
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
বিশ্বজুড়ে জারি থাকা কঠোর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, তীব্র বৈদেশিক মুদ্রার সংকট এবং প্রচলিত আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং কাঠামোর ভেতরে প্রবেশাধিকারের ওপর থাকা নানা বিধিনিষেধ পুরোপুরি এড়িয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে আয়ের সম্পূর্ণ অভিনব ও বিকল্প পথ খুঁজে বের করেছে উত্তর কোরিয়া। এই নতুন আয়ের ভিন্নধর্মী মাধ্যমগুলোর মধ্যে অন্যতম প্রধান হলো বড় মাত্রার সাইবার হামলার মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ ডিজিটাল উপায়ে চুরি করা এবং নিজের দেশের নাগরিকদের পরিচয় সম্পূর্ণ গোপন রেখে অত্যন্ত সুকৌশলে বিভিন্ন বিদেশি রাষ্ট্রে কর্মী হিসেবে প্রেরণ করা। দেশটির দক্ষ ও প্রশিক্ষিত হ্যাকাররা গত বেশ কিছুদিন ধরে পৃথিবীর তাবৎ বড় বড় ক্রিপ্টোকারেন্সি এক্সচেঞ্জ এবং বিভিন্ন ডিজিটাল আর্থিক প্রতিষ্ঠানে বড় ধরনের সাইবার আক্রমণ পরিচালনা করে আসছে এবং এর মাধ্যমে তারা গত কয়েক বছর ধরে অবিশ্বাস্য পরিমাণ অর্থ অনায়াসে হাতিয়ে নিচ্ছে।
অতি সম্প্রতি চীনভিত্তিক বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম এবং প্রধান ক্রিপ্টোকারেন্সি এক্সচেঞ্জ প্ল্যাটফর্ম বাইন্যান্স থেকে অবিশ্বাস্যভাবে ছয় শ কোটি মার্কিন ডলারের চেয়েও বেশি পরিমাণ ডিজিটাল সম্পদ জালিয়াতি ও চুরির মতো চাঞ্চল্যকর ঘটনার কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উত্তর কোরিয়ার হ্যাকারদের ধ্বংসাত্মক ভূমিকা পুনরায় অত্যন্ত জোরালোভাবে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে। তবে কেবল ক্রিপ্টোকারেন্সি বা ডিজিটাল সম্পদ চুরির মাধ্যমেই তারা ক্ষান্ত থাকছে না, বরং সুদূর প্রবাসে ভুয়া পরিচয়পত্র ব্যবহার করে তথ্যপ্রযুক্তি খাতের দক্ষ কর্মী হিসেবে কাজ করার নাম করেও প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে দেশটি। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সুনির্দিষ্ট তদন্তের মাধ্যমে ইতিমধ্যে এটি পরিষ্কারভাবে প্রকাশিত হয়েছে যে, উত্তর কোরিয়ার হ্যাকারদের মাধ্যমে সংগৃহীত এই সমস্ত বিপুল পরিমাণ অর্থের সঙ্গে দেশটির অত্যন্ত গোপনীয় ও উচ্চাভিলাষী পারমাণবিক এবং ক্ষেপণাস্ত্র অস্ত্র তৈরির সামরিক কর্মসূচির গভীর ও প্রত্যক্ষ যোগসূত্র রয়েছে। রয়টার্স এবং চেইনঅ্যানালাইসিসের মতো স্বনামধন্য বৈশ্বিক সংবাদমাধ্যম ও ব্লকচেইন বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠানের প্রকাশিত গবেষণামূলক প্রতিবেদন থেকেই মূলত এই সংবেদনশীল তথ্যগুলো বিশ্ববাসীর সামনে উন্মোচিত হয়েছে।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক নানা কঠোর নিষেধাজ্ঞার বেড়াজালে আবদ্ধ থাকার কারণে বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার মূল স্রোতধারায় প্রবেশ করার ক্ষেত্রে উত্তর কোরিয়ার সুযোগ অত্যন্ত সীমিত ও সংকুচিত। প্রচলিত ও নিয়মতান্ত্রিক ব্যাংকিং চ্যানেলের মধ্য দিয়ে দেশটির পক্ষে যেকোনো ধরনের আর্থিক লেনদেন সম্পন্ন করা বর্তমানে অত্যন্ত দুরূহ ও জটিল একটি কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ ছাড়াও দেশটির বৈদেশিক