
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
চলতি বছরের উচ্চ মাধ্যমিক সার্টিফিকেট বা এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলে দুই দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সবচেয়ে কম শিক্ষার্থী পাস করেছেন। দেশের নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের প্রতিটিতেই পাসের হার নিম্নমুখী হয়েছে, আর এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে হ্রাস পেয়েছে সর্বোচ্চ গ্রেড তথা জিপিএ-৫ অর্عকারী শিক্ষার্থীর সংখ্যাও। এমন একটি সামগ্রিক বিপর্যয়কর ফলাফলের বিপরীত চিত্র দেখা গেছে একটি নির্দিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। দেশের দক্ষিণপূর্বাঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ অঞ্চল নিয়ে গঠিত কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডে সবমিলিয়ে ১ হাজার ৩১৩ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ অর্জন করেছেন। অন্যদিকে, কেবল রাজধানী ঢাকার একটিমাত্র উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকেই ১ হাজার ৩১১ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ লাভ করেছেন। তুলনামূলক পরিসংখ্যান বলছে, পুরো একটি শিক্ষা বোর্ডের সঙ্গে টেক্কা দিয়ে মাত্র দুই জন শিক্ষার্থী কম জিপিএ-৫ পেয়েছে ঢাকার এই কলেজটি।
অত্যন্ত তাক লাগানো এই কৃতিত্ব অর্জন করেছে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকায় অবস্থিত ড. মাহবুবুর রহমান মোল্লা কলেজ। ঐতিহ্যবাহী এই প্রতিষ্ঠানটি থেকে এবার এইচএসসি পরীক্ষায় মোট ৩ হাজার ১৫৬ জন পরীক্ষার্থী অংশ নেওয়ার জন্য নিবন্ধিত হয়েছিলেন। তবে পরীক্ষা চলাকালীন অসুস্থতা কিংবা নানাবিধ অনিবার্য কারণে চারজন পরীক্ষার্থী সব বিষয়ের পরীক্ষায় উপস্থিত থাকতে পারেননি। এই অনুপস্থিত চারজনকে বাদ দিয়ে প্রস্তুত করা ফলাফলের হিসাব অনুযায়ী, কলেজটির সার্বিক পাসের হার দাঁড়িয়েছে চোখ কপালে তোলার মতো ৯৯ দশমিক ৮৭ শতাংশে। শুধু তা-ই নয়, পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের মধ্যে অবলীলায় জিপিএ-৫ অর্জন করেছেন ৪২ শতাংশ শিক্ষার্থী, যা দেশের বর্তমান শিক্ষাবর্ষের প্রেক্ষাপটে একটি বিরল রেকর্ড।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির এমন ঈর্ষণীয় ও গৌরবোজ্জ্বল সাফল্যে স্বাভাবিকভাবেই আবেগাপ্লুত ও আনন্দিত শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকরা। ছুটির দিন বা রোববার সরেজমিন কলেজ প্রাঙ্গণে গিয়ে দেখা মিলেছে এক বর্ণিল উৎসবমুখর পরিবেশের। পুরো ক্যাম্পাস জুড়ে বিরাজ করছে আনন্দ ও উল্লাসের আমেজ। চমৎকার এই ফলাফল উদযাপন করতে শিক্ষার্থীরা কেউ সহপাঠীদের সঙ্গে স্মৃতি ধরে রাখতে লেন্সবন্দী হচ্ছেন, আবার কেউবা মা-বাবাকে সঙ্গে নিয়ে প্রিয় শিক্ষকদের কৃতজ্ঞতা জানাতে ভিড় করেছেন। অনেকেই ভবিষ্যতের উচ্চশিক্ষার সিঁড়ি বেয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার আগাম প্রস্তুতিও শুরু করে দিয়েছেন। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের ভাষ্য অনুযায়ী, অভাবনীয় এই সাফল্য হুট করে আসেনি, বরং এটি সকলের সম্মিলিত ও কঠোর পরিশ্রমের ফসল।
প্রশংসনীয় এই ফলাফলের নেপথ্যের মূল রহস্য হিসেবে নিয়মিত পড়ালেখার অভ্যাস, কঠোর নিয়মানুবর্তিতা এবং শিক্ষকদের নিঃস্বার্থ সহযোগিতার কথা অকপটে স্বীকার করেছেন কৃতি শিক্ষার্থীরা। এই আনন্দঘন মুহূর্তে কলেজ ক্যাম্পাসে সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা হয় মানবিক শাখা থেকে জিপিএ-৫ প্রাপ্ত মেধাবী শিক্ষার্থী নাবিলা বিনতে দস্তগীরের। তিনি তার এই কাঙ্ক্ষিত সাফল্যের পুরো কৃতিত্বই অর্পণ করেছেন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের পরম যত্নের প্রতি।
নিজের সাফল্য অর্জনের পেছনের গল্প বলতে গিয়ে নাবিলা জানান, ক্লাসের পড়া ক্লাসেই শতভাগ বুঝিয়ে দিতেন তাদের শিক্ষকেরা। ফলে বাসায় ফিরে পুনরায় সেই জটিল বিষয়গুলো নিয়ে নতুন করে মাথা ঘামাতে বা বাড়তি কষ্ট করতে হতো না। কেবল পড়াশোনা নয়, বরং প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মকানুন ও শৃঙ্খলা মেনে চলার ক্ষেত্রেও কলেজ কর্তপক্ষের ভীষণ কড়া নজরদারি ও কঠোরতা রয়েছে। এই সামগ্রিক পরিবেশই তাদের মতো সাধারণ শিক্ষার্থীদের ভালো ফলাফল উপহার দিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে।
