
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
খেলাধুলার সময় কিংবা দৈনন্দিন নানা কারণে আঘাত পেলে মানবদেহের নির্দিষ্ট স্থানে ফোলাভাব তৈরি হতে পারে। এর ফলে হাঁটাচলা করা বেশ কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায়। এই পরিস্থিতিতে কী করা উচিত, তা নিয়ে প্রায়ই দ্বিধা তৈরি হয়। গরম সেঁক দেওয়া ভালো নাকি ঠান্ডা বরফ ব্যবহার করা উচিত, তা নিয়ে অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে। কোন পদ্ধতিতে বেশি উপকার পাওয়া যাবে, তা বোঝার জন্য কিছু নির্দিষ্ট পরামর্শ মাথায় রাখা জরুরি।
দৈনন্দিন জীবনের সাধারণ আঘাতগুলোকে আমরা অনেক সময় অবহেলা করি। কিন্তু পরবর্তীতে এই মামুলি ব্যথাই অসহ্য হয়ে উঠতে পারে। তাই সবার আগে আঘাতের তীব্রতা কতখানি, তা অনুধাবনের চেষ্টা করা আবশ্যক। যদি আঘাতের মাত্রা গুরুতর হয়, তবে তাৎক্ষণিকভাবে সেই স্থানে বরফের পট্টি ব্যবহার করা উচিত। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই পদ্ধতিকে 'ক্রায়ো থেরাপি' বা 'কোল্ড থেরাপি' হিসেবে অভিহিত করা হয়। যদি ঠিক সেই মুহূর্তে হাতের কাছে বরফ না পাওয়া যায়, তবে ঠান্ডা পানিতে এক টুকরো পরিষ্কার কাপড় ভিজিয়ে তা ক্ষতস্থানে চেপে ধরতে পারেন।
এই ধরনের সমস্যায় চিকিৎসাবিজ্ঞানে 'রাইস সিকোয়েন্স' নামক একটি অত্যন্ত পরিচিত পদ্ধতি রয়েছে। ইংরেজি রাইস শব্দটির প্রতিটি বর্ণ দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি ধাপ বোঝানো হয়। এগুলো হলো রেস্ট বা বিশ্রাম, আইস বা বরফ, কম্প্রেশন বা চাপ এবং এলিভেশন বা অবস্থার উন্নতি ঘটানো। সহজ কথায়, আঘাত গুরুতর হলে হাঁটাচলা পুরোপুরি বন্ধ রেখে আক্রান্ত স্থানে বরফ বা ঠান্ডা ভেজা কাপড় চেপে ধরে শারীরিক অবস্থার উন্নতির চেষ্টা করতে হবে। যদিও এই পদ্ধতির কার্যকারিতা সাধারণত দুই থেকে তিন দিনের বেশি থাকে না, এরপর হালকা ব্যায়াম শুরু করলে বেশ উপকার মেলে।
আঘাতের তীব্রতা অনুধাবন করার বিষয়টি শুরুতেই নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি আঘাতের আঘাত গুরুতর হয়, তবে দ্রুততার সঙ্গে ব্যথার স্থানে বরফের পট্টি বসাতে হবে। এই কোল্ড থেরাপি বা ক্রায়ো থেরাপির মাধ্যমে ফোলা ও ব্যথা কমানোর চেষ্টা করা হয়।
ব্যায়াম করার সময় কিংবা খেলাধুলার মাঠে আঘাত পাওয়ার পর প্রাথমিক অবস্থায় হয়তো বিষয়টিকে গুরুতর মনে হয় না। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আঘাতপ্রাপ্ত জায়গার পেশিগুলো ফুলে ওঠে এবং যন্ত্রণার মাত্রা তীব্র আকার ধারণ করে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এই অবস্থাকে 'বিলম্বিত পেশি পীড়া' বা 'ডিলেইড অনসেট মাসল সোরনেস' বলা হয়। এমন পরিস্থিতিতে ঠান্ডা ও গরম—উভয় পদ্ধতিই মিলিয়ে প্রয়োগ করা যেতে পারে। বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে এর সুফলও পাওয়া যায়। তবে আধুনিক বৈজ্ঞানিক গবেষণায় এই ধরনের চিকিৎসাপদ্ধতির কার্যকারিতা খুব জোরালোভাবে প্রমাণিত হয়নি এবং এর সুফল নিয়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরাও এখনো সুনির্দিষ্ট কোনো সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারেননি।
একশো জন ব্যক্তির তুলনামূলক শারীরিক ফিটনেস বা উপযুক্ততা যাচাই করে একটি গবেষণা চালানো হয়। ব্যায়ামের সময় আঘাতপ্রাপ্ত হওয়া ব্যক্তিদের পেশির ক্ষত এবং তীব্র যন্ত্রণা উপশমের লক্ষ্যে তাদের ওপর পরীক্ষাটি করা হয়। এর মধ্যে পঞ্চাশ জনকে একটানা পনেরো মিনিট ঠান্ডা কিংবা গরম সেঁক দেওয়া হয় এবং বাকি পঞ্চাশ জন ব্যক্তিকে কোনো ধরনের চিকিৎসায় রাখা হয়নি। পরবর্তীতে গবেষক দল দেখতে পান যে, ঠান্ডা এবং গরম উভয় প্রক্রিয়াই সুফল দিয়েছে। তবে যেসব ব্যক্তিকে আঘাত পাওয়ার ঠিক পরপরই অথবা চব্বিশ ঘণ্টা পার হওয়ার পর ঠান্ডা পট্টি দেওয়া হয়েছিল, তাঁরা তুলনামূলকভাবে বেশি উপকার পেয়েছেন। এই সংক্রান্ত একটি গবেষণাপত্র পরবর্তীতে 'দ্য জার্নাল অব স্ট্রেন্থ অ্যান্ড কনডিশনিং রিসার্চ' নামক জার্নালে প্রকাশিত হয়।
তবে এই পুরো প্রক্রিয়ার পাশাপাশি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অবশ্যই মনে রাখতে হবে। আঘাত পাওয়ার ফলে শরীরের কোনো হাড়ে যদি চিড় ধরার মতো ঘটনা ঘটে, তবে অবশ্যই পেশাদার চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে এবং তাঁর পরামর্শ অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।