
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশটির অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ সাতটি অঙ্গরাজ্যের প্রায় প্রতিটিতেই প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ রিপাবলিকানদের তুলনায় সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন ডেমোক্র্যাট দলের প্রার্থীরা। মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য নিউইয়র্ক টাইমস এবং সিয়েনা যৌথভাবে এই সর্বশেষ জনমত জরিপটি পরিচালনা ও প্রকাশ করেছে। আমেরিকান কংগ্রেসের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উচ্চকক্ষ তথা সিনেটের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ শেষ পর্যন্ত কোন দলের হাতে ন্যস্ত হবে, তা নির্ধারণ করার ক্ষেত্রে এই নির্দিষ্ট অঙ্গরাজ্যগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করে থাকে।
সামনে আসা এই জরিপের বিস্তারিত ফলাফলে স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে যে, টেক্সাস এবং কানসাস অঙ্গরাজ্যের মতো জায়গায় ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা বেশ বড় ধরনের ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছেন। ঐতিহাসিক পরিসংখ্যান ঘাঁটলে দেখা যায়, সুদূর ১৯৮৮ সালের পর থেকে টেক্সাসে এবং ১৯৩২ সালের পর থেকে কানসাসের মাটিতে কোনো ডেমোক্র্যাট প্রার্থী সিনেটর হিসেবে জয়লাভ করতে পারেননি। ফলে বর্তমান এই ফলাফলকে রাজনৈতিকভাবে বেশ তাৎপর্যপূর্ণ বলেই বিবেচনা করা হচ্ছে।
মোট ১০০ জন সদস্য নিয়ে গঠিত মার্কিন সিনেটে নিজেদের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রতিষ্ঠা করতে হলে ডেমোক্র্যাটদের কিছু কঠিন শর্ত পূরণ করতে হবে। এর জন্য তাদের একদিকে যেমন নিজেদের বর্তমান দখলে থাকা প্রতিটি আসন অক্ষুণ্ণ রাখতে হবে, অন্যদিকে ঠিক তেমনই বিপরীত শিবির অর্থাৎ রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণে থাকা অন্তত চারটি আসন নিজেদের আয়ত্তে নিয়ে আসতে হবে।
বাস্তবতা হলো ডেমোক্র্যাটদের জন্য এই রাজনৈতিক লড়াই অত্যন্ত কঠিন ও দুর্গম বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, ডেমোক্র্যাটদের এই জয়ে পৌঁছাতে হলে যে আসনগুলোতে অবশ্যই জয় তুলে নিতে হবে, তার সিংহভাগই মূলত দীর্ঘদিন ধরে রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ও প্রতিষ্ঠিত।
তবে সাম্প্রতিক এই জনমত জরিপটি সম্পূর্ণ নতুন এক চিত্র তুলে ধরেছে, যেখানে দেখা যাচ্ছে বর্তমানে রিপাবলিকান পার্টির সিনেটর বহাল আছেন এমন মোট পাঁচটি ভিন্ন অঙ্গরাজ্যেও ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা ভোটের দৌড়ে এগিয়ে গেছেন। পাশাপাশি, তালিকায় থাকা ষষ্ঠ অঙ্গরাজ্যটিতে দুই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দলের প্রার্থীর জনসমর্থন বা অবস্থান প্রায় সমান সমান পর্যায়ে রয়েছে।
বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, নির্বাচিত এই গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গরাজ্যগুলোর মধ্যে কানসাস, মেইন, ওহাইও এবং টেক্সাসের মতো জনবহুল ও প্রভাবশালী এলাকায় ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছেন। তবে উত্তরের আলাস্কা অঙ্গরাজ্যে দুই দলের মধ্যকার ব্যবধান অত্যন্ত সামান্য। অন্যদিকে, আইওয়া অঙ্গরাজ্যে দুই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দলের প্রার্থীর মধ্যে কার্যত একটি হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের তীব্র আভাস পরিলক্ষিত হচ্ছে।
এবারের নির্বাচন প্রক্রিয়ায় ডেমোক্র্যাটদের নিজস্ব দখলে থাকা একমাত্র অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সিনেট আসনটি অবস্থিত মিশিগান অঙ্গরাজ্যে। প্রকাশিত জরিপের তথ্য অনুযায়ী, এই এলাকার ডেমোক্র্যাট দলের প্রার্থী তার রিপাবলিকান প্রতিদ্বন্দ্বীর তুলনায় দুই অঙ্কের বড় ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছেন। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, জরিপটি সম্পন্ন করা হয়েছিল ঠিক সপ্তাহান্তে মিশিগানের ডেমোক্র্যাট শিবিরের ভেতরে অভ্যন্তরীণ বিরোধ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার আগের মুহূর্তে।
