
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
ঐতিহাসিক দাসপ্রথার সঙ্গে জড়িত নিষ্ঠুরতার ঘটনায় আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা প্রার্থনা করতে পারে যুক্তরাজ্য। তবে এর বিপরীতে কোনো ধরনের আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেওয়ার পরিকল্পনা বা প্রস্তাব দৃঢ়ভাবে নাকচ করে দিয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী। এর আগে পূর্বসূরিদের অনুসৃত নীতি বজায় রেখেই এমন আর্থিক ক্ষতিপূরণের বিষয়টি সম্পূর্ণ এড়িয়ে গেছেন তিনি।
ক্যারিবীয় অঞ্চলে আগামী সপ্তাহে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কমনওয়েলথ নেতাদের শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ঠিক এই মুহূর্তে ব্রিটিশ রাজা তৃতীয় চার্লসের চলমান ওই অঞ্চল সফর কেন্দ্র করে দাসপ্রথার জন্য ব্রিটেনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক ক্ষমা চাওয়ার জোরালো দাবি উঠেছে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর একটি বিশেষ নিবন্ধ প্রকাশের পর এমন আলোচনা নতুন মাত্রা লাভ করেছে।
প্রধানমন্ত্রী বার্নহামের নিবন্ধ প্রকাশের পর ব্রিটিশ চ্যান্সেলর জন হিলি গণমাধ্যম বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে একটি বড় মন্তব্য করেন। তিনি জানান যে ক্ষমা চাওয়ার পুরো বিষয়টি নিয়ে আলোচনার জন্য তারা সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছেন। কমনওয়েলথ সরকারপ্রধানদের আসন্ন শীর্ষ সম্মেলনের আগে এ ধরনের আলোচনা করা অত্যন্ত সঠিক একটি সিদ্ধান্ত বলেও তিনি মনে করেন।
তবে চ্যান্সেলর হিলি বিষয়টি আরও স্পষ্ট করে জানিয়ে দেন যে প্রধানমন্ত্রী বার্নহাম কখনোই মনে করেন না ক্ষতিপূরণ প্রদান করা সঠিক কোনো পদ্ধতি হতে পারে। তাঁর মতে, শত শত বছর পূর্বে ঘটে যাওয়া কোনো নৃশংস ঘটনার জন্য বর্তমান যুগের সাধারণ ব্রিটিশ নাগরিকদের কোনোভাবেই কোনো ধরনের আর্থিক দায়ভার বহন করা উচিত নয়।
যুক্তরাজ্যের বর্তমান সরকারের এমন সিদ্ধান্তের সঙ্গে পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছেন বিরোধী কনজারভেটিভ পার্টির শীর্ষনেতা কেমি বেইডনকও। তিনি নিজের বক্তব্যে স্পষ্ট করে বলেন যে বর্তমান প্রজন্মের ব্রিটিশ করদাতাদের বহু আগের এমন একটি ঘটনার জন্য আর্থিকভাবে দায়ী করার কোনো ভিত্তি বা কারণ থাকতে পারে না। বর্তমান ব্রিটিশ নাগরিকদের জন্মের বহু বছর আগেই এই বেদনাদায়ক ঐতিহাসিক ঘটনাগুলো সংঘটিত হয়েছিল।
এদিকে যুক্তরাজ্যের বর্তমান এই অবস্থানের কারণে বিভিন্ন মহলে বেশ মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। বার্বাডোসের প্রধানমন্ত্রী মিয়া মোটলি ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর এই আলোচনায় বসার প্রস্তাবকে অত্যন্ত ইতিবাচক হিসেবে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে তারা অত্যন্ত গঠনমূলকভাবে এতে অংশ নেবেন, যদিও তাদের ন্যায়বিচার পাওয়ার মূল দাবি সব সময় অব্যাহত থাকবে।
অন্যদিকে অল-পার্টি পার্রামেন্টারি গ্রুপ ফর আফ্রিকান রিপারেশনস বা এপিজিজি-র নেতা বেল রিবেরো-অ্যাডি ভিন্ন এক মন্তব্য করেছেন। তিনি জানান যে যুক্তরাজ্যের কাছে কোনো নির্দিষ্ট আর্থিক ক্ষতিপূরণের আনুষ্ঠানিক দাবি জানানো হয়েছে কিনা তা তাঁর জানা নেই। তাঁর মতে, শুধু আর্থিক ক্ষতিপূরণ নিয়ে অহেতুক আলোচনা করা মূলত মূল বিষয়টিকে আড়াল করার একটি সূক্ষ্ম অপচেষ্টা মাত্র।
অন্যদিকে দ্য রিপেয়ার ক্যাম্পেইন নামক সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা ডেনিস ও’ব্রায়েন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর এমন বক্তব্যে তীব্র হতাশা ব্যক্ত করেছেন। তাঁর সুনির্দিষ্ট মতে, ব্রিটিশ সরকারের উচিত বিষয়টিকে এড়িয়ে যাওয়ার নীতি থেকে সরে এসে এখনই অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক ক্ষমা প্রার্থনা করা।
উল্লেখ্য যে ষোড়শ শতাব্দী থেকে শুরু করে দীর্ঘ শত শত বছর ধরে ব্রিটিশ রাজপরিবার ও দেশটির সরকার সরাসরি দাস ব্যবসার সঙ্গে অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিল। পরবর্তীতে অনেক পরে ১৮৩৩ সালে একটি নতুন আইন পাসের মাধ্যমে যুক্তরাজ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে দাসপ্রথা বিলুপ্ত করা হয়। তবে সেই সময়ে দাস মালিকদের বিশাল অঙ্কের ক্ষতিপূরণ পরিশোধ করার জন্য ব্রিটেনকে অত্যন্ত বড় অঙ্কের ঋণ গ্রহণ করতে হয়েছিল, যা সম্পূর্ণ পরিশোধ করতে করতে ২০১৫ সাল গড়িয়ে গিয়েছিল। এরও আগে ২০০৭ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার ট্রান্স আটলান্টিক দাসপ্রথায় ব্রিটেনের ঐতিহাসিক ভূমিকা নিয়ে গভীর দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন।
সূত্র: আজকের পত্রিকা