
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
শ্রমিকদের পক্ষ থেকে মাসিক সর্বনিম্ন বেতন ত্রিশ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবি জানানো হয়েছে। এই দাবিকে কেন্দ্র করে তীব্র সহিংসতা ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। এমন জটিল ও থমথমে অবস্থার সৃষ্টি হলে তা নিরসনে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী এবং গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারকদের নিয়ে এই জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়। রোববার সন্ধ্যায় সরকারি সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের মূল সভাকক্ষে এই বৈঠক বসে।
দিনের শুরুতেই রাজধানী ঢাকা এবং আশপাশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে ব্যাপক অস্থিরতা দেখা দেয়। সকালের দিকে মিরপুর এলাকা, গাজীপুরের কালিয়াকৈর, সাভার ও আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলের সড়কগুলোতে বিক্ষোভ শুরু হয়। আন্দোলনরত শ্রমিকেরা রাস্তা আটকে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেন এবং কয়েকটি যানবাহনে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটান। সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিবেচনায় এনে ওই অঞ্চলের প্রায় তিনশ কারখানায় সেদিন ছুটি ঘোষণা করতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ।
নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, এই নাশকতামূলক ও সহিংস কর্মকাণ্ডের পেছনে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র রয়েছে। ঢাকা ও গাজীপুরের শ্রমিক আন্দোলনে নিষিদ্ধ ঘোষিত দল আওয়ামী লীগ এবং এর সহযোগী সংগঠনের কর্মীরা গোপনে প্রবেশ করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছে। এর মধ্যে গাজীপুরের কালিয়াকৈরে একটি বিক্ষোভ মিছিলে সরাসরি নেতৃত্ব দেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সাজমুল ইসলাম। সেই মিছিলে অংশগ্রহণের ছবি ইন্টারনেট ও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অভিযান চালায়। ওই এলাকা থেকে আওয়ামী লীগ, শ্রমিক লীগ ও ছাত্রলীগের মোট নয়জনকে আটক করা হয়। একই সঙ্গে রাজধানীর মিরপুর এলাকা থেকে সংশ্লিষ্ট দল ও সংগঠনের আরও এগারোজন কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
বেতন বৃদ্ধির দাবিতে গাজীপুরের বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকেরা সকাল নয়টার দিকে রাস্তায় নেমে আসেন এবং সড়ক অবরোধ করেন। এই অবরোধের জেরে দীর্ঘ প্রায় ছয় ঘণ্টা ওই এলাকায় যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ থাকে। পরবর্তীতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এলে দুপুর তিনটার দিকে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে যানবাহন চলাচল আবার শুরু হতে পারে।
একই রকম দাবিতে রাজধানীর মিরপুর অঞ্চলেও কর্মীরা রাস্তায় অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। সকাল এগারোটা থেকে দুপুর একটা পর্যন্ত সেখানে পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের তীব্র সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া চলে। উত্তাল পরিস্থিতির এক পর্যায়ে মিরপুর এগারো নম্বর মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। এই সহিংসতার সরাসরি প্রভাব পড়ে যোগাযোগ ব্যবস্থার ওপর। এর জেরে মিরপুর দশ, মিরপুর এগারো ও পল্লবী মেট্রোরেল স্টেশন দুপুর বারোটা থেকে আড়াইটা পর্যন্ত সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়।
উদ্ভূত এই সংকটময় পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রিপরিষদের সদস্য ও শীর্ষ উপদেষ্টাদের জরুরি তলব করেন প্রধানমন্ত্রী। বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম এবং প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন অংশ নেন। বৈঠকে আরও উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের প্রধান সমন্বয়ক শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস।
এর আগে দুপুরের দিকে শ্রমমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যান। সেই বৈঠকে পোশাকশিল্পের চলমান অস্থিরতা এবং সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। বর্তমান শ্রমিক আন্দোলনের কারণে শ্রমমন্ত্রী তার পূর্বনির্ধারিত সংযুক্ত আরব আমিরাত সফর বাতিল করেন।
পরিস্থিতি শান্ত করার লক্ষে রোববার সকালে সচিবালয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেন শ্রমমন্ত্রী। সেখানে তিনি পোশাক খাতের শ্রমিকদের সর্বনিম্ন মজুরি নির্ধারণের জন্য দ্রুত একটি নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন।
সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী উল্লেখ করেন যে, সরকার ইতিপূর্বে গণমাধ্যমকর্মী, শ্রমিক প্রতিনিধি ও কারখানা মালিকদের সঙ্গে আলোচনা করে এই দিনেই মজুরি বোর্ড গঠনের বিষয়টি নিশ্চিত করেছিল। এত কিছুর পরেও শ্রমিকদের রাজপথে অবস্থান করায় সাধারণ মানুষের মারাত্মক দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। তাই মন্ত্রী সে সময় সব আন্দোলনকারী শ্রমিককে বিশৃঙ্খলা ছেড়ে নিজ নিজ কর্মস্থলে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানান।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।