
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
আমাদের দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় আখরোট এবং কাজুবাদাম উভয়ই অত্যন্ত পুষ্টিকর খাবার হিসেবে পরিচিত। এই দুই ধরনের বাদামই আমাদের হৃদ্যন্ত্রের সুস্বাস্থ্য বজায় রাখতে বিশেষভাবে সাহায্য করে থাকে। তবে পুষ্টিগুণ এবং মানবদেহে এর স্বাস্থ্যগত উপকারিতার দিক থেকে এই দুটির মাঝে বেশ কিছু দৃশ্যমান পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। এর মধ্যে প্রধানত মস্তিষ্কের বিভিন্ন কার্যক্ষমতা বাড়ানোর জন্য আখরোট এবং শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখার ক্ষেত্রে কাজুবাদাম তুলনামূলকভাবে কিছুটা বেশি সুবিধাজনক হতে পারে।
খাদ্যতালিকায় থাকা পুষ্টির বিচারে, আখরোটে প্রচুর পরিমাণে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড রয়েছে যা মানবদেহের জন্য খুবই উপকারী। এর মধ্যে বিশেষ করে আলফা-লিনোলেনিক অ্যাসিড বা এএলএ নামক উপাদানটি পাওয়া যায়, যা উদ্ভিজ্জ উৎস থেকে প্রাপ্ত ফ্যাটি অ্যাসিড হিসেবে শরীরের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। পুষ্টিবিজ্ঞান অনুযায়ী, প্রতি এক আউন্স বা প্রায় ২৮ গ্রাম ওজনের আখরোটে প্রায় ২ দশমিক ৫৭ গ্রাম পর্যন্ত ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড বিদ্যমান থাকে।
বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক গবেষণায় স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে, নিয়মিত নিয়মে আখরোট খাওয়ার অভ্যাস মানুষের স্মৃতিশক্তি প্রখর রাখতে এবং সামগ্রिक চিন্তাভাবনার দক্ষতা উন্নত করতে দারুণভাবে সাহায্য করে। এমনকি মানুষের বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা হ্রাস পাওয়ার মতো ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়গুলোও অনেকাংশে কমে যাওয়ার পেছনে এর যোগসূত্র রয়েছে। তাছাড়া, আখরোটে উপস্থিত শক্তিশালী অ্যান্টি–অক্সিডেন্টসমূহ শরীরের কোষগুলোকে যেকোনো ধরনের অক্সিডেটিভ স্ট্রেসের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে রক্ষা করতে সবসময় সহায়তা করে থাকে।
এই প্রক্রিয়াটি যদি আরেকটু সহজ ভাষায় পরিষ্কার করা হয়, তবে দেখা যায় যে আমাদের শরীরে তৈরি হওয়া ক্ষতিকর অণু এবং সেগুলোকে সফলভাবে নিষ্ক্রিয় করার জন্য প্রয়োজনীয় অ্যান্টি–অক্সিডেন্টের মাত্রার মধ্যে অনেক সময় স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়। যদি এই অস্বাস্থ্যকর অবস্থাটি দীর্ঘদিন ধরে কোনো প্রতিকার ছাড়াই চলতে থাকে, তবে একপর্যায়ে তা আমাদের শরীরের গুরুত্বপূর্ণ কোষ, প্রোটিন এবং ডিএনএ-র মারাত্মক ক্ষতি সাধন করতে পারে।
হৃদ্যন্ত্রের সুস্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করলে দেখা যায় যে, আখরোট এবং কাজুবাদাম উভয় বাদামই সমানভাবে বেশ ভালো ভূমিকা পালন করে। মানবদেহের হৃৎপিণ্ডের সুস্বাস্থ্য রক্ষার্থে এই দুটি বাদামেই উপকারী অসম্পৃক্ত চর্বি রয়েছে, যা ক্ষতিকর স্যাচুরেটেড ফ্যাটের পরিবর্তে গ্রহণ করা অত্যন্ত ফলপ্রসূ। এর মধ্যে আখরোটে পলি–আনস্যাচুরেটেড ফ্যাটের পরিমাণ অপেক্ষাকৃত অনেক বেশি থাকে। অন্যদিকে, সুস্বাদু কাজুবাদামের ভেতরে পর্যাপ্ত পরিমাণে প্রোটিনসহ শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন ধরনের ভিটামিন ও খনিজ উপাদান সমৃদ্ধ অবস্থায় পাওয়া যায়।
