
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
বারবার তাগাদা দেওয়া সত্ত্বেও অভিনয়ের জন্য শিডিউল না পাওয়ার গুরুতর অভিযোগ এনে ঢাকাই সিনেমার জনপ্রিয় চিত্রনায়ক শরীফুল রাজের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে আইনি নোটিশ পাঠিয়েছে রিয়েল এনার্জি প্রোডাকশন। প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে পাঠানো ওই নোটিশপত্রে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে দাবি জানানো হয়েছে যে, এই নোটিশ ইস্যু করার পর থেকে ঠিক পরবর্তী ৪৮ ঘণ্টার ভেতরেই যেন অভিনেতা শরীফুল রাজ প্রয়োজনীয় শিডিউল নিশ্চিত করেন। অন্যথায় প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে প্রচলিত আইন ও সঠিক ন্যায়বিচারের কাঠামোর ভেতরে থেকেই সম্পূর্ণ আইনানুগ যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। আলোচিত এই আইনি নোটিশটি চলতি সপ্তাহের আজ শনিবারের দিনে পাঠানো হয়েছে বলে নিশ্চিত করা গেছে।
প্রযোজনা সংস্থার সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র এবং প্রেরিত নোটিশ সূত্রে বিস্তারিত তথ্য মিলেছে যে, নির্মীয়মাণ ‘ঠিকানা’ শিরোনামের এই সিনেমাটির মূল প্রযোজক হলেন শাহরিন আক্তার। আর এই চলচ্চিত্রটি পরিচালনার দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন পরিচালক জুবায়ের ইবনে বকর। প্রাথমিক চুক্তিপত্রের বিভিন্ন শর্ত অনুযায়ী, আসন্ন কোনো একটি পবিত্র ঈদে কিংবা ঈদের অব্যবহিত পরের কোনো একটি সময়ে প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাবে এই সিনেমাটি। তবে সিনেমাটি যদি কোনো কারণে নির্দিষ্ট ওই ঈদে মুক্তি না পেয়ে পরবর্তীতে মুক্তি পায়, তবে ঠিক কোন সুনির্দিষ্ট তারিখে তা মুক্তি পাবে, তার কোনো নির্দিষ্ট ও পাকাপোক্ত দিনতারিখ চুক্তিতে উল্লেখ করা ছিল না।
এ প্রসঙ্গে সিনেমার সম্মানিত প্রযোজক শাহরিন গণমাধ্যমকে নিজের বক্তব্য জানাতে গিয়ে বলেন যে, তারা যে একটি নতুন সিনেমা নির্মাণ করতে যাচ্ছেন, সে বিষয়ে বেশ অনেক দিন আগে থেকেই আলোচনা চূড়ান্ত হয়েছিল এবং সেই হিসেবেই নির্দিষ্ট চুক্তি সম্পন্ন করা হয়েছে। তাদের মূল পরিকল্পনা ছিল সিনেমাটি আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহার উৎসবে সর্বসাধারণের মাঝে মুক্তি দেওয়া। এছাড়া সম্পাদিত চুক্তিতে পরিষ্কারভাবে এ কথাও বলা হয়েছিল যে, ঈদের এই বিশেষ সময়ে চিত্রনায়ক রাজ অন্য কোনো নতুন সিনেমায় অভিনয় করতে পারবেন না। কিন্তু অত্যন্ত অবাক করার মতো বিষয় হলো, হুট করেই দেখতে পাওয়া গেল যে রাজ একসঙ্গে আরও ভিন্ন দুটি নতুন সিনেমায় কাজ শুরু করতে যাচ্ছেন। শুধু তাই নয়, সেই নতুন সিনেমাগুলো নাকি নির্দিষ্ট ওই ঈদেই মুক্তি পাওয়ার কথা রয়েছে এবং সেগুলোতে তিনি নিজের শিডিউল ঠিকই দিয়ে দিয়েছেন, অথচ তাদের বহুল প্রতীক্ষিত সিনেমাটির জন্য তাকে বারবার অনুরোধ করা সত্ত্বেও তিনি কোনো শিডিউল দিচ্ছেন না।
