
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
কেমন আছেন—এই সাধারণ জিজ্ঞাসাটার জবাবে মুখে এক টুকরো ম্লান ও কৃত্রিম হাসি ফুটে ওঠে বাংলাদেশের সাবেক সফল ফুটবলারের। সেই হাসির চাদরেও কোনোভাবেই ঢাকা পড়ে না তাঁর মুখাবয়বে লেপ্টে থাকা গভীর যন্ত্রণার ছাপ। একটি দীর্ঘশ্বাসের সঙ্গে তিনি জানান, তাঁর প্রতিটি দিন কাটছে কেবল শয্যাগত কিংবা বসে থাকার মধ্য দিয়ে। নিজের পায়ে হেঁটে চলা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়, বেশিক্ষণ সোজা হয়ে বসে থাকাও তাঁর জন্য অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। ঘর ছেড়ে কোথাও যাওয়ার সুযোগ তাঁর নেই, আর চলাফেরা না করতে পারলে কোনো কাজের সুযোগও তৈরি হয় না। আয়ের কোনো পথ খোলা না থাকলে মানুষ কীভাবে ঘরে বসে দিনাতিপাত করবে, অথচ বাধ্য হয়েই তাঁকে সেই কষ্টের পথটি বেছে নিতে হচ্ছে। একটু থেমে তিনি আরও জানান, তাঁর বুকজুড়ে এমন এক না বলা ব্যথা জমা হয়ে আছে, যা সবার সামনে প্রকাশ করা যায় না। নিজের যন্ত্রণার পাহাড় তিনি একাই নিজের মনের গভীরে জমিয়ে রাখেন।
এভাবেই তিনি অত্যন্ত সংক্ষেপে নিজের বর্তমান যাপিত জীবনের এক নির্মম ও নিষ্ঠুর বাস্তব চিত্র তুলে ধরেন। খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে সক্রিয় থাকা কাল থেকেই তিনি স্বভাবগতভাবে অন্তর্মুখী ছিলেন, যা এখন আরও প্রকট হয়ে তাঁকে গুটিয়ে ফেলেছে। আজ থেকে প্রায় পাঁচ বছর আগে তাঁর ব্যক্তিগত জীবনে এক মারাত্মক ট্র্যাজেডি নেমে আসে, যে গভীর অন্ধকার থেকে তিনি আজও পুরোপুরি আলোয় ফিরতে পারেননি। ভারতের হুগলি জেলায় শ্বশুরবাড়িতে বেড়াতে গিয়ে তিনি একটি সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হয়েছিলেন। দীর্ঘমেয়াদি ও কষ্টসাধ্য চিকিৎসার ফলে তাঁর পা কেটে বাদ দেওয়ার হাত থেকে রক্ষা পেলেও তাঁকে মূলত পঙ্গুত্ববরণ করেই বেঁচে থাকতে হচ্ছে। এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার কিছুদিন বাদেই তিনি তাঁর প্রিয় স্ত্রীকেও চিরতরে হারিয়ে ফেলেন। তাঁর দুই কন্যাসন্তান বর্তমানে ভারতেই নানাবাড়িতে বসবাস করছে এবং পড়াশোনা কিংবা চাকরির ফাঁকে সামান্য ছুটি পেলেই তারা বাংলাদেশে এসে বাবাকে দেখে যান।
২০২৩ সালের শুরুর দিকে দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে রজনীকান্তের এই মানবেতর ও করুণ পরিস্থিতি নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হলে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনায় যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় তাঁর নামে ৩০ লাখ টাকার একটি পারিবারিক সঞ্চয়পত্র প্রদান করে। ওই সঞ্চয়পত্র থেকে প্রতি মাসে যে মুনাফা পাওয়া যায়, তা দিয়েই মূলত তাঁর দৈনন্দিন সংসার কোনোমতে পরিচালিত হচ্ছে। এই আর্থিক সহায়তাটি কিছুটা কাজে লাগলেও পাঁচ সদস্যের একটি পরিবারের ভরণপোষণ এর মাধ্যমে ভালোভাবে চালিয়ে যাওয়া বেশ কঠিন। পরিস্থিতি যতই কঠিন হোক না কেন, রজনী কারও কাছে নিজের কষ্টের কথা মুখ খুলে বলতে রাজি নন। তিনি জানান, তাঁর এই অসহায় অবস্থার কথা অবগত হয়ে সাবেক দুই জাতীয় ফুটবলার ইমতিয়াজ আহমেদ নকীব ও মঞ্জুরুল করিম মঞ্জুর আন্তরিক সহযোগিতায় কদিন আগে তাঁর ফোনে কথা হয় একসময়ের সতীর্থ ও বন্ধু, বর্তমানের যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হকের সঙ্গে।
