
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
বলিউড বাদশাহ শাহরুখ খানের দীর্ঘ তিন দশকের বেশি সময় ধরে চলা বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের পথচলা যেমন আলোর দ্যুতিতে উদ্ভাসিত, তেমনই এর অন্ধকার কোণে লুকিয়ে রয়েছে নানামুখী ব্যর্থতা ও ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ বিতর্কের নানা অধ্যায়। বিনোদন দুনিয়ায় কখনো তাঁর অভিনীত সিনেমা দর্শকদের মনের মনিকোঠায় পৌঁছাতে পারেনি, কখনো তাঁর ব্যক্তিগত আচরণ ও মন্তব্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে জনসমক্ষে, আবার কখনো পরিবারের কোনো সদস্যকে জড়িয়ে আইনি ঘটনা তাঁকে এনে দাঁড় করিয়েছে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।
নিজ মুখেই অভিনেতা স্বীকার করেছেন যে তাঁর অভিনয় জীবনের কিছু নির্দিষ্ট সময়ে তিনি দর্শকদের প্রকৃত চাহিদা বুঝতে মারাত্মক ভুল করেছিলেন। অতীতের সেসব তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে গভীর শিক্ষা নিয়ে তিনি অভিনব পন্থায় রুপালি পর্দায় প্রত্যাবর্তন করেছেন এবং আজ তাঁর শুভ জন্মলগ্নে এমন দশটি ভিন্নধর্মী অধ্যায় ঘুরে দেখা যাক, যা ব্যতিরেকে শাহরুখ খানের জীবন ও ক্যারিয়ারের সামগ্রিক গল্পটি চিরকালই অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।
বলিউডের বর্তমানের এই অতি জনপ্রিয় তারকাকেও তাঁর অভিনয়জীবনের একদম সূচনালগ্নে প্রথম অডিশনে চরম প্রত্যাখ্যাত হতে হয়েছিল। বিখ্যাত পরিচালক হেমা মালিনীর নির্দেশনায় ‘দিল আশনা হ্যায়’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের সুবাদে তিনি জীবনের প্রথম অডিশনটি মুখোমুখি হয়েছিলেন। কিন্তু সেই সময়ে তরুণ শাহরুখের অভিনয় কৌশল এবং বাহ্যিক চেহারা নিয়ে পরিচালক হেমা মালিনী প্রথম দফায় পুরোপুরি সন্তুষ্ট হতে পারেননি। পরবর্তীতে অডিশন দেওয়ার জন্য তিনি পুনরায় সুযোগ লাভ করেন এবং দ্বিতীয় দফার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় অবশেষে হেমা মালিনীর মন জয় করতে সক্ষম হন।
এর পূর্বে টেলিভিশন মাধ্যমের জনপ্রিয় ‘ফৌজি’ ধারাবাহিক নাটকে অভিনয় করে তিনি দর্শকদের মাঝে বেশ পরিচিতি অর্জন করেছিলেন বটে, তবে সেই সীমিত পরিচিতি যে রূপালি পর্দায় খুব সহজে একটি স্থায়ী আসন নিশ্চিত করবে, এমন কোনো কথা ছিল না। শাহরুখ খানের এই আত্মজীবনীর প্রাথমিক অভিজ্ঞতা বর্তমান প্রজন্মের শিল্পীদের বারবার এই কথাই স্মরণ করিয়ে দেয় যে, আজকের সুউচ্চ তারকাখ্যাতির পেছনের ভিত্তিপ্রস্তর হিসেবেও প্রত্যাখ্যানের বহু বেদনাদায়ক গল্প ও ইতিহাস জড়িয়ে রয়েছে।