প্রযোজক শাহরিন আরও ক্ষোভের সুরে যোগ করেন যে, তাদের সঙ্গে প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পরবর্তী সময়েই রাজ ওই অন্য সিনেমাগুলোতে নিজের শিডিউল প্রদান করছেন, যা তিনি কোনোভাবেই করতে পারেন না। কারণ চুক্তির মূল শর্ত অনুযায়ী, ঈদে কেবল তাদের প্রযোজিত সিনেমাই মুক্তি পাওয়ার কথা রয়েছে এবং সেই সময়ে তাঁর অভিনীত আর কোনো নতুন সিনেমা রিলিজ হওয়ার কথা নয়। অথচ এখন অন্য সব সিনেমার কাজ ঠিকঠাক করে তারা নিজেদের সিনেমার জন্য রাজের কাছে গিয়ে মার্চ মাসের শিডিউল পেতে চাচ্ছেন। এমন পরিস্থিতিতে মার্চের শুরুতে শিডিউল নিয়ে কীভাবে তারা সেই সিনেমার কাজ শেষ করে আসন্ন ঈদ উৎসবে তা প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি দেবেন, তা নিয়ে গভীর সংশয় ও জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে।
এদিকে শনিবারের দিনে প্রেরিত আইনি নোটিশে যেহেতু এই মর্মে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে যে সিনেমাটি পবিত্র ঈদ কিংবা ঈদের পরেও যেকোনো সময়ে মুক্তি পেতে পারে, তাই এই বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে প্রযোজক শাহরিন পরিষ্কার জানিয়ে দেন যে, তারা মূলত আসন্ন ঈদেই সিনেমাটি বড় পর্দায় মুক্তি দিতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এর বাইরে অন্য কোনো কথা বা শর্ত সেখানে লেখা থাকার কথা নয় বলে তিনি দৃঢ়ভাবে দাবি করেন।
অন্যদিকে এই গোটা পরিস্থিতি নিয়ে চলচ্চিত্রের পরিচালক জুবায়ের ইবনে বকর গণমাধ্যমকে জানান যে, তারা বাধ্য হয়েই চিত্রনায়ক শরীফুল রাজের বিরুদ্ধে এমন কঠোর আইনি নোটিশ পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং সংবাদকর্মীদের বিষয়টি নিয়ে নিউজ করার অনুরোধ জানান। তিনি আরও যোগ করেন যে, রাজ তাঁদের শিডিউল তো দিচ্ছেনই না, এমনকি পাওনা টাকাও যথাসময়ে দিচ্ছেন না, যার ফলে তিনি তাদের সম্পূর্ণভাবে এক প্রকার বিপদে বা ফাঁদে ফেলে দিয়েছেন। তবে এর পরপরই পরিচালক এই বিষয়ে আর কোনো বাড়তি বক্তব্য দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে বলেন যে, এই সমস্ত বিষয়ে কথা বলার প্রকৃত ও সঠিক মানুষ হলেন একমাত্র প্রযোজক, তাই তাঁর কাছ থেকেই যেন বিস্তারিত বক্তব্য নেওয়া হয়।
সিনেমার প্রযোজক শাহরিন এই প্রসঙ্গে আরও স্পষ্ট করে বলেন যে, তারা কখনোই রাজের কাছে টাকা পয়সা চাননি, বরং তারা মূলত চেয়েছেন কাজের জন্য প্রয়োজনীয় শিডিউল। টাকা চেয়েও তারা পাচ্ছিলেন না—এমন কোনো মিথ্যে বা ভিত্তিহীন অভিযোগের বিন্দুমাত্র অবকাশ সেখানে নেই। তাহলে কি চিত্রনায়ক রাজ জেনেশুনেই তাদের কোনো শিডিউল দিতে চাচ্ছেন না? এমন সুনির্দিষ্ট প্রশ্নের জবাবে প্রযোজক শাহরিন জানান যে, রাজ তাদের মূলত মার্চের শুরুর দিকে শিডিউল প্রদান করতে চান, কিন্তু সেই স্বল্প সময়ে কীভাবে সিনেমার সমস্ত শুটিং শেষ করে ঈদে মুক্তি দেওয়া সম্ভব হবে, তা নিয়ে দেখা দেওয়া অনিশ্চয়তার কারণেই মূলত এই আইনি নোটিশ পাঠানোর পথ বেছে নিতে হয়েছে।
এদিকে অভিনেতা শরীফুল রাজের পক্ষ থেকে এই সমস্ত আনীত অভিযোগ এবং আইনি নোটিশের কড়া জবাব দিয়ে গণমাধ্যমকে জানানো হয় যে, তারা একবার অর্থের কথা তুলে দাবি করছে যে তিনি নাকি টাকা পরিশোধ করছেন না, আবার অন্যদিকে ঘুরেফিরে শিডিউলের কথা তুলছে—প্রকৃতপক্ষে তারা ঠিক কী চাচ্ছেন বা কী চান, সেটাই বোধগম্য নয়। রাজ অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলেন যে, কেউ যদি তাঁর কাছে টাকা চেয়ে থাকে, তবে তারা তা নিয়ে চলে যাক, আর যদি তারা শিডিউল চেয়ে থাকে, তবে তিনি তা অবশ্যই যথারীতি প্রদান করবেন। তিনি তো মূলত অভিনয় করতেই এই চলচ্চিত্রাঙ্গনে পা রেখেছেন এবং তাঁর দীর্ঘ অভিনয় ক্যারিয়ারে কেউ কখনো বলতে পারবে না যে তিনি টাকা নিয়েও শুটিংয়ের শিডিউল দেননি। তিনি সবসময়ই চলচ্চিত্রে নিয়মিত কাজ করতে চান এবং কাজকেই নিজের প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে দেখেন।