খোঁজখবর নেওয়ার একপর্যায়ে ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী নাকি রজনীর কাছে জানতে চেয়েছেন যে, তাঁকে কীভাবে সহযোগিতা করা সম্ভব বা তাঁর ঠিক কী ধরনের সাহায্য প্রয়োজন। তবে তীব্র সংকোচ ও দ্বিধার কারণে রজনী তাৎক্ষণিকভাবে কোনো জবাব দিতে পারেননি এবং এ বিষয়ে কিছু সময় চেয়ে নিয়েছেন। নকীব ও মঞ্জু চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন প্রতিমন্ত্রীর মাধ্যমে রজনীর জন্য কোনো স্থায়ী আর্থিক সহযোগিতার ব্যবস্থা করা যায় কি না। কিন্তু প্রশ্ন জাগে, বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন বাফুফে কি কখনো তাঁর পাশে এসে দাঁড়িয়েছে? কিংবা তিনি অতীতে যেসব ক্লাবের হয়ে মাঠ কাঁপিয়েছেন, সেই ক্লাবগুলো কি কোনো সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে? এসব প্রশ্নের জবাবে রজনীর খুব সংক্ষিপ্ত ও মলিন উত্তর হলো, ‘না।’
জীবনের চরম অসহায়ত্ব তাঁকে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে গেছে যে তিনি দেশের মূলধারার ফুটবল অঙ্গন থেকে প্রায় পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন। তিনি আক্ষেপের সুরে বলেন, জীবনের এই করুণ অবস্থার পর থেকে তিনি নিজেকে সমাজের চোখ থেকে আরও বেশি আড়াল করে রেখেছেন। তবে ফুটবল খেলার প্রতি তাঁর অনুরাগ ও আকর্ষণ আজও একটুও কমে যায়নি। তিনি দৃঢ়ভাবে জানান, ফুটবলকে ভালো না বেসার তো কোনো কারণ থাকতে পারে না, কারণ এই খেলাটিই তাঁকে জীবনে অনেক কিছু এনে দিয়েছে। ফুটবল নিয়ে তাঁর কোনো ধরনের অভিযোগ বা অভিমান নেই, যা কিছু অভিমান জমা আছে তা কেবল নিজের ভাগ্য ও অবস্থাকে ঘিরেই।
আজ থেকে ২৩ বছর আগের ঐতিহাসিক সাফ জয়ের স্মৃতি রোমন্থন করতে গেলেই তাঁর চোখের কোণ দুটি জলে চিকচিক করে ওঠে। কার্ডের নিষেধাজ্ঞার কারণে যখন তিনি ফাইনালে মাঠে নামতে পারেননি, তখন অশ্রুসিক্ত নয়নে বন্ধু হাসান আল মামুন—যিনি বর্তমানে জাতীয় দলের সহকারী কোচ—তাঁর হাতে দলের আর্মব্যান্ড তুলে দিয়েছিলেন। সেই মুহূর্তের স্মৃতিচারণ করে রজনী বলেন, দল ঘোষণার পরপরই কোচ জর্জ কোটান তাঁকে নির্দেশ দিয়েছিলেন হাসান আল মামুনের হাতে আর্মব্যান্ড তুলে দিতে। সেই দায়িত্ব হস্তান্তরের সময় তিনি কেঁদে ফেলে বলেছিলেন যে দেশের বড় দায়িত্ব এবার তাঁর ওপর অর্পিত হলো।
রজনীকে ফাইনালে না পাওয়ার ধাক্কা বড় হলেও বাংলাদেশ দল যেন সেই কষ্ট থেকেই অতিরিক্ত উজ্জীবিত হয়ে বুক চিতিয়ে লড়াই করেছিল এবং নিজেদের সর্বোচ্চ উজাড় করে দিয়েছিল। ফাইনালে খেলতে না পারার গভীর বেদনা মনে থাকলেও টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার অর্জনের স্মৃতি আজও তাঁকে ভীষণভাবে আপ্লুত করে তোলে। তিনি বলেন, মাঠে ফাইনালে খেলতে না পারলেও তিনি টুর্নামেন্টের সেরা নির্বাচিত হয়েছিলেন, অথচ তিনি কখনোই কোনো প্রথাগত স্ট্রাইকার বা গোল করার খেলোয়াড় ছিলেন না।
