
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর কৃষি বিভাগের প্রকাশিত সাম্প্রতিক ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনে দেশের কৃষিখাতের একটি সামগ্রিক তুলনামূলক চিত্র উঠে এসেছে। ২০২৪-২৫ এবং ২০২৫-২৬ এই দুটি অর্থবছরের ফসলের আবাদ ও উৎপাদনের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে যে প্রধান কয়েকটি কৃষিপণ্যের উৎপাদনে বেশ বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে।
আলোচ্য সময়ে দেশের বাজারে পেঁয়াজের উৎপাদন উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে। নির্দিষ্ট হিসাবে দেখা যায় যে বিগত অর্থবছরে মোট ৩২ লাখ ২১ হাজার টন পেঁয়াজ উৎপাদিত হয়েছিল, যা পরবর্তী অর্থবছরে বৃদ্ধি পেয়ে ৩৮ লাখ ২০ হাজার টনে উন্নীত হয়েছে। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে দেশে পেঁয়াজের উৎপাদন প্রায় ৫ লাখ ৯৯ হাজার টন বা শতকরা হিসেবে প্রায় ১৮ দশমিক ৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
শুধু উৎপাদন নয়, একই সময়ে মসলা জাতীয় এই গুরুত্বপূর্ণ ফসলটির চাষের আওতাধীন জমির পরিমাণও বেশ কিছুটা সম্প্রসারিত হয়েছে। আগের অর্থবছরে ৫ লাখ ৩৫ হাজার ৫৯৯ একর জমিতে পেঁয়াজ চাষ করা হলেও পরের অর্থবছরে তা বেড়ে ৫ লাখ ৬৯ হাজার ৭৮৭ একরে গিয়ে ঠেকেছে। দেশে পেঁয়াজের বাম্পার ফলন ও পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকায় চলতি অর্থবছরে কোনো প্রকার বিদেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানি করতে হয়নি বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ।
পেঁয়াজের পাশাপাশি রসুন ও শীতকালীন মরিচের বাম্পার ফলনও কৃষকদের মুখে হাসি ফুটিয়েছে। পূর্ববর্তী অর্থবছরে যেখানে ৫ লাখ ৬৫ হাজার ৬৮২ টন রসুনের ফলন পাওয়া গিয়েছিল, পরবর্তীতে তা বেড়ে ৬ লাখ ৫ হাজার ৪৪৬ টনে পৌঁছেছে। ঠিক একইভাবে শীতকালীন মরিচের উৎপাদনও ৫ লাখ ৬১ হাজার ৩৯৭ টন থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ৬ লাখ ১৬ হাজার ৩৪০ টনে দাঁড়িয়েছে।
তবে প্রধান খাদ্যপণ্যগুলোর মধ্যে একমাত্র আলুর উৎপাদনে সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং হতাশাজনক চিত্র লক্ষ্য করা গেছে। বিগত অর্থবছরে দেশে মোট ১ কোটি ১৫ লাখ ৭৩ হাজার টন আলু উৎপাদিত হয়েছিল, যা পরবর্তী সময়ে কমে ১ কোটি ১২ লাখ ৭২ হাজার টনে নেমে এসেছে। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে কেবল আলুর উৎপাদনই ৩ লাখ ১ হাজার টন হ্রাস পেয়েছে এবং এর সাথে সাথে আলুর চাষের জমিও সংকুচিত হয়েছে।
ধানের বাজারে আমন ধানের উৎপাদনে অত্যন্ত ইতিবাচক ও স্বস্তিদায়ক প্রবৃদ্ধি পরিলক্ষিত হয়েছে। আগের অর্থবছরে ১ কোটি ৬৫ লাখ ১৪ হাজার টন আমন ধান ঘরে তোলা হলেও আলোচ্য অর্থবছরে তা বেড়ে ১ কোটি ৭৩ লাখ ৫৯ হাজার টনে উন্নীত হয়েছে। এক বছরে আমন উৎপাদন ৮ লাখ ৪৫ হাজার টন বাড়ার পেছনে অনুকূল আবহাওয়া ও প্রকৃতি বড় ধরনের সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এদিকে গমের উৎপাদন কিছুটা নিম্নমুখী ধারায় রয়েছে যা পরিসংখ্যানের পাতায় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। আগের বছরগুলোতে যেখানে ১০ লাখ ৪১ হাজার টন গম উৎপাদিত হতো, পরবর্তীতে তা কমে ১০ লাখ ২৮ হাজার টনে এসে ঠেকেছে। এর ফলে এক বছরের ব্যবধানে গম উৎপাদন ১৩ হাজার টন বা প্রায় ১ দশমিক ২ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে এবং সমান্তরালভাবে গমের আবাদি জমিও হ্রাস পেয়েছে।