শাহরুখ খানের চলচ্চিত্র জীবনের অন্যতম আলোচিত একটি বিষয় হলো তাঁর নিজ হাতে ফিরিয়ে দেওয়া বহু সিনেমা পরবর্তীকালে অন্য জনপ্রিয় অভিনেতাদের ক্যারিয়ারের সুবর্ণ স্মারক হিসেবে চিরস্থায়ী হয়ে থাকা। ঐতিহাসিক পটভূমির ছবি ‘লগান’-এর মূল চরিত্র ভুবনের ভূমিকায় অভিনয়ের জন্য প্রাথমিক পর্যায়ে পরিচালক ও নির্মাতারা একমাত্র শাহরুখের কথাটিই গভীরভাবে ভেবেছিলেন বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। যদিও পরবর্তীতে সেই ঐতিহাসিক চরিত্রটিতে রূপদান করে বিশ্বজয় করেছিলেন আমির খান এবং ছবিটি অস্কার আসরে সেরা বিদেশি ভাষার চলচ্চিত্র বিভাগে মনোনয়ন পেয়ে ইতিহাস গড়েছিল।
অত্যন্ত জনপ্রিয় কমেডি-ড্রামা ‘মুন্নাভাই এমবিবিএস’ ছবির প্রধান চরিত্রের ক্ষেত্রেও বলিউড বাদশাহ শাহরুখ খানকে নেওয়ার ব্যাপারে প্রাথমিক পরিকল্পনা করা হয়েছিল। কিন্তু সে সময়কার শারীরিক অসুস্থতা এবং শুটিংয়ের নির্ধারিত সময়সূচির জটিল বিপত্তির কারণে তিনি সেই প্রস্তাবিত কাজটি শেষ পর্যন্ত করতে পারেননি বলে সংবাদমাধ্যমের বিভিন্ন প্রতিবেদনে জোরালোভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে অভিনেতা সঞ্জয় দত্তের দুর্দান্ত অভিনয়ে চরিত্রটি আকাশছোঁয়া জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল এবং শুধু এটিই নয়, বরং ‘থ্রি ইডিয়টস’, ‘রং দে বাসন্তী’, ‘যোধা আকবর’ ও ‘কহো না পেয়ার হ্যায়’ মতো ব্যবসাসফল সিনেমাগুলোতেও শাহরুখের অভিনয়ের প্রস্তাব কিংবা তাঁকে বিবেচনার জোরালো খবর অতীতে বহুবার গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল।
একসময় বলিউড ইন্ডাস্ট্রির দুই মহাতারকা শাহরুখ খান ও সালমান খান অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসেবে পরিচিত ছিলেন এবং তাঁরা একসঙ্গে বিখ্যাত ‘করণ অর্জুন’ চলচ্চিত্রেও সফলভাবে অভিনয় করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে ২০০৮ সালে জনপ্রিয় অভিনেত্রী ক্যাটরিনা কাইফের জন্মদিনের জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানে এই দুই বন্ধুর মাঝে অত্যন্ত তুমুল কথা-কাটাকাটি ও মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়। সেই অনভিপ্রেত ঘটনার পর দীর্ঘ একটি সময় ধরে তাঁদের পারস্পরিক সম্পর্ক চরম তিক্ততায় পর্যবসিত হয়েছিল এবং তাঁরা একে অপরকে জনসমক্ষে এড়িয়ে চলতেন ও সুকৌশলে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে চলতেন।
বলিউডের এই দুই প্রতাপশালী সুপারস্টারের মধ্যকার এই মন কষাকষি ও বিরোধ নিয়ে তখন দেশের সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক তোলপাড় ও আলোচনা হয়েছিল। ঘটনার দীর্ঘ প্রায় পাঁচ বছর পরে ২০১৩ সালে মুম্বাইয়ের এক প্রখ্যাত ইফতার অনুষ্ঠানে দুজনকে অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণভাবে একে অপরকে আলিঙ্গন করতে দেখা যায়, যার ফলে ধীরে ধীরে তাঁদের বরফ গলা সম্পর্ক স্বাভাবিক হতে শুরু করে। বর্তমান সময়ে এই দুই বন্ধুকে হরহামেশা একে অপরের চলচ্চিত্রে অতিথি চরিত্রে অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে পর্দা ভাগাভাগি করতে দেখা যায়।