রাজের কাছে যখন জানতে চাওয়া হয় যে প্রযোজক তো বলেছেন ঈদে তাঁর একটি সিনেমা মুক্তি পাওয়ার কথা রয়েছে এবং সেই অনুযায়ীই তাঁকে শিডিউল দিয়ে সর্বাত্মক সহযোগিতা করার কথা ছিল, অথচ তিনি সেই সময়ে আরও অন্যান্য সিনেমা মুক্তি দিচ্ছেন, তখন শরীফুল রাজ এর প্রত্যুত্তরে জানান যে, সিনেমাটি তো নির্দিষ্ট সেই ঈদেই মুক্তি পাবে এবং এর মানে এই নয় যে অন্য কোনো সিনেমা করা যাবে না। তাদের প্রবল ইচ্ছা থাকতেই পারে যে সিনেমাটি তারা ঈদে মুক্তি দেবেন, সেটা বেশ ভালো কথা, কিন্তু অন্য কোনো সিনেমা করা যাবে না—এমন কোনো শর্ত তো সম্পাদিত চুক্তির কোথাও স্পষ্টভাবে লেখা ছিল না। আবার তাদের সিনেমাটি যে শতভাগ নিশ্চিতভাবেই ঠিক ঈদে মুক্তি পাবে, বিষয়টি তাও নয়, কারণ প্রেরিত আইনি নোটিশের ভেতরেই তো খোদ ঈদের পরেও সিনেমাটি মুক্তি পাওয়ার কথা উল্লেখ রাখা হয়েছে। সেই সুনির্দিষ্ট বিষয়টিকে সামনে রেখেই তো তারা অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে কাজটি সম্পন্ন করতে পারতেন, কিন্তু পেশাদারিত্বের এমন একটি জায়গায় শুধুমাত্র শিডিউল দেওয়াকে কেন্দ্র করে এই ধরনের অমূলক অভিযোগ ও আইনি নোটিশ তাঁকে চরমভাবে হতবাক করেছে।
তাহলে শেষ পর্যন্ত মূল চুক্তিপত্রে ও আইনি নোটিশের ভেতরে ঠিক কী লেখা রয়েছে, এমন সুনির্দিষ্ট প্রশ্নের জবাবে চিত্রনায়ক শরীফুল রাজ ব্যাখ্যা দিয়ে জানান যে, তাঁদের পারস্পরিক চুক্তির ৪.১১ নম্বর ধারায় সিনেমাটি মুক্তি পাওয়া কিংবা মুক্তির শিডিউল নির্ধারণের সময়কাল সংক্রান্ত বিষয়গুলো অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করা রয়েছে। এমনকি আইনি নোটিশের দ্বিতীয় নম্বর ধারার ভেতরেও সিনেমাটির মুক্তিলাভের প্রেক্ষাপট নিয়ে অবিকল একই ধরনের কথাই বলা হয়েছে। সিনেমাটি সুনির্দিষ্টভাবে যে শুধু ঈদেই মুক্তি পাবে, বিষয়টি মোটেও তেমন নয়, বরং অন্য যেকোনো সময়েও তা মুক্তি পেতে পারে বলে সেখানে ইঙ্গিত রয়েছে। কিন্তু এর মাঝে পরবর্তীতে ঠিক কবে সেই মুক্তি হবে, তার কোনো নির্দিষ্ট দিনক্ষণ সেখানে অনুপস্থিত। এতকিছুর মাঝেই শুধুমাত্র শিডিউল সংগ্রহ করার মতো একটি সাধারণ বিষয়কে কেন্দ্র করে পক্ষটি তাঁর বিরুদ্ধে আইনি নোটিশ পাঠিয়ে দিয়েছে। এখন তিনিও নিজের পেশাগত সুরক্ষার স্বার্থে আইনগতভাবেই সমস্ত বিষয়ে কথা বলবেন এবং মূল চুক্তির নানা ধরনের ভিন্নতা ও অসঙ্গতি নিয়ে তিনি জনসমক্ষে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কথাই বলতে পারেন। তাঁর মূল কাজ হলো যথাসময়ে শিডিউল প্রদান করা এবং ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে শুটিংয়ের কাজ শেষ করা। বর্তমান সময়ে তিনি তো আর বছরে মাত্র একটি মাত্র চলচ্চিত্রে অভিনয় করছেন না, তাই সব মিলিয়ে পেশাদার এই কর্মক্ষেত্রে তিনি ছোটখাটো এসব বিতর্কের চেয়ে বরং নিজের অভিনয় ও কাজ নিয়েই অনেক বেশি মনোযোগী থাকতে চান। প্রযোজক ও পরিচালক উভয়ের প্রতি তাঁর মনে যথেষ্ট সম্মান ও শ্রদ্ধাবোধ রয়েছে এবং তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে তাঁরা ঠান্ডা মাথায় পুরো বিষয়টি গভীরভাবেই অনুধাবন করতে পারবেন।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।