন্থটি পাঠ করে আফগানিস্তানের সাধারণ মানুষ এবং সেখানকার সামগ্রিক সমাজব্যবস্থা সম্পর্কে একটি স্পষ্ট ধারণা লাভ করা সম্ভব হয়েছিল। পরবর্তীতে লেখক আফতাব হোসেনের রচিত বই পড়ার মাধ্যমে কেবল বালুচ ও পাঠানদের সম্পর্কেই নয়, বরং পাকিস্তানি বালুচদের জীবনযাত্রা সম্পর্কেও একটি সম্যক ধারণা তৈরি হয়েছে। এর মাধ্যমে অনায়াসেই অনুমান করা চলে যে, সেখানকার নেত্রী মাহরাঙের এই দীর্ঘ লড়াইয়ের অনুপ্রেরণা দূরদূরান্তে ছড়িয়ে পড়বে। কারণ, আমাদের নিজেদের ঐতিহাসিক মুক্তিসংগ্রামেও দেশের নারীরা সবসময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও অগ্রণী ভূমিকা পালন করে এসেছেন।
আফসানেহ হলো একটি কাল্পনিক উপন্যাসের চরিত্র, আর লেখকের অনবদ্য সৃষ্টিশীলতাই হলো সেই চরিত্রের মূল শক্তির উৎস। অথচ মাহরাঙ তো কোনো কাল্পনিক চরিত্র নন, তিনি সম্পূর্ণ বাস্তবভাবে রাজপথে বুক চিতিয়ে লড়ে যাচ্ছেন। তাঁর এই সাহসিকতাপূর্ণ লড়াইয়ের সাথে যুক্ত হোক শত সহস্র নতুন মাহরাঙ, আর নতুন করে জেগে উঠুক সকল বালুচ ও পাঠান জনতা। আর কাল্পনিক চরিত্র আফসানেহও যেন অজান্তেই বাস্তবের এই লড়াইয়ের মিছিলে এসে সদর্পে এসে দাঁড়ায়।
সূত্র: আজকের পত্রিকা