২০১২ সালের ১৬ মে তারিখে মুম্বাইয়ের ঐতিহাসিক ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে জমজমাট কলকাতা নাইট রাইডার্স বনাম মুম্বাই ইন্ডিয়ানসের মধ্যকার একটি ক্রিকেট ম্যাচের সমাপ্তির পর বড় ধরনের এক বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন শাহরুখ খান। সে সময় জোরালো অভিযোগ উঠেছিল যে স্টেডিয়ামের নিরাপত্তাকর্মী এবং মুম্বাই ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সঙ্গে অভিনেতা অত্যন্ত দুর্ব্যবহার করেছেন। ঘটনার প্রেক্ষিতে শাহরুখের নিজস্ব বক্তব্য ছিল যে, স্টেডিয়ামের নিরাপত্তাকর্মীরা তাঁর নিজ সন্তানদের সঙ্গে অত্যন্ত অসম্মানজনক ও দুর্ব্যবহার করেছিলেন, যার কারণে তিনি একজন পিতা হিসেবে চরম ক্ষুব্ধ ও সংক্ষুব্ধ হয়েছিলেন।
উক্ত অপ্রীতিকর ঘটনার তাৎক্ষণিক পর পরই মুম্বাই ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন তাঁকে ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়াম চত্বরে প্রবেশ করার ওপর পাক্কা পাঁচ বছরের জন্য কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। এই নজিরবিহীন শাস্তির বিষয়টি নিয়ে ভারতীয় মূলধারার ক্রিকেট অঙ্গন ও বিনোদন জগতে তীব্র সমালোচনার ঝড় ও তুমুল আলোচনা শুরু হয়েছিল। অবশেষে সুদীর্ঘ সময় পেরিয়ে ২০১৫ সালের আগস্ট মাসে মুম্বাই ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন সেই বিতর্কিত নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি তুলে নেয়।
আইপিএল ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেট দলের গর্বিত মালিক হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিত শাহরুখ খানের জন্য স্টেডিয়ামের এই অনভিপ্রেত ঘটনাটি তাঁর বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের ভাবমূর্তির ওপর এক বিরাট বড় ধাক্কা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল।
নিজ জীবনের সুবর্ণ জয়ন্তী তথা ৫০তম জন্মদিনের ঠিক প্রাক্কালে ২০১৫ সালে ভারতের সামগ্রিক অসহিষ্ণুতার সামাজিক পরিবেশ নিয়ে একটি জনসমক্ষে মন্তব্য করে তীব্র বিতর্কের মুখে পড়েন শাহরুখ খান। দেশের একটি সুপরিচিত সংবাদমাধ্যমের সাক্ষাৎকারে তিনি অকপটে বলেছিলেন যে, বর্তমান সময়ে দেশে অসহিষ্ণুতার মাত্রা দিন দিন যেভাবে বাড়ছে, তা তাঁর ব্যক্তিগত ভাবনার জায়গা থেকে অত্যন্ত উদ্বেগের একটি বড় বিষয়। তাঁর এই অত্যন্ত সংবেদনশীল বক্তব্যের ঠিক পর পরই দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সামাজিক সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে তাঁর বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা ও প্রতিবাদের ঝড় বয়ে যায়। এমনকি তাঁর সেই সময়ে সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত অত্যন্ত প্রত্যাশিত ‘দিলওয়ালে’ চলচ্চিত্রের প্রদর্শনী ও মুক্তির বিরুদ্ধেও দেশের বিভিন্ন স্থানে নানা ধরনের প্রতিবাদী কর্মসূচি পালিত হয়েছিল।