বিনিয়োগ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও নানামুখী কঠোর বাধার প্রাচীর তৈরি করে রাখা হয়েছে। এমন এক প্রতিকূল ও শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতিতে দেশটির রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সবচেয়ে সহজ ও প্রধান নতুন উৎস হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে ডিজিটাল সাইবার অপরাধ। বিশেষ করে বিশ্বের বিভিন্ন ক্রিপ্টোকারেন্সি এক্সচেঞ্জ এবং অনলাইনভিত্তিক ডিজিটাল সম্পদ সংরক্ষণকারী সুপ্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানগুলোতে সুপরিকল্পিত হ্যাকিং চালিয়ে উত্তর কোরিয়ার হ্যাকার চক্রটি মুহূর্তের মধ্যে বিপুল পরিমাণ অর্থ লুট করে নিচ্ছে।
ব্লকচেইন নিরাপত্তা ও তথ্য বিশ্লেষণকারী শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান চেইনঅ্যানালাইসিসের সুনির্দিষ্ট হিসাব অনুযায়ী, একুশ শতকের বিশ শালের পঁচিশতম বছরে অর্থাৎ ২০২৫ সাল জুড়েই উত্তর কোরিয়ার কুখ্যাত হ্যাকাররা বিশ্বব্যাপী অন্তত ২০০ কোটি ২০ লাখ ডলার সমপরিমাণ ক্রিপ্টোকারেন্সি সফলভাবে চুরি করেছে। তাদের এই চুরির পরিমাণ তার আগের বছরের তুলনায় শতকরা একান্ন ভাগ বা ৫১ শতাংশ বেশি ছিল, যা সাইবার অপরাধের ভয়ংকর চিত্র তুলে ধরে। সব মিলিয়ে পঁচিশ সাল পর্যন্ত উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্র বা সংশ্লিষ্ট এজেন্সির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হ্যাকারদের মাধ্যমে মোট চুরি করা ক্রিপ্টো সম্পদের আর্থিক পরিমাণ অন্তত ৬৭৫ কোটি ডলারে গিয়ে ঠেকেছে। এর ঠিক পরপরই বিশ্বের অন্যতম প্রধান ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ প্ল্যাটফর্ম বাইন্যান্সের ওপর এই আকস্মিক ও ধ্বংসাত্মক হামলার ঘটনাটি সংঘটিত হয়।
ওই গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বিশ্লেষণ পর্যালোচনা করলে স্পষ্টত প্রতিভাত হয় যে, অতীতের বিভিন্ন সময়ের তুলনায় সাইবার হামলার সামগ্রিক সংখ্যা বা পরিমাণ কিছুটা হ্রাস পেলেও চুরি যাওয়া মোট অর্থের আর্থিক পরিমাণ আগের তুলনায় বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। অর্থাৎ, অতীতে যেখানে ছোটখাটো বা মাঝারি ধরনের ডিজিটাল চুরি বা সিঁদেল চুরির ঘটনা ঘটত, বর্তমান সময়ে উত্তর কোরিয়ার হ্যাকার দলগুলো রীতিমতো বিশাল আকারের পুকুর চুরির মতো মহা অপরাধের সঙ্গে সরাসরি জড়িয়ে পড়েছে। কেবল ক্রিপ্টোকারেন্সি বা ডিজিটাল মুদ্রা চুরি করাই উত্তর কোরিয়ার সংঘবদ্ধ হ্যাকারদের একমাত্র বা শেষ কাজ নয়, বরং বিভিন্ন উপায়ে চুরি করা সেই অবৈধ অর্থকে আন্তর্জাতিক বৈধ আর্থিক ব্যবস্থায় পুনরায় ব্যবহার উপযোগী মুদ্রায় রূপান্তর করাটাই তাদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এই অত্যন্ত জটিল কাজটি নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করার জন্য তারা একাধিক সুরক্ষিত ডিজিটাল ওয়ালেট, বিভিন্ন জটিল ব্লকচেইন প্রযুক্তি, ক্রিপ্টো বিনিময় মাধ্যম এবং বহুমুখী অর্থ পাচারের মধ্যস্থতাকারী সিন্ডিকেট বা নেটওয়ার্ক অত্যন্ত সুকৌশলে ব্যবহার করে থাকে।
যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ কোরিয়া এবং জাপানের যৌথ উদ্যোগে সদ্য গঠিত বহুপক্ষীয় নিষেধাজ্ঞা পর্যবেক্ষণ দল বা এমএসএমটি গত পঁচিশ সালের অক্টোবর মাসে প্রকাশিত তাদের একটি বিস্তারিত প্রতিবেদনে সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করেছিল যে, এভাবে জোরপূর্বক চুরি করা ক্রিপ্টোকারেন্সি নিরাপদে পাচার করার কাজে চীনসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আগে থেকেই অবস্থান করা বিশ্বস্ত মধ্যস্থতাকারীদের একটি বিশাল নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে থাকে উত্তর কোরিয়া। মূলত চীন, রাশিয়া, আর্জেন্টিনা, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো বিভিন্ন রাষ্ট্রে ছড়িয়ে থাকা এই মধ্যস্থতাকারীদের প্রত্যক্ষ সহায়তায় দেশটি তাদের সমস্ত অবৈধ ডিজিটাল সম্পদ খুব সহজেই প্রচলিত ও বৈধ মুদ্রায় রূপান্তর করে থাকে। এই পুরো প্রক্রিয়াটির ক্ষেত্রে তারা বিশেষ করে চীনের ওভার দ্য কাউন্টার বা ওটিসি বাজারের ব্যবসায়ীদের ওপর অস্বাভাবিক রকমের বেশি মাত্রায় নির্ভর করে থাকে। উক্ত প্রতিবেদনে আরও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশ করে বলা হয়েছে যে, উত্তর কোরিয়ার নিজস্ব তথ্যপ্রযুক্তি খাতের আয়কৃত অর্থ এবং ক্রিপ্টো চুরির সমস্ত কালো টাকা সফলভাবে পাচার করার কাজে অন্তত ১৫টি নিবন্ধিত চীনা ব্যাংককে বেআইনিভাবে ব্যবহার করা হয়েছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিশ্বখ্যাত কৌশলগত ও ভূরাজনৈতিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ বা সিএসআইএস-এর ছাব্বিশ সালের মার্চ মাসের এক গভীর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে যে, প্রথমে সাইবার আক্রমণের মাধ্যমে চুরি করা ক্রিপ্টোকারেন্সি অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে একাধিক নিরাপদ ডিজিটাল ওয়ালেটে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে স্থানান্তর করা হয়। এরপর বিভিন্ন ক্রিপ্টো বিনিময়ব্যবস্থা এবং জটিল ব্লকচেইন নেটওয়ার্কের বিভিন্ন পথ ঘুরে অর্থের মূল উৎস পুরোপুরি আড়াল করার এক সুদূরপ্রসারী অপচেষ্টা চালানো হয়। আবার কোনো কোনো বিশেষ ক্ষেত্রে ক্রিপ্টো মিক্সার প্রযুক্তির জাদুকরি ব্যবহার করে বিভিন্ন ভিন্ন ভিন্ন লেনদেনের সমস্ত অর্থ একত্রে মিশিয়ে পুনরায় তা নতুন করে ছোট ছোট ভাগে ভাগ করা হয়। একদম শেষ পর্যায়ে এসে বিশ্বের তৃতীয় কোনো দেশের স্থানীয় মধ্যস্থতাকারীদের প্রত্যক্ষ সহায়তায় সেই ডিজিটাল সম্পদগুলো মার্কিন ডলার কিংবা অন্য যেকোনো প্রচলিত শক্তিশালী বৈদেশিক মুদ্রায় সফলভাবে রূপান্তরিত করে ফেলা হয়।
গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সিএসআইএস তাদের পর্যালোচনায় আরও পরিষ্কার ভাষায় জানিয়েছে যে, উত্তর কোরিয়ার এই বহুমুখী সাইবার অপরাধের বিশাল সাম্রাজ্যের সঙ্গে বিদেশে আত্মগোপন করে থাকা তাদের নিজস্ব তথ্যপ্রযুক্তি কর্মী বাহিনী এবং তৃতীয় কোনো দেশের কুখ্যাত অর্থ পাচারকারী সিন্ডিকেটগুলো গভীরভাবে যুক্ত রয়েছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন স্বাধীন গবেষণা প্রতিবেদনে অতীতে বারবার জোরালোভাবে বলা হয়েছে যে, উত্তর কোরিয়ার এই বৃহৎ পরিসরের ক্রিপ্টো চুরির প্রতিটি ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন বা বিক্ষিপ্ত কিছু সাইবার অপরাধীর ব্যক্তিগত অপকর্ম হিসেবে দেখার কোনো সুযোগ বা অবকাশ নেই। বিশ্বের বিভিন্ন শক্তিশালী রাষ্ট্রের নিজস্ব সরকারি গোয়েন্দা তদন্ত এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের গভীর নজরদারিতে এই সমস্ত ধ্বংসাত্মক ও বেআইনি কর্মকাণ্ডের পেছনে দেশটির সরাসরি রাষ্ট্রীয় সাইবার সামরিক ইউনিটের নিবিড় ও প্রত্যক্ষ সংশ্লিষ্টতার সুস্পষ্ট তথ্য বারবার বিশ্ববাসীর সামনে উঠে এসেছে।
