
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
চার বছর বিরতির পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উইচিতা শহরের আকাশে অনুষ্ঠিত হলো সামরিক যুদ্ধবিমানের এক নজরকাড়া এয়ার শো। এই মহড়াটি দেখে দর্শকদের মনে হতে পারে যেন খোলা নীল আকাশে কোনো পাখির মেলা বসেছে অথবা যুদ্ধবিমানের বিশাল এক হাট জমে উঠেছে। সুশৃঙ্খলভাবে সারিবদ্ধ করে রাখা দুর্দান্ত সব বিমান মুহূর্তের মধ্যে গর্জনে ফেটে পড়ে শূন্যে ডানা মেলে এবং চোখের পলকে আবার রানওয়েতে নেমে আসে।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যানসাস অঙ্গরাজ্যের উইচিতা শহরের ম্যাককনেল বিমানঘাঁটিতে দুই দিনব্যাপী আয়োজিত ‘ফ্রন্টিয়ার্স ইন ফ্লাইট এয়ার শো’ ঘিরে সাধারণ মানুষের ব্যাপক উৎসাহ ও উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। স্থানীয় ক্যানসাস ছাড়াও ডালাস এবং ওকলাহোমার মতো দূরদূরান্তের বিভিন্ন শহর থেকে হাজার হাজার উৎসুক দর্শক এই বর্ণিল আয়োজন উপভোগ করতে ছুটে আসেন। গত শনিবার এই এয়ার শোটির উদ্বোধনী দিনটি অত্যন্ত সফল ও জমজমাটভাবে সম্পন্ন হয়।
আয়োজনস্থলে পৌঁছাতে তীব্র যানজট এবং পার্কিংয়ের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হলেও থান্ডারবার্ডসের অসাধারণ নৈপুণ্য দর্শকদের সব ক্লান্তি ও বিরক্তি নিমিষেই ভুলিয়ে দেয়। এই বিমানঘাঁটিতে প্রবেশ করার জন্য দর্শকদের সকাল ৯টায় উপস্থিত হতে হয়েছিল এবং মূল আকর্ষণীয় পর্বটি বেলা ১টা ৩০ মিনিটে শুরু হয়ে বিকেল ৪টা ৩০ মিনিটে সমাপ্ত হয়।
কানে শব্দপ্রতিরোধী কোনো সরঞ্জাম ব্যবহার না করে কেবল কানে আঙুল গুঁজে এভাবেই এয়ার শো উপভোগ করতে হয় বলে জানান মারিয়া-মন্জু নামের এক দম্পতি। স্প্যানিশ বংশোদ্ভূত মারিয়া তাঁর নব্বই বছর বয়সি বয়োবৃদ্ধ মা-বাবাকে সঙ্গে নিয়ে ম্যাককনেল বিমানঘাঁটিতে সশরীরে এই মহড়া দেখতে এসেছিলেন।
এই প্রদর্শনীতে একটি বিশেষ দৃশ্য সবার নজর কাড়ে, যা হলো বিভিন্ন স্টলের মাঝে চীনের তৈরি মার্কিন সামরিক বিমানের ক্ষুদ্র খেলনার উপস্থিতি। এসব ব্যতিক্রমী স্টলে লকহিড এফ-১১৭ স্টেলথ ফাইটার জেট এবং বি-২ স্পিরিট স্টেলথ বম্বারসহ আরও বেশ কিছু সামরিক যুদ্ধবিমানের ছোট ছোট রেপ্লিকা বা খেলনা সুন্দরভাবে সাজিয়ে রাখা হয়েছিল।
চলতি বছরের এয়ার শোতে মূল আকর্ষণ থান্ডারবার্ডস হলেও আরেকটি ঐতিহাসিক ও কিংবদন্তি বিমান দর্শকদের মনে গভীর দাগ কেটেছিল, যার নাম কেসি-১৩৫ স্ট্রাটোট্যাঙ্কার। ১৯৭১ সাল থেকে ম্যাককনেল ঘাঁটিতে নিয়মিত সেবা দিয়ে আসা এই বিমানটি তার আধুনিক উত্তরসূরি কেসি-৪৬ পেগাসাসের সঙ্গে একই আকাশে একসঙ্গে উড়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দেয়।
উপস্থিত দর্শকদের উদ্দেশ্যে আয়োজিত উন্মুক্ত প্রশ্নোত্তরে কেসি-১৩৫ বিমানটির পাইলট ক্যাপ্টেন অ্যালভিন স্যান্ডার্স জানান, যে বিশেষ লক্ষ্য সামনে রেখে এই বিমানটি তৈরি করা হয়েছিল, তা সফলভাবে বাস্তবায়নে এর পেছনে যে ইঞ্জিনিয়ারিং বা প্রকৌশলগত দক্ষতা খাটানো হয়েছে, তা তাঁর দেখা অন্য যেকোনো সাধারণ বিমানের তুলনায় সম্পূর্ণ আলাদা।
ক্যাপ্টেন স্যান্ডার্স আরও উল্লেখ করেন যে, বোয়িং কোম্পানির তৈরি এই বিমানটি পরিচালনা করার অনুভূতিটি অনেকটা কোনো ক্ল্যাসিক পুরনো গাড়ি ড্রাইভ করার মতো। এতে আধুনিক প্রযুক্তির পাশাপাশি রয়েছে অ্যানালগ কন্ট্রোল ব্যবস্থা, ক্যাবল, পুলি এবং তারের ব্যবহার, যা একে সম্পূর্ণ যান্ত্রিক ও বাস্তবধর্মী করে তুলেছে।
বিমানের অনুভূতির প্রশংসা করে স্যান্ডার্স জানান যে এর ভেতরের অভিজ্ঞতা অত্যন্ত চমৎকার, যদিও এটি চালানো খুব সহজ নয়, কিন্তু যখন পাইলট সফলভাবে তা নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন, তখন সেটি এক পরম তৃপ্তিদায়ক অভিজ্ঞতার জন্ম দেয়।
ঐতিহাসিক স্ট্র্যাটোট্যাঙ্কার বিমানটিকে শেষবারের মতো স্বচক্ষে দেখার জন্য উৎসুক জনতা দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করেন। বিমানটি ম্যাককনেল ঘাঁটি ছেড়ে চলে গেলেও বিমানবাহিনী থেকে বিদায় নিচ্ছে না।
উল্লেখ্য যে, স্ট্রাটোট্যাঙ্কার বিমানটি সর্বপ্রথম ১৯৫৭ সালে সামরিক পরিষেবায় যুক্ত করা হয়েছিল এবং এটি বিশেষভাবে বি-৫২ বোমারু বিমানের জ্বালানি সরবরাহের জন্য ডিজাইন করা হয়েছিল। এত দীর্ঘ সময় পেরিয়ে অত্যন্ত পুরোনো হওয়া সত্ত্বেও বিমানটি যে আজও আমাদের সবচেয়ে অত্যাধুনিক ও আধুনিক সামরিক অভিযানগুলো সফলভাবে সম্পন্ন করছে, তার পেছনে রয়েছে এর অনন্য ও নিখুঁত নকশা। গত রোববার এই জমকালো এয়ার শো আনুষ্ঠানিকভাবে সমাপ্ত হয়।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।