কনিষ্ট ও নতুন শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে কিছু পরামর্শ দিয়ে নাবিলা বলেন, কেবল পাতার পর পাতা মুখস্থ করে বা অতিরিক্ত সময় বই নিয়ে বসে থাকলেই ভালো ফলাফল নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। যতটুকু সময় পড়ালেখা করা হবে, তা যেন শতভাগ মনোযোগ ও একাগ্রতার সঙ্গে করা হয়। পড়ার টেবিলে বসতে একদমই ইচ্ছা না করলে জোর না করে বরং মনের টানে পছন্দের অন্য কোনো সৃজনশীল কাজ করা যেতে পারে। বিরক্তিকর মানসিকতা নিয়ে পড়াশোনা করলে বিষণ্ণতা তৈরি হয় এবং ধীরে ধীরে পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ পুরোপুরি হারিয়ে যায়। তাই কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পেতে হলে মনের ভেতর পড়াশোনার স্পৃহা ও মনোযোগ ধরে রাখা অত্যন্ত জরুরি।
বিজ্ঞান বিভাগ থেকে গোল্ডেন জিপিএসহ সর্বোচ্চ সাফল্য অর্জন করেছেন আরিফুল ইসলাম নামের আরেক শিক্ষার্থী। তিনিও তার এই অভাবনীয় সাফল্যের পেছনে শিক্ষকদের ঐকান্তিক অবদানের কথা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। তিনি মন্তব্য করেন, পরীক্ষার্থীরা যাতে শেষ পর্যন্ত লড়াই করে সেরা ফলাফল অর্জন করতে পারে, সেজন্য শিক্ষকেরা আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। কোনো একটি কঠিন বিষয় বুঝতে ছাত্র-ছাত্রীদের সমস্যা হলে শিক্ষকেরা বারবার ধৈর্য ধরে তা বুঝিয়ে দেওয়ার মানসিকতা রাখতেন। এত বিশাল সংখ্যক শিক্ষার্থীর জিপিএ-৫ অর্জনের নেপথ্যে শিক্ষকদের এই আন্তরিকতা ও নাছোড়বান্দা মনোভাবই প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে।
কলেজ কর্তৃপক্ষের সরবরাহ করা বিস্তারিত ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই সাফল্যের বড় অংশ এসেছে বিজ্ঞান বিভাগ থেকেই। প্রতিষ্ঠানটির বিজ্ঞান শাখা থেকে এবার জিপিএ-৫ পেয়েছেন ১ হাজার ৯৯ জন শিক্ষার্থী। এছাড়া ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগ থেকে ১২৮ জন এবং মানবিক বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ অর্জন করেছেন ৮৪ জন শিক্ষার্থী।
রাজধানীর যাত্রাবাড়ী ও সংলগ্ন ডেমরা এলাকার সাধারণ খেটে খাওয়া এবং মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানরাই সাধারণত ড. মাহবুবুর রহমান মোল্লা কলেজে পড়াশোনা করে থাকে। এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটিতে কেবল গতানুগতিক পুঁথিগত বিদ্যা বিতরণের ওপর জোর দেওয়া হয় না, বরং উন্নত নৈতিকতা চর্চা ও একটি সুশৃঙ্খল পরিবেশ বজায় রেখে প্রকৃত আদর্শ মানুষ এবং সুযোগ্য নাগরিক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটির দীর্ঘদিনের সুখ্যাতি রয়েছে। সূচনালগ্নে সাকুল্যে মাত্র ২৬১ জন শিক্ষার্থী নিয়ে শিক্ষা কার্যক্রমের যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা আজ মহীরূহের রূপ ধারণ করে একটি বৃহৎ ও স্বনামধন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে এটি ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের অন্যতম শীর্ষ ফল অর্জনকারী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছে।
প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ মোহাম্মদ ওবায়দুল্লাহ নয়ন মনে করেন, এই অসামান্য সাফল্য কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা বা হুট করে এক দিনের একক প্রচেষ্টার ফসল নয়। পুরো শিক্ষাবর্ষ জুড়ে প্রতিদিনের অসংখ্য ছোট ছোট পরিকল্পনা এবং সেগুলোর নিখুঁত বাস্তবায়নের সম্মিলিত রূপ হলো এই অর্জন।
প্রতিষ্ঠার পেছনের কারিগর ও বর্তমান চেয়ারম্যান মাহবুবুর রহমান মোল্লা গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, সারা দেশের সামগ্রিক এইচএসসি পরীক্ষার চিত্র যখন শোচনীয় এবং হতাশাজনক, ঠিক সেই দুঃসময়ে দাঁড়িয়ে তাদের এই নজরকাড়া সাফল্য ভবিষ্যতের দিনগুলোতে আরও ভালো করার ক্ষেত্রে অফুরন্ত অনুপ্রেরণা জোগাবে। তিনি তার ভবিষ্যৎ স্বপ্নের কথা জানিয়ে বলেন, এই কলেজটিকে তারা এমন একটি আদর্শ বিদ্যাপীঠ হিসেবে গড়ে তুলতে চান, যেখানে প্রাতিষ্ঠানিক মানসম্মত শিক্ষার পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা প্রতিটি পদক্ষেপে প্রকৃত ভালো মানুষ হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।