
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
ফুটবল বিশ্বে সাধারণত রক্ষণভাগের খেলোয়াড়দের মাথা ঠান্ডা রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়। কারণ দলের খেলোয়াড়দের একটি ভুলের বড় মাশুল দিতে হয় পুরো দলকে। সেই ভুল যদি লাল কার্ডের মতো ঘটনা হয়, তবে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। গত শনিবার চেলসির বিপক্ষে ম্যাচে লিসান্দ্রো মার্তিনেজের মাঠ ছাড়ার দৃশ্যটি দেখলে বোঝা যায় তাঁর মাথা সেদিন কতটা গরম ছিল।
ম্যাচ চলাকালীন প্রথমে মরগান রজার্সকে ফেলে দেন মার্তিনেজ। রেকর্ড ট্রান্সফার ফি দিয়ে কেনা চেলসির এই উইঙ্গারকে করা ফাউলটি আর্জেন্টাইন ডিফেন্ডারের পছন্দ হয়নি সম্ভবত। এরপরই তিনি হাত উঁচিয়ে তেড়ে যান ওয়েসলি ফোফানার দিকে। বলের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক বা বল জেতার ন্যূনতম সম্ভাবনাও তখন ছিল না। ফরাসি ডিফেন্ডারের ওপর তিনি এমনভাবে ঝাঁপিয়ে পড়েন, দেখে মনে হচ্ছিল ব্যক্তিগত কোনো শত্রুতা রয়েছে।
এই ঘটনার কারণ খুঁজতে চাইলে তাকাতে হবে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের ড্রেসিংরুমের দিকে। সেখানে যেন যুক্তিবুদ্ধির উপস্থিতি দীর্ঘদিন ধরেই অনিয়মিত। চেলসির বিপক্ষে দুই গোল ব্যবধানে হারের ম্যাচে মার্তিনেজের লাল কার্ড দেখার ঘটনাটি মূলত ইউনাইটেডের চলমান দুর্দশারই একটি ছোট প্রতিচ্ছবি। শুরুতে রজার্সকে ফাউল করে হলুদ কার্ড দেখার পর মাত্র সাড়ে তিন মিনিটের ব্যবধানে ফোফানার ওপর বিপজ্জনকভাবে ঝাঁপিয়ে পড়েন তিনি।
ভিএআর মনিটরে চোখ বুলিয়ে রেফারি পিটার ব্যাংকস বুঝতে পারেন আর্জেন্টাইন ডিফেন্ডারকে কোনো ছাড় দেওয়া যায় না। ফলে লাল কার্ড দেখানোর পাশাপাশি চেলসিকে পেনাল্টিও দেওয়া হয়। রেফারির এই সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ মার্তিনেজ তখন ঝামেলায় জড়াতে গেলে সতীর্থরা তাঁকে সেখান থেকে সরিয়ে নেন। পরবর্তীতে কোচ মাইকেল ক্যারিকের পাশ দিয়ে মাথা নিচু করে তাঁকে মাঠ ছাড়তে হয় এবং ক্যারিকের চোখের দিকে তাকানোর সাহসটুকুও যেন তাঁর ছিল না।
অথচ এই ক্যারিকই তাঁকে দল থেকে বের করে না দিয়ে দ্বিতীয়বার সুযোগ দিয়েছিলেন। ক্লাবের পরিচালকদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে ক্ষোভ প্রকাশের পরও ক্যারিক তাঁকে ফিরিয়ে এনেছিলেন দলে। গত অক্টোবর মাসে আতলেতিকো মাদ্রিদের কাছে হারের পর মার্তিনেজ দাবি করেছিলেন, গ্রীষ্মকালীন দলবদলে পর্যাপ্ত খেলোয়াড় না কেনায় ক্লাবের পরিচালকেরা ব্যর্থ হয়েছেন। টেকনিক্যাল ডিরেক্টরের কাছ থেকে আরও বেশি প্রত্যাশা করার কথা তিনি বললেও, মাঠে নিজের দায়িত্ব কি তিনি সঠিকভাবে পালন করতে পারছেন?
