
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
রাষ্ট্রপতির সঙ্গে মিল রেখে প্রধান নির্বাহীর যাতায়াতের সময় আকাশযানে সমস্যা দেখা দেওয়ার বিষয়টি সংসদীয় প্যানেলের বৈঠকে গুরুত্ব পায়। অতীতেও এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হওয়ায় বারবার একই জটিলতা তৈরির কারণ সম্পর্কে স্পষ্ট ব্যাখ্যা তলব করে সংসদীয় কমিটি।
জাতীয় পতাকাবাহী সংস্থার পক্ষ থেকে কমিটিকে জানানো হয়, শীর্ষ নির্বাহীর গমনাগমনের ক্ষেত্রে সর্বদা বহরের সর্বাধুনিক বিমানগুলোই বরাদ্দ করা হয়। এই বিশেষ যাত্রার আগে পূর্ববর্তী ত্রিশ দিনের উড্ডয়ন কার্যক্রম নিবিড়ভাবে মূল্যায়ন করে কোনো ত্রুটি রয়েছে কি না, তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখা হয়।
এছাড়াও রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থার উড্ডয়নযান ও সরঞ্জামাদি ক্রয়ের প্রক্রিয়ায় অনিয়মের দায়দায়িত্ব নিরূপণ এবং ডিজিটাল ব্যবস্থার দুর্বলতার সুযোগে সম্ভাব্য আর্থিক ক্ষতির বিষয়গুলোও আলোচনায় স্থান পায়।
নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে জানা যায়, রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের বিশেষ অতিথিদের বিশ্রামকক্ষের সুযোগ-সুবিধা ও সামগ্রিক পরিবেশ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বেশ কয়েকজন সংসদ সদস্য। প্যানেলের একজন সদস্য অভিযোগ করেন, ডিজিটাল মাধ্যমে টিকিট কাটতে গেলে তা পাওয়া যায় না, অথচ আকাশযানে ওঠার পর ஏராளமான আসন খালি দেখতে পাওয়া যায়।
আলোচনাসভায় জাতীয় পতাকাবাহী সংস্থার হিসাব নিরীক্ষায় প্রাপ্ত আপত্তিগুলোর প্রসঙ্গও বিশেষভাবে উত্থাপিত হয়। প্যানেলের প্রধান জানতে চান, নির্দিষ্ট একটি আন্তর্জাতিক রুটে চার্টার্ড পণ্যবাহী ফ্লাইট পরিচালনা ও রাজস্ব আদায়ের প্রক্রিয়ায় শত শত কোটি টাকার অনিয়ম কী প্রক্রিয়ায় সংঘটিত হলো। এ ছাড়া হিসাব সংক্রান্ত ১৮টি আপত্তির বিপরীতে প্রমাণসহ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কোনো কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করা সম্ভব কি না, সে বিষয়েও তিনি ব্যাখ্যা চান।
এর পাশাপাশি, ত্রুটিপূর্ণ আকাশযান সংগ্রহ, অচল যন্ত্রপাতি ফেলে রাখা, অপ্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ ক্রয় এবং মেয়াদোত্তীর্ণ বিমান কেনার মতো গুরুতর সিদ্ধান্ত গ্রহণের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে কি না, সে বিষয়েও কৌতূহলী ছিল কমিটি।
সংস্থার পক্ষ থেকে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, বৈঠকে উত্থাপিত হিসাব নিরীক্ষা আপত্তির বিপরীতে আদায়কৃত অর্থের পরিমাণ, বকেয়া টাকার অঙ্ক এবং এই অনিয়মের সঙ্গে যুক্ত কতজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গৃহীত হয়েছে, তার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ তলব করা হয়েছে।
বিমানবন্দরে উড্ডয়ন বিলম্বে যাত্রার প্রধান কারণ হিসেবে বৈদেশিক গন্তব্যের ফ্লাইটগুলোর জন্য চেক-ইন কাউন্টারের অপর্যাপ্ততা, বোর্ডিং গেটের তীব্র সংকট, মালামাল ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতা এবং নির্ধারিত ইউএলডি ইয়ার্ড না থাকার বিষয়গুলো প্রতিবেদনে সুনির্দিষ্টভাবে তুলে ধরা হয়।
উক্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, একই সময়ে একাধিক আন্তর্জাতিক বিমানের চেক-ইন পরিচালনার জন্য পর্যাপ্ত বুথ না থাকায় নির্ধারিত সময়ে কার্যক্রম সম্পন্ন করা যায় না, যা পরবর্তীতে উড্ডয়নের সঠিক সময় রক্ষা করার ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। পাশাপাশি গেট বরাদ্দ দিতে দেরি হওয়া, একই গেট একাধিক বিমানের জন্য ব্যবহার করা এবং বোর্ডিং ব্রিজের সংখ্যা কম থাকায় যাত্রী ওঠানামার কাজ ব্যাহত হয়। বিশেষ করে তিন থেকে চারশ যাত্রী ধারণক্ষমতাসম্পন্ন বড় আকারের উড্ডয়নযানে যাত্রী প্রবেশ করাতে অপেক্ষাকৃত বেশি সময় ব্যয় হয়।
যাত্রী বিদায় এলাকার মালামাল শাখায় জায়গার অপ্রতুলতা এবং আগমনী যাত্রীদের লাগেজ বেল্টের স্বল্পতার কারণে মালামাল হস্তান্তরে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। সেখানে ব্যাখ্যা করা হয়, একই সময়ে দশ থেকে বারোটি বিমান অবতরণ করলে এই জটিলতা বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। নির্দিষ্ট ইউএলডি ইয়ার্ড না থাকায় দেশি ও বিদেশি বিমান সংস্থাগুলোর সংশ্লিষ্ট সরঞ্জাম ব্যবস্থাপনা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং আর্থিক লোকসানের মুখে পড়ছে। এ ছাড়া দূরবর্তী পার্কিং বে বরাদ্দে সঠিক নম্বর উল্লেখ না থাকা এবং গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সরঞ্জাম রাখার সুনির্দিষ্ট স্থান না থাকায় সামগ্রিক বিমান সেবামূলক কার্যক্রমে বিলম্ব ঘটে।
বৈঠকে গত দশটি অর্থবছরের আয় ও ব্যয়ের হিসাব আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থাপন করা হয়। উপস্থাপিত তথ্য থেকে দেখা যায়, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে এবং ২০১৯-২০ অর্থবছরে সংস্থাটি উল্লেখযোগ্য পরিমাণ আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছিল। তবে অন্যান্য হিসাব বছরগুলোতে বিমান মুনাফা অর্জন করতে সক্ষম হয়। এর মধ্যে সর্বশেষ অন্তর্বর্তীকালীন মূল্যায়নে অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে সর্বোচ্চ ৮২২ কোটি টাকার বেশি মুনাফা অর্জনের কথা জানানো হয়। এর আগের বছরগুলোতেও উল্লেখযোগ্য অঙ্কের মুনাফা অর্জনের পরিসংখ্যান তুলে ধরা হয়।
সংসদীয় কমিটির সভাপতি ও প্রধান হুইপের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে প্যানেলের অন্যান্য সম্মানিত সদস্য ও হুইপবৃন্দ সশরীরে উপস্থিত থেকে আলোচনায় অংশ নেন।
সূত্র: আজকের পত্রিকা