পরবর্তী সময়ে সৃষ্ট এই বিতর্কের প্রেক্ষাপটে শাহরুখ সাফ জানিয়ে দিয়েছিলেন যে তাঁর প্রদত্ত মন্তব্যগুলোর উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ভুল ব্যাখ্যা করা হয়েছে এবং তিনি কখনোই দেশের কাউকে বিন্দুমাত্র আঘাত করার উদ্দেশ্যে কোনো কথা বলেননি। সেই সঙ্গে তিনি নিজের মাতৃভূমি এবং দেশের সমস্ত সাধারণ মানুষের প্রতি তাঁর গভীর ও অবিচল ভালোবাসার কথা অত্যন্ত জোরালোভাবে পুনর্ব্যক্ত করেছিলেন। এই তীব্র বিতর্কটি তাঁর বর্ণাঢ্য অভিনয় জীবনের ঠিক এমন একটি সময়ে সংঘটিত হয়েছিল, যখন তাঁর সর্বকালীন জনপ্রিয়তা ছিল একেবারে মধ্যগগণে ও তুঙ্গে।
চলচ্চিত্র জগতের স্বনামধন্য পরিচালক ও সম্পাদক শিরীষ কুন্দরের সঙ্গে এক অপ্রীতিকর পেশাদারি বিবাদে জড়িয়ে পড়েছিলেন বলিউড সুপারস্টার শাহরুখ খান। মুম্বাই শহরের একটি বিলাসবহুল ভেন্যুতে ব্লকবাস্টার ‘অগ্নিপথ’ চলচ্চিত্রের জমকালো সাফল্য উদ্যাপনের এক আনন্দঘন অনুষ্ঠানে দুই প্রভাবশালী ব্যক্তির মধ্যে কথা-কাটাকাটির সূত্রপাত ঘটে। ঠিক সেই মুহূর্তেই উত্তেজনার বশে শাহরুখ নাকি পরিচালক শিরীষ কুন্দরকে সজোরে চড় মেরে বসেছিলেন বলে সংবাদমাধ্যমে গুরুতর অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছিল।
সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী, সেই সময়ে শিরীষ কুন্দর ছিলেন বলিউডের খ্যাতনামা পরিচালক ফারাহ খানের স্বামী এবং অন্যদিকে ফারাহ ও শাহরুখ অতীতে ছিলেন অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও পরীক্ষিত কাজের সহযোগী। তাঁদের যৌথ প্রচেষ্টায় ‘ম্যায় হু না’, ‘ওম শান্তি ওম’ এবং ‘হ্যাপি নিউ ইয়ার’-এর মতো একাধিক বক্স অফিস হিট সিনেমা উপহার পেয়েছে বলিউড। এই অনভিপ্রেত চড় মারার ঘটনার পর থেকে তাঁদের দীর্ঘদিনের অটুট বন্ধুত্বেও স্থায়ী দূরত্বের প্রাচীর তৈরি হয়েছিল বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে নিয়মিত খবর প্রকাশিত হতে থাকে।
একসময়ের বলিউডের সবচাইতে জনপ্রিয় ও শক্তিশালী বন্ধুত্বের এই জুটির ভেতরে ঘটে যাওয়া এমন মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন ও দূরত্ব ছিল শাহরুখ খানের ব্যক্তিগত জীবনের অন্যতম বহুল আলোচিত একটি অধ্যায়।
একসময় চলচ্চিত্র জগতে শাহরুখ খানের নামটির উপস্থিতি নিজেই ছিল যেকোনো সিনেমার নিশ্চিত বাণিজ্যিক সাফল্যের এক বিরাট ও অকাট্য গ্যারান্টি। কিন্তু সময়ের নিষ্ঠুর পরিবর্তনে দর্শকের রুচির পরিবর্তন ঘটেছে এবং পাশাপাশি বক্স অফিসের লাভ-ক্ষতির হিসাব-নিকাশের সমীকরণও সম্পূর্ণ বদলে গেছে। ‘ফ্যান’, ‘জব হ্যারি মেট সেজল’ এবং বহুল প্রতীক্ষিত ‘জিরো’র মতো ব্যয়বহুল সিনেমাগুলো দর্শকদের মনে বা বক্স অফিসে প্রত্যাশিত মাত্রায় ব্যবসা করতে চরম ব্যর্থ হয়। বিশেষ করে ২০১৮ সালে প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাওয়া ‘জিরো’ চলচ্চিত্রটি তাঁর সুদীর্ঘ ক্যারিয়ারের জন্য অত্যন্ত বড় এবং বেদনাদায়ক একটি ধাক্কা হিসেবে প্রমাণিত হয়েছিল।