এই আন্তর্জাতিক সাইবার অপরাধ জগতের অত্যন্ত পরিচিত ও আলোচিত একটি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী হলো কুখ্যাত লাজারাস গ্রুপ, যাদের প্রতিটি কার্যক্রমেী বিশ্বজুড়ে তীব্র আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে। যুক্তরাষ্ট্র এবং দক্ষিণ কোরিয়াসহ বিশ্বের বেশ কয়েকটি শক্তিশালী দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে এই নির্দিষ্ট হ্যাকার গোষ্ঠীকে উত্তর কোরিয়ার প্রত্যক্ষ মদদপুষ্ট ও সংশ্লিষ্ট বলে চিহ্নিত করেছে। এই গোষ্ঠীর সশস্ত্র ক্যাডারদের বিরুদ্ধে বিশ্বের বিভিন্ন বড় বড় ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ, ডিজিটাল সম্পদ সংরক্ষণাগার এবং সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত ডিজিটাল ওয়ালেটগুলো নির্দিষ্ট করে সেগুলোতে সর্বাত্মক সাইবার হামলা চালানোর গুরুতর ও প্রমাণিত অভিযোগ রয়েছে। বিগত পঁচিশ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের দিকে ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ বাইবিট থেকে প্রায় দেড় শ কোটি ডলার মূল্যের বিপুল পরিমাণ ইথেরিয়াম মুদ্রা জালিয়াতি করে চুরির মূল ঘটনার জন্যও সরাসরি উত্তর কোরিয়ার এই সাইবার হ্যাকারদেরই প্রধানত দায়ী করা হয়েছিল। এই ধরনের অত্যন্ত নিখুঁত ও ধ্বংসাত্মক সাইবার আক্রমণগুলোতে কখনো কখনো সংশ্লিষ্ট সুপ্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানের নিরীহ কর্মীদের অত্যন্ত লোভনীয় ভুয়া চাকরির মিথ্যা প্রস্তাব দেওয়া হয়। আবার কখনো কখনো অত্যন্ত শক্তিশালী ক্ষতিকর সফটওয়্যার বা ম্যালওয়্যার পাঠিয়ে, কিংবা সুকৌশলে ডিজিটাল পরিচয় জালিয়াতির জঘন্য পথ বেছে নিয়ে টার্গেট করা প্রতিষ্ঠানের কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থার ভেতর অনায়াসে অনুপ্রবেশ করা হয়।
চেইনঅ্যানালাইসিসের গবেষণার সুনির্দিষ্ট তথ্য থেকে এটি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, বিগত পঁচিশ সালের পুরো সময় জুড়ে উত্তর কোরিয়ার সাইবার হ্যাকাররা বিশ্বের বিভিন্ন বড় বড় ক্রিপ্টো প্রতিষ্ঠানের অত্যন্ত দুর্ভেদ্য নিরাপত্তাব্যবস্থা ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে অভাবনীয় ও বিশেষ সফলতা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। তাদের এই ধারাবাহিক ও পরিকল্পিত সাইবার হামলায় মূলত প্রতিষ্ঠানের ভেতরে থাকা অসতর্ক কর্মীদের নিজস্ব ডিজিটাল পরিচয় এবং তাদের গোপন প্রবেশাধিকার বা অ্যাক্রেডিটেশন অত্যন্ত সুকৌশলে ব্যবহার করে বিপুল অংকের অর্থ বিনা বাধায় অন্যত্রে সরিয়ে নেওয়ার এক বিপজ্জনক প্রবণতা ও প্রবণতা ব্যাপকভাবে দেখা গেছে। ক্রিপ্টোকারেন্সি বা ডিজিটাল মুদ্রা চুরির এই সমস্ত ধ্বংসাত্মক কার্যক্রমের পাশাপাশি সম্পূর্ণ ভিন্ন উপায়ে বিদেশে নিজেদের দক্ষ তথ্যপ্রযুক্তি কর্মী বা আইটি প্রফেশনাল পাঠিয়েও প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা বৈধ বা অবৈধ উপায়ে অর্জন করে চলেছে উত্তর কোরিয়া। দেশটির এই বিশেষ কর্মীরা খুব সহজেই বিভিন্ন ভুয়া পরিচয়পত্র, জাল শিক্ষাগত সনদ এবং কৃত্রিম নথিপত্র ব্যবহার করে বিশ্বের বিভিন্ন নামিদামি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে উচ্চ বেতনে চাকরি বাগিয়ে নেন।
