
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
ভারতের রাজধানী দিল্লিতে নির্বাচন কমিশনের প্রধানের অপসারণের দাবিতে আয়োজিত প্রতিবাদ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। প্রতিবাদ ঠেকাতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে এলাকাটিতে শত শত ব্যারিকেড বসানো হয়েছে এবং ধরপাকড় করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে বেশ কিছু রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, শিক্ষার্থী, আন্দোলনের আয়োজক ও গণমাধ্যমকর্মী আটক হয়েছেন।
পূর্বে ঐতিহাসিক যন্তর মন্তর এলাকাটি প্রতিবাদের নির্ধারিত স্থান হিসেবে ব্যবহৃত হলেও, গত মাসের পুলিশি অভিযานের পর কর্তৃপক্ষ এটিকে তালিকা থেকে বাদ দিয়েছে। এই নিষেধাজ্ঞার কারণে এবারের বিশাল জমায়েতটি রামলীলা ময়দানকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হচ্ছে, যা রাজধানীতে রাজনৈতিক উত্তাপ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
চলমান এই আন্দোলনের মূল সূত্রপাত ঘটেছে গত বছরের শুরুতে চালু হওয়া বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা সংক্ষেপে এসআইআর কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে। ভারতীয় গণমাধ্যম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের গত সেপ্টেম্বর মাসের এক প্রকাশনা থেকে জানা যায়, ভোটার তালিকা হালনাগাদ, নিবন্ধন কৌশল এবং ডিজিটাল অবকাঠামো নিয়ে কমিশনের দুই শীর্ষ উপপ্রধান ভেতর থেকেই নিজেদের অসন্তোষ ও শঙ্কার কথা প্রকাশ করেছিলেন।
বিতর্কিত এই সংশোধন কৌশলের মাধ্যমে ভোটার তালিকা থেকে প্রায় তেরো কোটি মানুষের নাম বাতিল করা হয়েছে। এর মধ্যে দুই কোটি আশি লাখ মৃত ব্যক্তি, ছয় কোটি ত্রিশ লাখ ভিন্ন স্থানে চলে যাওয়া নাগরিক এবং তিন কোটি ভোটারকে কোনোভাবেই খুঁজে পাওয়া যায়নি বলে সরকারি হিসাব বা তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর জোরালো অভিযোগ হলো, এই প্রক্রিয়ার কারণে মুসলমানসহ অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভোটাররা সবচেয়ে বেশি মাত্রায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। তাদের গভীর আশঙ্কা, এই কৌশলের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপি নির্বাচনী মাঠে বাড়তি সুবিধা অর্জন করতে পারে।
অন্যদিকে নির্বাচন কমিশন তাদের অবস্থান ব্যাখ্যা করে জানিয়েছে যে, মৃত ও ঠিকানা পরিবর্তনকারী ব্যক্তিদের নাম বাদ দিয়ে তালিকা নির্ভুল করাই ছিল এই পুরো উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। ক্ষমতাসীন দল বিজেপিও কমিশনের পক্ষে জোরালো অবস্থান নিয়ে বিরোধীদের আনীত সমস্ত অভিযোগকে ভিত্তিহীন রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা বলে উড়িয়ে দিয়েছে।
এর ধারাবাহিকতায় গত মাসের একত্রিশ তারিখে দেশের বিরোধী জোট প্রতীকী পন্থায় প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে জনগণের কাঠগড়ায় অভিশংসন কর্মসূচি সম্পন্ন করে। ওই বিশেষ আয়োজনে শীর্ষ এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট ছয়টি গুরুতর অভিযোগ জাতির সামনে উপস্থাপন করা হয়।
কংগ্রেস দলের প্রভাবশালী নেতা রাহুল গান্ধী তাঁর নিজস্ব এক্স অ্যাকাউন্টে এক বার্তা প্রকাশ করে আন্দোলনকারীদের পুলিশি বলপ্রয়োগ ও লাঠিচার্জ নিয়ে আতঙ্কিত না হওয়ার সাহস জোগান। ঠিক বিপরীত অবস্থানে দাঁড়িয়ে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জেপি নাড্ডা এই গণজমায়েতকে দেশের বর্তমান সরকারকে অস্থিতিশীল করার লক্ষ্যে কোনো এক বিদেশি শক্তির ইন্ধনে সাজানো পূর্বপরিকল্পিত নাটক হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ গত বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে জানিয়েছে যে, ভোটার তালিকা পরিমার্জন নিয়ে উদ্ভূত নানা প্রশ্ন আসন্ন দিনগুলোর ভোটগ্রহণের নিরপেক্ষতাকে চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
সংস্থাটির এশিয়া অঞ্চলের দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিচালক ইলেইন পিয়ারসন স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন যে, দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ভোটাধিকার এবং মৌলিক সরকারি সেবা পাওয়ার আইনি অধিকার ক্ষুণ্ন করে এমন যেকোনো তালিকা সংশোধন কার্যক্রম অবিলম্বে স্থগিত করা উচিত।
সূত্র: আজকের পত্রিকা