পরবর্তীতে ২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সাংবাদিক রিচার্ড কোয়েস্টকে দেওয়া এক একান্ত সাক্ষাৎকারে শাহরুখ অত্যন্ত সততার সঙ্গে স্বীকার করেন যে, একের পর এক ব্যর্থতার সেই দিনগুলোতে তিনি নিজের পেশাদার কাজ নিয়ে সম্পূর্ণ নতুন আঙ্গিকে ভাবতে বাধ্য হয়েছিলেন। তাঁর নিজস্ব জবানিতে সেই সময়কার কথা বলতে গিয়ে তিনি উল্লেখ করেছিলেন যে তিনি তখন মূলত নিজের মানসিক ক্ষতগুলো সারিয়ে তোলার বা হিলিং করার কঠিন চেষ্টা চালাচ্ছিলেন। তিনি আরও বিশদভাবে ব্যাখ্যা করেছিলেন যে, কিছু নির্দিষ্ট সিনেমা নিয়ে তিনি এতটা অতিমাত্রায় নতুন কিছু করার দুঃসাহসী চেষ্টা করেছিলেন যে শেষ পর্যন্ত তিনি সাধারণ দর্শকদের প্রকৃত চাহিদার কথাটি ঠিকমতো আর শুনতে পাননি।
‘জিরো’ চলচ্চিত্রের অপ্রত্যাশিত বিপর্যয়ের পর সুদীর্ঘ প্রায় চার বছর ধরে বড় পর্দার কোনো প্রধান চরিত্রে শাহরুখ খানকে আর দেখতে পাওয়া যায়নি। তাঁর এই চার বছরের সুদীর্ঘ বিরতি নিয়ে চলচ্চিত্রপাড়ায় ও ভক্তদের মাঝে নানা ধরনের মুখরোচক গুঞ্জন ও আলোচনা ডালপালা মেলেছিল। কেউ কেউ নানা যুক্তিতে বলেছিলেন যে পরপর কয়েকটি ছবির চরম ব্যবসায়িক ব্যর্থতা তাঁকে অনেকটাই পিছিয়ে দিয়েছে ও কোণঠাসা করে ফেলেছে। আবার অন্য একটি অংশের সুধীজন মনে করেছিলেন যে এই দীর্ঘ বিরতিটি ছিল আসলে তাঁর নিজের ভেতরকার শক্তিকে নতুন করে প্রস্তুত করার একটি পরিকল্পিত কৌশল মাত্র।
শাহরুখ খানের নিজস্ব বিভিন্ন সাক্ষাৎকারের বক্তব্যেও এই বিষয়টি স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে যে, সেই নির্দিষ্ট সময়ে তিনি অভিনয়ের প্রতি আগের মতো আর কোনো মানসিক তাগিদ বা আগ্রহ অনুভব করছিলেন না। পরবর্তীতে ২০২৪ সালে প্রদত্ত এক সাক্ষাৎকারে তিনি অত্যন্ত খোলামেলাভাবে জানান যে ‘জিরো’ ছবির মুক্তির পর একদিন হঠাৎ করেই তাঁর মনে হয়েছিল যে তাঁর আর বিন্দুমাত্র অভিনয় করতে ইচ্ছা করছে না। এই তীব্র মানসিক অবসাদ থেকে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে তাঁর সিনেমার প্রযোজককে ফোন করে সাফ জানিয়ে দিয়েছিলেন যে তিনি অভিনয় থেকে এক বছরের একটি বাধ্যতামূলক বিরতি নিতে চান।
পরবর্তী সময়ে সেই সাময়িক বিরতির সময়সীমা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়ে রূপ নেয় এক বিরাট অবকাশে, যে সময়টিতে তিনি মূলত সিনেমা দেখা, নতুন ও সৃজনশীল গল্প শোনা, প্রচুর বই পড়া এবং নিজের পরিবারের সঙ্গে একান্ত সময় কাটানোয় সর্বতোভাবে মনোযোগ নিবদ্ধ করেছিলেন। এমনকি এই অবসর সময়ে তিনি শখেরবশে অত্যন্ত সুস্বাদু পিৎজা বানানো শেখার সুনির্দিষ্ট ইচ্ছার কথাও অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে গণমাধ্যমে প্রকাশ করেছিলেন। পরিশেষে দীর্ঘ সেই বিরতির সোনালি অধ্যায় সফলভাবে পার করে ২০২৩ সালে ‘পাঠান’, ‘জওয়ান’ এবং ‘ডানকি’র মতো দুর্দান্ত ও মেগাহিট সিনেমাগুলোর হাত ধরে তিনি অত্যন্ত রাজকীয় ভঙ্গিতে রুপালি পর্দায় জাঁকজমকপূর্ণ প্রত্যাবর্তন ঘটিয়েছেন।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।