
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
সংসার জীবনের নানা ব্যস্ততায় একসময়ে লেখাপড়া থমকে গেলেও দীর্ঘ চৌদ্দ বছর বাদে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় সর্বোচ্চ ফলাফল অর্জন করে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল উপজেলার এক নারী। গৃহবধূ রীতি খাতুন বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার পর পারিবারিক দায়িত্বের চাপে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থেকে দূরে সরে যান, কিন্তু তাঁর মনের গভীরে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার তীব্র বাসনা সবসময়ই প্রবহমান ছিল। শেষ পর্যন্ত জীবনসঙ্গীর প্রবল অনুপ্রেরণা ও সার্বিক সহযোগিতায় তিনি এই ঐতিহাসিক সাফল্য অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন।
ত্রিশ বছর বয়সী রীতি খাতুন জয়পুরহাট জেলার ক্ষেতলাল উপজেলার নসিরপুর গ্রামের বাসিন্দা আবদুল আলিম মণ্ডলের স্ত্রী। তিনি কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে পরিচালিত ক্ষেতলাল পাইলট বালিকা স্কুল অ্যান্ড কলেজের ব্যবসায় ব্যবস্থাপনা বা বিএম শাখা থেকে চলতি বছরের উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশ নিয়ে জিপিএ–৫ অর্জন করেছেন। তাঁর কোলজুড়ে বর্তমানে ১১ বছর বয়সি একটি কন্যাসন্তান রয়েছে, যাকে লালন-পালন করার পাশাপাশি তিনি এই কঠোর লড়াইয়ে জয়ী হয়েছেন।
পরিবার ও নিকটজনদের সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, রীতি খাতুন ২০১০ সালে মোলামগাড়িহাট দ্বিমুখী উচ্চবিদ্যালয় থেকে সাফল্যের সঙ্গে মাধ্যমিক বা এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। এর ঠিক পরের বছরেই তাঁর বিয়ে হয়ে যাওয়ার কারণে তাঁর শিক্ষাজীবনে মারাত্মক ছেদ পড়ে এবং উচ্চমাধ্যমিকের চৌকাঠ পর্যন্ত পৌঁছানো তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়ে ওঠেনি। তা সত্ত্বেও জ্ঞানের অন্বেষণ ও পড়াশোনার প্রতি তাঁর জন্মগত ও প্রবল আগ্রহ একটুও কমে যায়নি, যা তাঁকে পরবর্তীতে নতুন করে পড়াশোনা শুরু করার তীব্র তাগিদ জুগিয়েছিল।
স্বামীর কাছ থেকে পাওয়া অভূতপূর্ব উৎসাহ ও উদ্দীপনা নিয়ে রীতি খাতুন ২০২৪ সালে ক্ষেতলাল পাইলট বালিকা স্কুল অ্যান্ড কলেজে উচ্চমাধ্যমিকে ভর্তি হন। তবে প্রতিদিনের সংসারের নানা কাজকর্ম সামলে নিজ পড়াশোনা নিয়মিত চালিয়ে যাওয়া তাঁর জন্য মোটেও সহজ কাজ ছিল না এবং তাঁকে বহু কঠিন প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। এমনকি এই বয়সে এসে পুনরায় ছাত্রজীবন শুরু করায় সমাজের কিছু মানুষের উপহাস ও কটূ কথাও তাঁকে সহ্য করতে হয়েছে, যা তিনি ধৈর্য ও সাহসিকতার সঙ্গে মোকাবিলা করেছেন।
সব ধরনের সামাজিক বাধা ও প্রতিবন্ধকতাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তিনি নিজের লক্ষ্য অর্জনে অবিচল ছিলেন এবং এই পথচলায় স্বামী ও সন্তানের পাশাপাশি নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের কাছ থেকেও যথেষ্ট সাহায্য ও অনুপ্রেরণা পেয়েছেন বলে উল্লেখ করেন। নিজের এই অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি জানান যে, তাঁর স্বামীর পক্ষ থেকে যদি যথাযথ সহযোগিতা ও মানসিক শক্তি না পাওয়া যেত, তবে এই বয়সে এসে নতুন করে শিক্ষা জীবন শুরু করা তাঁর পক্ষে কখনোই বাস্তবসম্মত হতো না।
সংসারের অজস্র কাজের ফাঁকে ফাঁকে সময় বের করে তাঁকে বইয়ের পাতায় চোখ রাখতে হতো এবং তাঁর এই অসাধারণ সাফল্যের পেছনে শিক্ষকদের অসামান্য অবদান রয়েছে বলেও তিনি কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন। স্ত্রীর পড়াশোনার প্রতি প্রবল ঝোঁক ও আগ্রহ লক্ষ করেই তাঁকে পুনরায় কলেজে ভর্তি করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন বলে জানিয়েছেন রীতির স্বামী আবদুল আলিম মণ্ডল। তিনি আরও যোগ করেন যে, গৃহবধূর এই গৌরবোজ্জ্বল ফলাফলে তাঁদের পুরো পরিবারের প্রতিটি সদস্য অত্যন্ত আনন্দিত ও গর্বিত বোধ করছেন।
অন্যদিকে, ওই শিক্ষার্থীর সাফল্য সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে ক্ষেতলাল পাইলট বালিকা স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ সাইফুল ইসলাম গণমাধ্যমকে জানান যে, সংসারের গুরুদায়িত্ব সফলভাবে পালন করে রীতির এমন ঈর্ষণীয় ফলাফল অর্জন করা সত্যিই অত্যন্ত প্রশংসনীয় একটি ঘটনা। তাঁর এই সুদীর্ঘ অধ্যবসায় ও নাছোড়বান্দা মানসিকতা আগামী দিনে সমাজের অন্যান্য নারী ও শিক্ষার্থীদের জন্য একটি চিরন্তন অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে টিকে থাকবে বলে তিনি মনে করেন।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।