
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
জ্ঞানী, মার্জিত এবং চরমভাবে অনমনীয় ব্যক্তিত্বের অধিকারী মাহফুজ আনামকে নতুন করে চেনানোর কোনো অবকাশ নেই। স্বনামধন্য রাজনীতিক, প্রথিতযশা লেখক ও বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ আবুল মনসুর আহমদের সুযোগ্য এই সন্তান দেশের সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও একজন প্রাজ্ঞ ও সংবেদনশীল নাগরিক হিসেবে নিজের অবস্থান পোক্ত করেছেন। নির্ভীক ও পেশাদার সাংবাদিকতা চর্চার মাধ্যমে তিনি ইংরেজি ভাষার দৈনিক দ্য ডেইলি স্টার পত্রিকাটিকে অনন্য এক উচ্চতায় নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছেন।
প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী এই গুণী গণমাধ্যমকর্মীকে মূল্যায়ন করতে গিয়ে মন্তব্য করেছেন যে, অধ্যাপনা পেশায় তাঁকে দারুণ মানালেও, সাংবাদিকতা পেশায় তিনি আরও বেশি মানানসই ছিলেন। কর্মজীবনের একদম সূচনালগ্নে তিনি এস এম আলীকে নিজের পথপ্রদর্শক হিসেবে পাশে পেয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার কাজ শেষে ঢাকায় ফিরে তিনি বরাবরের মতোই এস এম আলীর সান্নিধ্যেই থেকে যান।
এস এম আলীর জীবনাবসানের পর দ্য ডেইলি স্টার পত্রিকার জন্য যে বিশাল শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, তা পূরণ করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি উপযুক্ত তরুণ ছিলেন এই মাহফুজ আনাম। একটানা ত্রিশ বছর ধরে তিনি নিজের যোগ্যতার শতভাগ প্রমাণ দিয়ে আসছেন। বর্তমান সময়ে তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত ইংরেজি ভাষার সংবাদপত্রগুলোর মধ্যে দ্য ডেইলি স্টার যে সেরা, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
শুধু তা-ই নয়, এই দৈনিকটি এখন আন্তর্জাতিক মান অর্জনের পাশাপাশি ব্যাপক সম্মানও লাভ করেছে। ‘সময় ও দুঃসময়ের কথা: মাহফুজ আনামের কথা ও কথোপকথন’ গ্রন্থের মুখবন্ধে মূলত এই বিষয়গুলোই অত্যন্ত সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে। এই বইটি মূলত প্রখ্যাত এই সাংবাদিকের বর্ণাঢ্য জীবন ও কর্মের এক সুদীর্ঘ ও চমৎকার জীবন-আলেখ্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এই প্রকাশনাটিতে যেমন তারুণ্যের সোনালি দিনগুলোর এক চমৎকার প্রতিচ্ছবি রয়েছে, তেমনি রয়েছে আপসহীন ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা বজায় রাখার এক নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রামের ইতিহাস। ১৯৭৩ সালে দ্য বাংলাদেশ অবজারভার পত্রিকায় নামমাত্র তিন শ টাকা মাসিক বেতনের মাধ্যমে পেশাজীবন শুরু করা এই মানুষটি কীভাবে খ্যাতনামা ইংরেজি দৈনিকের প্রাণকেন্দ্র হয়ে উঠলেন, সেই রোমাঞ্চকর তথ্যগুলো এই বইটিতে সুনিপুণভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
মোট ছয়টি ভিন্ন অধ্যায়ে বিন্যস্ত এই গ্রন্থটিতে পাঁচটি স্বতন্ত্র পর্বে এই গণমাধ্যমকর্মীর নানা কথা থেকে সংকলিত ছাব্বিশটি লেখা স্থান পেয়েছে। বইয়ের নির্ধারিত অধ্যায়গুলোর মধ্যে রয়েছে আত্মজৈবনিক পর্ব, সাংবাদিকতা ও বাক্স্বাধীনতা বিষয়ক আলোচনা, জীবন ও জগতের বিভিন্ন ভাবনা, গণতন্ত্র ও অন্যান্য বিষয় এবং বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ।
বইটির আত্মজীবনীমূলক অংশটিতে লেখকের শৈশব ও প্রথম জীবনের নানা গল্প অত্যন্ত সাবলীলভাবে উঠে এসেছে। জাতীয় রাজনীতিক পিতার ঘরে জন্মগ্রহণ করায় স্বাভাবিকভাবেই রাজনীতি নিয়ে তাঁর মধ্যে গভীর আগ্রহ জন্ম নিয়েছিল। তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাষায় জানিয়েছেন যে তাঁর বাবা-মা এবং পরিবারের পরই তাঁর জীবনে সবচেয়ে বেশি প্রভাব বিস্তার করেছে ছাত্র ইউনিয়ন।
দেশপ্রেমের পূর্ণাঙ্গ রূপ লাভে এই ছাত্রসংগঠনটি তাঁকে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করেছিল বলে তিনি মনে করেন। এ ছাড়া তরুণ ছাত্রনেতা হিসেবে পাকিস্তান আমলের সেই উত্তাল ও কঠিন দিনগুলোই যে তাঁর সমগ্র জীবনের সঠিক গতিপথ নির্ধারণ করে দিয়েছিল, তা তিনি কোনো রাখঢাক ছাড়াই অকপটে স্বীকার করে নিয়েছেন।
সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের বিকাশ, দেশের প্রতি অগাধ ভালোবাসা এবং সমাজ সচেতনতার মতো বিষয়গুলো মিলিয়ে তিনি একটি অত্যন্ত সোনালি সময় অতিবাহিত করেছেন বলে বইটিতে লিখেছেন। ১৯৭১ সালের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধে তিনি সরাসরি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন এবং তিনি ছিলেন যুদ্ধদিনের কমিশন পাওয়া অফিসারদের দ্বিতীয় ব্যাচের গর্বিত সদস্য।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি সেনাবাহিনীতে না থেকে সাংবাদিকতা পেশাকে বেছে নেন এবং পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা ইউনেসকোতে কাজ করেন। বিদেশে অত্যন্ত নিরাপদ ও আকর্ষণীয় চাকরি ছেড়ে বরেণ্য সম্পাদক এস এম আলীর সাথে মিলে দ্য ডেইলি স্টার প্রতিষ্ঠা এবং একে একটি মজবুত কাঠামোর ওপর দাঁড় করানো তাঁর জীবনের অন্যতম বড় একটি সাফল্য।
১৯৯১ সালের চৌঠা জানুয়ারি আত্মপ্রকাশ করা এই পত্রিকার পথচলা ছিল নানা প্রতিবন্ধকতা, তীব্র প্রতিযোগিতা এবং রোমাঞ্চকর সব অভিজ্ঞতায় ভরপুর। গ্রন্থটির সাংবাদিকতা ও বাক্স্বাধীনতা অধ্যায়ে অন্তর্ভুক্ত ৯টি লেখা কেবল তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের অংশ নয়, বরং তা আমাদের দেশের সাংবাদিকতার ইতিহাসের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও অনন্য দলিল।
এই বইয়ের চতুর্থ অংশে লেখকের মোট দশটি সুচিন্তিত ও সুলিখিত ভাষণ সংযোজিত হয়েছে। অত্যন্ত চমৎকারভাবে রচিত এই ভাষণগুলোর প্রায় পুরোটাই আবর্তিত হয়েছে সাংবাদিকতা পেশাকে কেন্দ্র করে। বাংলাদেশে যারা সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে গণমাধ্যম পরিচালনা ও বাকস্বাধীনতা রক্ষায় কাজ করে চলেছেন, তাদের প্রত্যেকের জন্য এই ভাষণগুলো পড়া অত্যন্ত জরুরি।
বিশেষ করে ‘সাংবাদিকরা কেবল সাংবাদিকতাকে বাঁচাতে পারেন’ শীর্ষক লেখাটি এ দেশের সংবাদমাধ্যমের টিকে থাকার ক্ষেত্রে একটি ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে। এই নির্দিষ্ট শিরোনামটি বাংলাদেশের সামগ্রিক সাংবাদিকতা ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রতিটি সচেতন মানুষকে একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও অমোঘ বার্তা প্রদান করে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে জুলাই মাসের ঐতিহাসিক গণ–অভ্যুত্থান একটি অত্যন্ত বিশেষ ও তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়। পরিণত বয়সে অত্যন্ত গভীর ও তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দিয়ে এই পুরো গণ-অভ্যুত্থান খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করেছেন এই জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক।
এই বিষয়ে বেশ কয়েকটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে তাঁর সুনির্দিষ্ট বিশ্লেষণ ও প্রত্যাশার কথাগুলো এ দেশের প্রতিটি সংবেদনশীল নাগরিকের মনের গোপন আকাক্সক্ষারই নিখুঁত প্রতিচ্ছবি। সম্ভবত তিনিই একমাত্র বাংলাদেশি সাংবাদিক, যিনি অত্যন্ত সৌভাগ্যবশত কিংবা ঘটনাক্রমে ১৯৬৯, ১৯৯০ এবং ২০২৪ সালের তিনটি গণ-অভ্যুত্থানই নিজের চোখে সরাসরি প্রত্যক্ষ করেছেন।
এ ছাড়া ওই সাক্ষাত্কারগুলোতে অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে ভারতের সাথে আমাদের দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক এবং বাংলাদেশ নিয়ে চলা নানা মিথ্যা তথ্য, গুজব, মনগড়া অপপ্রচার ও অপতথ্যের ভয়ংকর বিস্তার নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। একটি বিশেষ সাক্ষাত্কারে তিনি স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করেছেন যে কিছু ধর্মীয় বা ইসলামিক ঘটনা স্বচক্ষে দেখে দয়া করে কেউ যেন এমন ভুল সিদ্ধান্তে উপনীত না হন যে দেশ ধীরে ধীরে চরম কোনো মৌলবাদী রাষ্ট্রে পরিণত হচ্ছে।
তিনি আরও পরিষ্কার করে বলেন যে এটি মূলত একটি মুসলিমপ্রধান দেশ এবং এখানকার সাধারণ মানুষের মনে ইসলামের প্রতি নিবেদিতপ্রাণ বিশ্বাস রয়েছে। যারা পবিত্র ধর্মে বিশ্বাস করেন, তাঁরা নিয়ম করে দিনে পাঁচবার আল্লাহর ইবাদতে মসজিদে যান। কেবল এই দৃশ্য দেখে সাধারণ মানুষের সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি বা জীবনযাপনকে নেতিবাচকভাবে সংজ্ঞায়িত করা উচিত হবে না। এর কখনই এই অর্থ দাঁড়ায় না যে তারা সবাই মিলে কোনো চরমপন্থী দল বা উগ্র কোনো গোষ্ঠীর সাথে যুক্ত রয়েছেন।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।