মিশিগানের এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সিনেট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার ঠিক আগে রিপাবলিকান দলের মনোনীত প্রার্থীর প্রতি প্রকাশ্য সমর্থন ঘোষণা করেছেন খোদ ডেমোক্রেটিক পার্টির একজন বর্তমান কংগ্রেস সদস্য। দলীয় প্রাইমারি নির্বাচনে তিনি নিজের দলেরই অন্য প্রার্থী আবদুল আল–সাইয়েদের কাছে পরাজিত হয়েছিলেন। মূলত সেই দলীয় প্রার্থী আবদুল আল–সাইয়েদের সঙ্গে তৈরি হওয়া তীব্র বিরোধের জেরে তিনি এমন কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। মার্কিন কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ বা প্রতিনিধি পরিষদের এই নারী সদস্যের নাম হ্যালি স্টিভেন্স।
স্থানীয় সময় ঠিক গতকাল রোববার রিপাবলিকান প্রার্থী রজার্সের সঙ্গে এক যৌথ অনুষ্ঠানে প্রকাশ্যে উপস্থিত থাকতে দেখা যায় হ্যালিকে। এর কিছু সময় পর জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে নিজের ভেরিফায়েড অ্যাকাউন্টে পোস্ট করা একটি ভিডিও বার্তার মাধ্যমে হ্যালি বলেন যে, তিনি আবদুলের নির্বাচনী প্রচারণার কোনো অংশ নন। তিনি আরও বলেন, মিশিগানের সাধারণ মানুষের আসল পরিচয় কখনোই ঘৃণা ছড়ানো নয় এবং তাদের ডেমোক্র্যাট পার্টির মনোনীত প্রার্থী বর্তমানে যা করে চলেছেন, তা-ও তাদের প্রকৃত পরিচয় বহন করে না। মূলত এই সুনির্দিষ্ট কারণেই তিনি শেষ পর্যন্ত মাইক রজার্সকে সমর্থন জানানোর এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন।
উল্লেখ্য, দ্য নিউইয়র্ক টাইমস এবং সিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত এই জনমত জরিপের তালিকায় নর্থ ক্যারোলাইনা অঙ্গরাজ্যটিকে সুনির্দিষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। ওই এলাকায় দীর্ঘ সময় ধরেই বিভিন্ন জনমত জরিপে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী বেশ সুবিধাজনক ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছেন। আর এই সুস্পষ্ট কারণে রিপাবলিকান শিবির নর্থ ক্যারোলাইনাতে তাদের পূর্বনির্ধারিত নির্বাচনী প্রচারণার বাজেট ও ব্যয় অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছে।
সামগ্রिक এই জরিপ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গৃহীত বিভিন্ন নীতির প্রতি সাধারণ ভোটারদের প্রকাশ্য অসন্তোষ এবং দেশের অর্থনীতি সার্বিকভাবে পরিচালনা করার ক্ষেত্রে তাঁর ব্যক্তিগত ভূমিকা নিয়ে ভোটারদের মনের ভেতরের তীব্র হতাশা মূলত রিপাবলিকান শিবিরকে জনসমর্থনের দিক থেকে পিছিয়ে দিচ্ছে।
জরিপে অন্তর্ভুক্ত করা সাতটি জনবহুল অঙ্গরাজ্যের সম্ভাব্য মোট ভোটারদের মধ্যে মাত্র ৩৮ শতাংশ মানুষ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কাজের প্রতি তাদের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছেন। এই সমর্থনের হার তুলনামূলকভাবে বেশ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কম। অথচ ঠিক এর মাত্র দুই বছর আগের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই অঙ্গরাজ্যগুলোর মধ্যে পাঁচটিতেই ট্রাম্প দুই অঙ্কের শক্তিশালী ব্যবধানে জয়লাভ করেছিলেন।
এর উল্টো পিঠে, দেশের অর্থনীতি সফলভাবে সামলানোর ক্ষেত্রে সাধারণ ভোটারদের মনে ডেমোক্র্যাটদের ওপর আস্থার মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। আর এই আস্থার কারণেই দলটির সামগ্রিক জনসমর্থনে বর্তমান এই দৃশ্যমান অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। এবারের পুরো নির্বাচনী প্রচারণায় সাধারণ ভোটারদের কাছে এটিই সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ প্রধান ইস্যু হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সব মিলিয়ে যদি এই জনমত জরিপের চূড়ান্ত আভাস শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের ফলাফলের সাথে পুরোপুরি মিলে যায়, তবে মার্কিন কংগ্রেসের প্রভাবশালী উচ্চকক্ষ সিনেটের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিতভাবেই ডেমোক্র্যাটদের হাতে চলে যাবে।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।