অন্যান্য দানাদার ও তেলজাতীয় ফসলের মধ্যে শীতকালীন ভুট্টার ফলন ইতিবাচকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। পূর্ববর্তী অর্থবছরে ৪৮ লাখ ৭৩ হাজার টন ভুট্টা উৎপাদিত হলেও সর্বশেষ তথ্যে তা ৫০ লাখ ৪৮ হাজার টনে উন্নীত হয়েছে। এছাড়াও সয়াবিনের উৎপাদন ১ লাখ ৮ হাজার টন থেকে বেড়ে ১ লাখ ৩৬ হাজার টনে উন্নীত হওয়ায় তেলবীজ উৎপাদনেও গতি এসেছে।
কৃষি অর্থনীতিবিদদের মতে, কৃষিপণ্যের এই সার্বিক উৎপাদন হ্রাস ও বৃদ্ধির পেছনে মূলত বাজারমূল্য এবং অর্থনৈতিক প্রাপ্তি সবচেয়ে বড় নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। বিশেষ করে পেঁয়াজ ও আলুর ক্ষেত্রে এই দামের প্রভাব সবচেয়ে বেশি মাত্রায় দৃশ্যমান হয়েছে বলে তারা তাদের বিশ্লেষণে উল্লেখ করেছেন।
বিশিষ্ট কৃষি অর্থনীতিবিদ জাহাঙ্গীর আলম খান সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে কৃষকেরা পূর্ববর্তী মৌসুমে পেঁয়াজের বেশ ভালো ও লাভজনক বাজারদর পেয়েছিলেন। ফলশ্রুতিতে তারা পরবর্তী মৌসুমে অধিক পরিমাণে পেঁয়াজ আবাদে উদ্বুদ্ধ হয়েছেন এবং পাশাপাশি হিমাগারগুলোতে সংরক্ষণের উন্নত ব্যবস্থাপনাও উৎপাদন বাড়াতে সাহায্য করেছে।
আলুর ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ বিপরীত পরিস্থিতি বিরাজ করার কারণে চাষিরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলে মনে করেন ওই কৃষি অর্থনীতিবিদ। তাঁর মতে, গত দুই বছর ধরে কৃষকেরা উৎপাদিত আলুর কোনো প্রকার ন্যায্য দাম পাননি এবং কোল্ড স্টোরেজে ফসল সংরক্ষণ করেও তাদের বড় অঙ্কের আর্থিক লোকসানের মুখে পড়তে হয়েছে। লোকসানের এই ধারাবাহিকতার কারণেই চাষিরা সচেতনভাবে আলুর চাষের পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছেন।
ফসল উৎপাদনের পাশাপাশি গ্রামীণ জনপদের কৃষিশ্রমিকদের দৈনিক মজুরির একটি বিস্তারিত চিত্রও প্রকাশ করেছে পরিসংখ্যান ব্যুরো। সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, গত মার্চ মাসে পুরুষ কৃষিশ্রমিকদের দৈনিক গড় মজুরি ছিল ৬২৮ টাকা এবং নারী শ্রমিকদের জন্য এই হার ছিল ৪৬১ টাকা।
পরবর্তী সময়ে জুন মাসে কাজের ধরনের সাথে মিল রেখে খাবারের বন্দোবস্তে মজুরির তারতম্য লক্ষ্য করা গেছে। এক বেলা খাবারসহ জুন মাসে পুরুষ শ্রমিকরা ৬২২ টাকা এবং নারীরা ৪৩৭ টাকা দৈনিক মজুরি পেয়েছেন। দুই বেলা খাবার সংযুক্ত থাকলে পুরুষ শ্রমিকের মজুরি দাঁড়িয়েছে ৬৩৯ টাকায় এবং নারী শ্রমিকের মজুরি ছিল ৪৬০ টাকা।
তিন বেলা খাবার সরবরাহের শর্তে পুরুষ কৃষিশ্রমিকেরা সর্বোচ্চ দৈনিক ৬৬৪ টাকা এবং নারী শ্রমিকেরা ৫১৫ টাকা মজুরি লাভ করেছেন। দেশের প্রতিটি প্রশাসনিক উপজেলার নির্দিষ্ট নমুনা থেকে দশজন করে কৃষিশ্রমিকের সরাসরি সাক্ষাৎকার নিয়ে এই মজুরি সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।