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণকারী আন্তর্জাতিক দল এমএসএমটির প্রকাশিত পঁচিশ সালের গবেষণামূলক প্রতিবেদনে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা প্রায় দুই হাজারেরও বেশি উত্তর কোরীয় তথ্যপ্রযুক্তি কর্মীর অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর ও সুনির্দিষ্ট তথ্য সবিস্তারে প্রকাশিত হয়েছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয় ছাব্বিশ সালের ১২ মার্চ তারিখে এক প্রজ্ঞাপন জারি করে এই ধরনের প্রতারক তথ্যপ্রযুক্তি কর্মীদের অবৈধ আয় অর্জন এবং সেই সমস্ত অর্থ পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে নিরাপদে স্থানান্তরের কাজে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সহায়তা করার সুনির্দিষ্ট অভিযোগে মোট ছয় জন ব্যক্তি এবং দুটি বড় প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। চেইনঅ্যানালাইসিসের বিশ্বস্ত তথ্যভাণ্ডার অনুযায়ী, তার আগের বছর অর্থাৎ ২০২৪ সালে উত্তর কোরিয়া তাদের এই সমস্ত তথ্যপ্রযুক্তি কর্মীদের বিভিন্ন প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ড ও জালিয়াতি থেকে প্রায় আশি কোটি মার্কিন ডলার সমপরিমাণ অর্থ অবৈধভাবে আয় করেছে বলে মার্কিন গোয়েন্দা ও নীতিনির্ধারক মহলের জোরালো ধারণা রয়েছে। এ সমস্ত অবৈধ উপায়ে অর্জিত বিশাল অংকের অর্থের একটি বড় অংশই পরবর্তী সময়ে ক্রিপ্টোকারেন্সির অত্যন্ত জটিল ও নিরাপদ মাধ্যম ব্যবহার করে অত্যন্ত গোপনে অন্যত্র স্থানান্তরিত করা হয়েছে।
সবশেষে বলা যায় যে, উত্তর কোরিয়ার এই লাগাতার সাইবার অপরাধ, বেআইনি অর্থ পাচার এবং সুদূর প্রবাসে ভুয়া পরিচয়ে কর্মী প্রেরণের সম্পূর্ণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে দেশটির অত্যন্ত গোপনীয় ও বিপজ্জনক পারমাণবিক এবং দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র অস্ত্র তৈরির সামরিক কর্মসূচির এক গভীর ও অবিচ্ছেদ্য সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলে জোরালো অভিযোগ রয়েছে। যদিও সাইবার হামলার মাধ্যমে জালিয়াতি করে চুরি করা সমগ্র অর্থের শতভাগ অংশই যে সরাসরি দেশটির সামরিক খাতে অত্যন্ত কঠোরভাবে ব্যয় করা হয়, তার পক্ষে সুনির্দিষ্ট বা শতভাগ অকাট্য কোনো প্রমাণ হয়তো সবসময় পাওয়া যায় না। তবুও আন্তর্জাতিক সমস্ত বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের বহুমুখী ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড সফলভাবে পরিচালনার মাধ্যমে সুকৌশলে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞাগুলোকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে নিজস্ব অর্থনীতির জন্য প্রয়োজনীয় বৈদেশিক মুদ্রা সংগ্রহের এক নিরাপদ ও দুর্ভেদ্য পথ দিন দিন তৈরি করে চলেছে উত্তর কোরিয়া।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।