এছাড়াও, কিছু সাম্প্রতিক গবেষণার ফলাফলে জোরালো ইঙ্গিত পাওয়া গেছে যে নিয়মিত কাজুবাদাম খাওয়ার ফলে মানুষের রক্তচাপ এবং রক্তে উপস্থিত ট্রাইগ্লিসারাইডের ক্ষতিকর মাত্রা উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসতে পারে।
মানবদেহের ওজন নিয়ন্ত্রণের কথা যদি বিবেচনা করা হয়, তবে এই দৌড়ে কিছুটা হলেও এগিয়ে রয়েছে জনপ্রিয় কাজুবাদাম। একই পরিমাণ ওজন অনুযায়ী আখরোট ও কাজুবাদামের তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা যায় যে, কাজুবাদামের ভেতরে ক্যালরি ও চর্বির পরিমাণ তুলনামূলক কম থাকে, আর অন্যদিকে প্রোটিনের পরিমাণ সামান্য একটু বেশি পাওয়া যায়। মূলত এই অতিরিক্ত প্রোটিন মানুষের পেট অনেকক্ষণ ভরা রাখতে দারুণভাবে সাহায্য করে থাকে। এই কারণে শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণের যেকোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনায় কাজুবাদাম একটি অত্যন্ত চমৎকার ও কার্যকরী বিকল্প হতে পারে।
তবে একটা বিষয় সবসময় মনে রাখা দরকার যে, শুধুমাত্র ইচ্ছেমতো বাদাম খেলেই শরীরের ওজন স্বয়ংক্রিয়ভাবে কমে যায় এমন কোনো কথা নেই। প্রতিদিন ঠিক কতটুকু পরিমাণ বাদাম খাওয়া হচ্ছে, সেই সুনির্দিষ্ট পরিমাণের দিকে গভীর নজর রাখা অত্যন্ত জরুরি, কারণ এই দুই ধরনের পুষ্টিকর বাদামেই পর্যাপ্ত পরিমাণে ক্যালরি বিদ্যমান থাকে। তবে খাদ্যতালিকায় বাদাম থাকলে তা অন্য ভারী খাবার খাওয়ার অতিরিক্ত আগ্রহ বা ক্ষুধাকে অনেকাংশে কমিয়ে দিতে সক্ষম হয়।
অন্যদিকে, পুষ্টিগুণে ভরপুর কাজুবাদামের ভেতরে মানবদেহের জন্য প্রয়োজনীয় কপার, ম্যাগনেশিয়াম, আয়রন এবং জিঙ্কের মতো খনিজ উপাদানগুলো মজুত থাকে। এর মধ্যে কপার আমাদের শরীরে শক্তি উৎপাদন প্রক্রিয়া সচল রাখতে, স্নায়ুতন্ত্রের সঠিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে এবং রোগ প্রতিরোধব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আর ম্যাগনেশিয়াম আমাদের শরীরের পেশি এবং স্নায়ুর স্বাভাবিক ও স্বচ্ছন্দ কার্যক্রম বজায় রাখার জন্য একটি অপরিহার্য উপাদান হিসেবে বিবেচিত হয়।
সারაკথাময় হিসেবে বলা যায় যে, মস্তিষ্কের সুস্বাস্থ্যের জন্য প্রয়োজনীয় ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড পেতে চাইলে আপনার জন্য আখরোট খাওয়া সবচেয়ে ভালো পছন্দ হবে। আর আপনি যদি তুলনামূলকভাবে কম ক্যালরি এবং একটু বেশি পরিমাণে প্রোটিন পেতে চান, তবে সেক্ষেত্রে অনায়াসেই কাজুবাদাম বেছে নিতে পারেন। মূলত এই দুই ধরনের বাদামই আমাদের প্রতিদিনের সুষম খাদ্যতালিকার একটি অত্যন্ত পুষ্টিকর অংশ হিসেবে অনায়াসে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের পক্ষ থেকে কিছু জরুরি পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে লবণ বা কৃত্রিম চিনি মেশানো বাদাম এড়িয়ে চলার কথা বলা হয়েছে। এর পরিবর্তে সবসময় লবণবিহীন খাঁটি বাদাম বেছে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ হবে এবং খাওয়ার সময় অবশ্যই এর পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। তাছাড়া, প্রতিদিন শুধু এক নির্দিষ্ট ধরনের বাদামই খেতে হবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই; বরং পরিমিত পরিমাণে বিভিন্ন ধরনের বাদাম ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে খেলে শরীর একসঙ্গে নানা রকমের প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান লাভ করতে পারে।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।