ইউনাইটেডের বর্তমান অবস্থা এমনিতেই বেশ নাজুক। টানা তিনটি পরাজয়ের পর প্রিমিয়ার লিগ টেবিলের অবনমন অঞ্চলের একেবারে সীমানায় অবস্থান করছে দলটি। এমন সংকটময় মুহূর্তে দলের একজন অভিজ্ঞ খেলোয়াড়ের কাছ থেকে নেতৃত্ব, সাহস ও প্রতিরোধ আশা করা হলেও মার্তিনেজ ঠিক উল্টো চিত্র দেখিয়ে যাচ্ছেন। চেলসির প্রথম গোল হজমের সময় রজার্স প্রায় হেঁটে ইউনাইটেডের রক্ষণভাগ পার হয়ে গেলেও মার্তিনেজের কোনো প্রতিরোধ দেখা যায়নি। অথচ মাইক্রোফোনের সামনে তাঁর সাহসের কোনো কমতি থাকে না।
দলবদল নীতি নিয়ে প্রকাশ্যে সমালোচনা করা বা পরিচালকদের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো সহজ হলেও, মাঠে দলকে বিপদ থেকে উদ্ধারের সময় সেই সাহস আর দেখা যায় না। মার্তিনেজের মধ্যে প্রচুর অভিযোগ, ক্ষোভ ও অসন্তোষ থাকলেও কোনো সমাধান খোঁজার তাগিদ লক্ষ্য করা যায় না।
ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে মার্তিনেজের ফুটবল অধ্যায়ও খুব একটা গর্ব করার মতো নয়। সাড়ে চার বছরে তিনি লিগে অংশ নিয়েছেন মাত্র ৭২টি ম্যাচ। ইনজুরির কারণে তাঁকে মাঠের বাইরে কাটাতে হয়েছে ৬০৯ দিন। ইনজুরি কোনো ফুটবলারের অপরাধ না হলেও, সুস্থ থাকার পরও তাঁর পারফরম্যান্সের ধারাবাহিকতাহীনতা নানা প্রশ্নের জন্ম দেয়। ২০২২ সালে আয়াক্সে এরিক টেন হাগের প্রিয় ছাত্র ছিলেন তিনি। সেই টেন হাগই চার কোটি ৮০ লাখ পাউন্ড খরচ করে তাঁকে ইউনাইটেডে নিয়ে এসেছিলেন। বর্তমান পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে জানুয়ারির দলবদলে তাঁকে বিক্রি করে লোকসান হলেও ক্লাব হয়তো আপত্তি করবে না, অন্তত হিসাবের খাতা থেকে একটি বড় বোঝা কমবে।
আমস্টারডামে খেলার সময় মার্তিনেজের নাম হয়েছিল ‘দ্য বুচার’ বা কসাই, যা মূলত তাঁর প্রতিপক্ষকে আতঙ্কিত করা ট্যাকলের কারণেই পেয়েছিলেন। আর্জেন্টিনা জাতীয় দলেও তাঁর পারফরম্যান্সের সুবাদে এই নাম মানানসই ঠেকে। কিন্তু ইউনাইটেডে এসে তাঁর সেই কসাইসুলভ দক্ষতা যেন হারিয়ে গেছে। ট্যাকলের টাইমিং এতটাই এলোমেলো হয়ে গেছে যে মনে হয় তিনি যেকোনো মুহূর্তে কার্ড দেখতে পারেন।
চলতি বছরে এটি মার্তিনেজের দ্বিতীয় লাল কার্ড। গত এপ্রিল মাসে লিডসের বিপক্ষে ডমিনিক কালভার্ট-লুইনের চুল টেনে ধরে মাঠ ছাড়তে হয়েছিল তাঁকে। সেবার কোচ ক্যারিক রেফারির সিদ্ধান্তের সমালোচনা করলেও এবার আর কোনো মন্তব্য করেননি।
মার্তিনেজের প্রধান সমস্যা হলো তিনি জাতীয় দলের জার্সিতে যতটা সফল, ক্লাবের হয়ে ঠিক ততটাই ব্যর্থ। গত দুটি বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগের অন্যতম নির্ভরযোগ্য যোদ্ধা ছিলেন তিনি। ক্রিস্টিয়ান রোমেরোর সঙ্গে তাঁর জুটি বেশ শক্ত ভিত্তি গড়েছিল। সেমিফাইনালে জয়ের পর ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ আর্জেন্টিনার—এমন লেখা ব্যানার তুলে ধরে তিনি ইংলিশ সমর্থকদের রোষানলেও পড়েছিলেন।
দেশের জার্সিতে খেলার সময় মার্তিনেজের চারপাশে যেন একটি নিরাপত্তার বলয় তৈরি হয়, যেখানে তিনি অত্যন্ত আগ্রাসী ও আত্মবিশ্বাসী। কিন্তু ইউনাইটেডের হয়ে মাঠে নামলেই রক্ষণভাগে তাঁকে প্রায় একা লড়তে হয় এবং তখন তাঁর খেলার সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক দিকগুলো প্রকাশ পায়।
কোনো ফুটবলারের ডাকনাম ‘কসাই’ হতেই পারে এবং ফুটবলে এ ধরনের আগ্রাসন অনেক সময় দলের জন্য সম্পদও বটে। কিন্তু সেই কসাই যখন নিজের দলেরই সর্বনাশের কারণ হয়ে ওঠেন, তখন তাঁকে আর ভালো লাগার উপায় থাকে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমর্থকেরাও এখন একবাক್ಯ সেটাই বলছেন, মার্তিনেজ বর্তমান সময়ে ইউনাইটেডের সবচেয়ে বড় গোলমাল পাকানো লোক।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।