দেশের মাটিতে এবার অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে আরেকটি নতুন সাফ টুর্নামেন্ট। এবারের জাতীয় দলে যেমন দেশের অভিজ্ঞ ফুটবলাররা আছেন, তেমনই যুক্ত হয়েছেন হামজা চৌধুরী ও শমিত সোমের মতো প্রবাসী কৃতি খেলোয়াড়েরা। দলটিকে নিয়ে রজনীর মনে যথেষ্ট ইতিবাচক আশা কাজ করছে। তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, এবারের আসরে চ্যাম্পিয়ন হওয়া উচিত এবং এ বিষয়ে তাঁর পূর্ণ আশাবাদ রয়েছে। যেহেতু খেলাটি এবার নিজের দেশ ও নিজের মাঠে হচ্ছে, তাই ঘরের দর্শক এবং ঘরের মাঠের সমস্ত সমর্থন দল পাবে। তবে খেলোয়াড়দের মনে অবশ্যই পর্যাপ্ত সাহস রাখতে হবে, কারণ দিনশেষে একটি বড় শিরোপা অর্জন করা আমাদের অত্যন্ত জরুরি। কোনো শিরোপা না জিতলে যতই হৈচৈ করা হোক না কেন, সাধারণ মানুষ তা গ্রহণ করবে না কারণ মানুষ মূলত সাফল্য দেখতে চায়। দল যদি চ্যাম্পিয়ন হতে পারে, তবে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া দর্শকরা আবার স্টেডিয়ামে ফিরে আসবে, নতুন প্রজন্ম দারুণভাবে অনুপ্রাণিত হবে এবং ভবিষ্যতে আরও ভালো খেলোয়াড় তৈরি হবে।
দুর্ঘটনার পর থেকে বাফুফে বা দেশের ফুটবল কতৃপক্ষ তাঁর আর সেভাবে কোনো খোঁজ নেয়নি এবং কোনো বিশেষ আয়োজনে তাঁকে বিন্দুমাত্র সম্মান জানানোও হয়নি। যদি সাফের এবারের আসরে তাঁকে খেলার মাঠে যাওয়ার জন্য কোনো টিকিট দেওয়া হয় বা স্টেডিয়ামে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়, তবে কি তিনি যাবেন? সমস্ত অভিমানকে মনে চেপে একধরনের সংশয়মাখা কণ্ঠে রজনী উত্তর দেন যে তিনি নিজ পায়ে হাঁটতে পারেন না, কোথাও দীর্ঘক্ষণ বসে থাকাও তাঁর পক্ষে অসম্ভব, তবুও যদি একটি টিকিট তাঁর ভাগ্যে জোটে...।
কথা শেষ করে রজনী ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ান। আমাদের একটু অপেক্ষা করার অনুরোধ জানিয়ে তিনি টেনে টেনে ঘরের ভেতরের দিকে চলে যান। কিছুক্ষণ পর ২০০৩ সালের সাফ টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় হওয়ার সেই গৌরবময় পুরস্কারটি হাতে নিয়ে তিনি বারান্দায় ফিরে আসেন। পুরস্কারটির গায়ে জমে থাকা দীর্ঘদিনের ধুলোবালি তিনি একটি সাধারণ গামছা দিয়ে পরম যত্নে মুছে ফেলেন। রোদেলা দুপুরের আলোয় চকচক করে ওঠা বেশ ভারী ও ওজনদার সেই ট্রফিটি তিনি দুই হাত উঁচুতে তুলে ধরেন। জীবনের কঠিন সংগ্রামের কাছে ক্লান্ত হয়ে পড়া রজনীকান্ত বর্মনের মুখে এই সাফল্যের স্মারকটি দেখার পর ক্ষণিকের জন্য হলেও এক অপূর্ব গর্বের হাসি খেলে যায়।
রজনীর এই বিবর্ণ ও কষ্টের জীবনযাত্রার বাস্তব রূপ দেখে তাঁর বাড়ি থেকে বিদায় নেওয়ার সময় স্থানীয় প্রতিবেশীদের একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুরোধ কানে এসে পৌঁছায়। তারা বলে যে তাঁদের বাড়ির সামনের এই ভাঙাচোরা রাস্তাটি নিয়েও যেন কিছু লেখা হয়। সামান্য বৃষ্টি হলেই সুস্থ ও সবল মানুষের পক্ষেও এই পথে হাঁটা অসম্ভব হয়ে পড়ে, আর যদি কোনো জরুরি পরিস্থিতি তৈরি হয় তবে দাদার মতো পঙ্গু মানুষের ঠিক কী ধরনের শোচনীয় অবস্থা দাঁড়ায়, তা যেন একটু যাচাই করে দেখা হয়। কালিয়াকৈরের পিঙ্গাবহ গ্রামের সেই বাড়িটি থেকে ঢাকার পথে রওনা হওয়ার সময় রজনীকান্ত বর্মনকে নিয়ে মন বারবার একটি কথাই প্রতিধ্বনিত হতে থাকে—আহা রে জীবন!
সূত্র: আজকের পত্রিকা