
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
আজ থেকে ঠিক তিন বছর আগে দুই নভেম্বর হঠাৎ করেই সংবাদ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে জনপ্রিয় টিভি অভিনয়শিল্পী হোমায়রা হিমুর আকস্মিক প্রয়াণের সংবাদ। ওই সময়ে তাঁর এই চলে যাওয়া নিয়ে নানা ধরনের ধোঁয়াশা তৈরি হয়, যার একটি পক্ষ একে আত্মহত্যা বললেও অন্যপক্ষ এটিকে হত্যাকাণ্ড বলে সন্দেহ প্রকাশ করেছিল। দীর্ঘ দুই দশকের বেশি সময় ধরে অভিনয় জগতের সঙ্গে যুক্ত থাকা এই প্রতিভাবান শিল্পীর জীবনাবসান ঘটে চরম এক অনিশ্চয়তা ও রহস্যের মধ্য দিয়ে।
প্রয়াণের পর তৎক্ষণাৎ তাঁর মরদেহ রাজধানী ঢাকার উত্তরা অঞ্চলের একটি চিকিৎসালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল এবং দীর্ঘ সময় ধরে মৃত্যুর সঠিক কারণটি গোপন বা অজানা রয়ে যায়। সেই বিশেষ মুহূর্তটিতে এই অভিনেত্রীর অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর নেপথ্যে কোনো গভীর রহস্য লুকিয়ে থাকতে পারে বলে জোরালো গুঞ্জন তৈরি হয়। এরপর ঠিক পরের দিনই তাঁর এই মৃত্যুর সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা পাওয়ার অভিযোগে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নির্দিষ্ট একজনকে দ্রুত গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছিল।
১৯৮৫ সালের তেইশশে নভেম্বর দেশের দক্ষিণ অঞ্চলের লক্ষ্মীপুর জেলায় জন্মগ্রহণ করেন এই অভিনেত্রী এবং তাঁর শৈশবকালও অতিবাহিত হয় ওই জেলাতেই। শিক্ষাজীবনে মাত্র দ্বিতীয় শ্রেণিতে অধ্যয়নরত অবস্থাতেই তিনি স্থানীয় বিভিন্ন মঞ্চ নাটকে নিয়মিত অভিনয় শুরু করেছিলেন। গণমাধ্যম দেশ টেলিভিশনকে দেওয়া একটি পুরোনো সাক্ষাৎকারে তিনি নিজেই উল্লেখ করেছিলেন যে, ছোটবেলা থেকেই তিনি আঞ্চলিক পর্যায়ের হাইফাই কৌতুক এবং ফ্রেন্ডস নাট্যগোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত থেকে কাজ চালিয়ে গেছেন। পরবর্তীতে ১৯৯৯ সালে মাধ্যমিক বা এসএসসি পরীক্ষা শেষ করার পরপরই তিনি রাজধানী ঢাকায় এসে বিখ্যাত নাগরিক নাট্যাঙ্গন দলে নাম লেখান এবং পরবর্তীতে আরও বেশ কিছু নাট্যদলের সঙ্গে নিজের অভিনয় জীবন সমৃদ্ধ করেন।
মঞ্চে বেশ কয়েক বছর সফলভাবে কাজ করার পর এক জ্যেষ্ঠ প্রবীণ ব্যক্তির পরামর্শ অনুযায়ী তিনি নিজের কিছু স্থিরচিত্র বা ফটোশুট করে বিভিন্ন বিজ্ঞাপনী প্রতিষ্ঠানের কার্যালয়ে মডেল হিসেবে কাজ করার জন্য জমা দেন। সেই সুবাদে তিনি শুরুতে এইডস রোগ সম্পর্কে সচেতনতা তৈরির একটি ভিন্নধর্মী বিজ্ঞাপনে কাজ করার সুযোগ পান এবং পরবর্তীতে আরও কয়েকটি নামী বিজ্ঞাপনচিত্রে তাঁকে দেখা যায়। একটি জনপ্রিয় চায়ের বিজ্ঞাপনে তাঁর উপস্থিতি লক্ষ্য করে নির্মাতা তাহের শিপন তাঁকে প্রথমবারের মতো অভিনয়ের সুযোগ দেন, যা ছিল ‘পি আই’ নামের একটি টেলিভিশন নাটক। ওই নাটকে প্রয়াত প্রবীণ শিল্পী দিলীপ চক্রবর্তী ছিলেন তাঁর প্রথম সহশিল্পী এবং এর মাধ্যমে ২০০৫ সাল নাগাদ তিনি মূল বিনোদন জগতে প্রবেশ করেন, যেখানে তাঁর নাম হোমায়রা নুসরাত হিমু থেকে পরিবর্তিত হয়ে হোমায়রা হিমু হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।
অভিনয় জীবনের একেবারে শেষ পর্যায় এসে তাঁর নিয়মিত কাজের পরিমাণ অনেকটাই হ্রাস পেয়েছিল যা তাঁর জন্য বেশ হতাশার ছিল। প্রথম আলোর একটি বিশেষ প্রতিবেদনে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা অনলাইন প্ল্যাটফর্মে তাঁর কাজের দর্শক বা ভিউ কম হওয়ার অজুহাত দেখিয়ে নির্মাতা ও প্রযোজকেরা তাঁকে আগের মতো কাজ দিতে আগ্রহী ছিলেন না এবং এ বিষয়ে তিনি নিজের চরম আক্ষেপের কথা ব্যক্ত করেছিলেন। লক্ষ্মীপুরের পৈতৃক নিবাসের এই শিল্পীর পিতা-মাতা কেউই জীবিত না থাকায় মাঝেমধ্যেই তিনি মারাত্মক একাকিত্বের শিকার হতেন বলে তাঁর ঘনিষ্ঠ সহকর্মীরা পরবর্তী সময়ে গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন।
তাঁর এই প্রয়াণকে কেন্দ্র করে প্রচুর সন্দেহ তৈরি হলেও পরিবারের কোনো সদস্য উপস্থিত না থাকায় অভিনয় শিল্পী সংঘ তাঁর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া ও অন্যান্য সমস্ত দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তুলে নিয়েছিল। সেই সময়ে প্রাথমিক অবস্থায় এটিকে একটি স্বাভাবিক প্রয়াণ ধরে নিয়েই তারা পাশে দাঁড়িয়েছিল, কিন্তু পরবর্তীতে ঘটনার গতিপ্রকৃতি দেখে তাদের মনে নানা সন্দেহের উদ্রেক ঘটে। এই প্রসঙ্গে অভিনয় শিল্পী সংঘের তৎকালীন সভাপতি আহসান হাবীব নাসিম সংবাদ মাধ্যমকে জানিয়েছিলেন যে অতীতেও ঠিক একই কায়দায় আরেকজন শিল্পীকে চিকিৎসালয়ে ফেলে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছিল এবং হিমুর ক্ষেত্রেও ঠিক একইভাবে তাঁকে হাসপাতালে রেখে এক ব্যক্তি পালিয়ে যায়। ময়নাতদন্তের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পরই কেবল মৃত্যুর আসল রহস্য উন্মোচিত হবে এবং দোষী কেউ প্রমাণিত হলে সংঘের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হবে বলে তিনি মন্তব্য করেছিলেন।
নোয়াখালীর চেনা আঞ্চলিক ভাষায় চমৎকার অভিনয় করে ছোট পর্দার দর্শকদের হৃদয়ে তিনি সম্পূর্ণ আলাদা একটি স্থান ও পরিচিতি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। ছোট পর্দার পাশাপাশি ‘সোনাঘাট’, ‘চেয়ারম্যান বাড়ি’, ‘বাটিঘর’, ‘শোনে না সে শোনে না’, ‘কমেডি-৪২০’, ‘চাপাবাজ’ এবং ‘ছায়াবিবি’র মতো বহু দর্শকপ্রিয় নাটকে তাঁকে নিয়মিত অভিনয় করতে দেখা গেছে। পরবর্তীতে ২০১১ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র ‘আমার বন্ধু রাশেদ’-এ গুরুত্বপূর্ণ তরু চরিত্রে দারুণ অভিনয়ের মধ্য দিয়ে তিনি রূপালি পর্দায় বা বড় পর্দায় নিজের সফল অভিষেক ঘটিয়েছিলেন।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।