
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
ফুটবল খেলাটি যদি মাত্র সত্তর মিনিটে নির্ধারিত হতো, তবে হয়তো বাংলাদেশ দল এত দিনে বেশ কয়েকটি সাফ ট্রফি নিজেদের ঘরে তুলতে পারত। কিন্তু একটি প্রতিযোগিতামূলক ফুটবল ম্যাচ কখনো সত্তর মিনিটে শেষ হয় না এবং এর পরেও মাঠে জন্ম নেয় নানা নাটকীয়তা ও রোমাঞ্চকর মুহূর্ত। তবে নির্দিষ্ট কিছু দলের ক্ষেত্রে ম্যাচের এই অতিরিক্ত সময়টি অত্যন্ত অভিশপ্ত হয়ে দেখা দেয়, যার জলজ্যান্ত উদাহরণ হলো বাংলাদেশ দল। সাফ ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপের লড়াইয়ে ম্যাচগুলোর যখন শেষ কুড়ি থেকে পঁচিশ মিনিটের কোঠায় প্রবেশ করে, তখন ঘড়ির কাঁটা যেন লাল-সবুজ জার্সি পরিহিত খেলোয়াড়দের জন্য বয়ে নিয়ে আসে একেকটি মর্মান্তিক দুঃস্মৃতি। সাফের এ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত বিগত তেরোটি আসরের পুরো ইতিহাস জুড়েই এই বেদনাদায়ক পরিসংখ্যান ছড়িয়ে রয়েছে।
আগামী ৫ নভেম্বর থেকে রাজধানী ঢাকায় শুরু হতে যাচ্ছে সাফের আরও একটি নতুন আসর। যখন দীর্ঘ তেইশ বছরের অপেক্ষার যাতনা মুছে ফেলে বাংলাদেশ দল এবার যেকোনো মূল্যে তাদের শিরোপা খরা কাটাতে সম্পূর্ণ মরিয়া হয়ে উঠেছে, ঠিক সেই মুহূর্তে আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে সেই পুরোনো আতঙ্ক। এবারও কি তবে ম্যাচের শেষ কুড়ি থেকে পঁচিশ মিনিটের ব্যবধানে সব হিসাব-নিকাশ উল্টে যাবে, মুছে যাবে জয়ের সব আশা এবং চুরমার হয়ে যাবে ফাইনাল খেলার স্বপ্ন।
ইতিহাসের পাতা ঘাঁটলে দেখা যায়, গত তেরোটি আসরের মোট ছেচল্লিশটি ম্যাচে বাংলাদেশ দল প্রতিপক্ষের কাছে সর্বমোট বায়ান্নটি গোল হজম করেছে। আপাতদৃষ্টিতে এই সংখ্যাটি সাধারণ মনে হতে পারে, কিন্তু গোল খাওয়ার সময়গুলোর খাতা ওল্টালেই সামনে চলে আসে এক হৃদয়বিদারক তথ্য। এই বায়ান্নটি গোলের ঠিক আঠারোটিই এসেছে ম্যাচের সত্তরতম মিনিট থেকে শুরু করে শেষ বাঁশি বাজার সময় কিংবা অতিরিক্ত সময়ের সীমানার মধ্যে। সহজ কথায় বলতে গেলে, বাংলাদেশ দল তাদের খাওয়া প্রতি তিনটি গোলের মধ্যে একটি গোলই উপহার দিয়েছে এই নির্দিষ্ট সময়সীমায়। এর মধ্যে অন্তত সাতটি ম্যাচে বাংলাদেশ দল হয় এগিয়ে ছিল কিংবা স্কোরলাইনে সমতা বজায় রেখেছিল, কিন্তু সত্তর মিনিটের পরের ওই গোলগুলোর কারণে জয় বা ড্রয়ের স্বাদ পাওয়ার পরিবর্তে তাদের মাঠ ছাড়তে হয়েছে হার নিয়ে।
দক্ষিণ এশীয় ফুটবল টুর্নামেন্টে বাংলাদেশের সর্বশেষ ও একমাত্র সোনালী ট্রফি এসেছিল সুদূর ২০০৩ সালে। ওই বিশেষ আসরটির দৃশ্যপট অবশ্য ছিল সম্পূর্ণ উল্টো এবং ব্যতিক্রমী। ম্যাচের সত্তর মিনিট পার হওয়ার পর বাংলাদেশ দল দুটি গুরুত্বপূর্ণ গোল আদায় করে নিয়েছিল। গ্রুপ পর্বের লড়াইয়ে মালদ্বীপের বিপক্ষে একেবারে নব্বই মিনিটে গোল করে জয় নিশ্চিত করেছিলেন আরিফ খান। এরপর সেমিফাইনালে ভারতের শক্তিশালী দলের সঙ্গে এক এক গোলে সমতায় থাকা অবস্থায় নিরানব্বই মিনিটে গোল করে স্মরণীয় জয় এনে দিয়েছিলেন মতিউর মুন্না।
অবশ্য ওই শিরোপা জয়ের সোনালী সাফল্যটির মতো ঘটনাগুলোকে ব্যতিক্রম হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে। কারণ, ১৯৯৫ সাল থেকে শুরু করে ২০২৩ সাল পর্যন্ত সাফের বাকি বারোটি আসরে এই শেষ সময়টি বাংলাদেশের জন্য ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে লড়াই করে পরাজিত হওয়ার একেকটি জীবন্ত উপন্যাসের শামিল। গত ২০২৩ সালের সেমিফাইনালে কুয়েতের বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ের ১০৭ মিনিটে হজম করা একটি মাত্র গোল মুহূর্তেই গুঁড়িয়ে দিয়েছিল ফাইনাল খেলার রঙিন স্বপ্ন। একই টুর্নামেন্টের গ্রুপ পর্বে লেবাননের বিপক্ষে আশি ও ছিয়ানব্বই মিনিটের দুটি গোল খেয়ে মাটি হয়ে গিয়েছিল লাল-সবুজদের সব জয়োচ্ছ্বাস।
শুধু ওই আসরটিই নয়, তার আগের দুটি টুর্নামেন্টের চিত্রও ছিল হুবহু একই রকম। ২০২১ সালের সাফ টুর্নামেন্টে মালদ্বীপের বিপক্ষে বাহাত্তর মিনিটে গোল খেয়ে ম্যাচটিতে ঘুরে দাঁড়ানোর ন্যূনতম আশাও চিরতরে শেষ হয়ে গিয়েছিল, এবং একই আসরে গ্রুপ পর্বে নেপালের বিপক্ষে আটাশিত মিনিটে অঞ্জন বিস্তার করা গোলের কারণে বাংলাদেশের ফাইনালে ওঠার স্বপ্ন মুহূর্তেই চুরমার হয়ে গিয়েছিল। তারও আগে ২০১৮ সালে নিজেদের ঘরের মাঠে নেপালের বিপক্ষে নব্বই মিনিটের ঠিক মাথায় গোল খেয়ে পরাজয় বরণ করতে হয়েছিল। এছাড়া ২০১৫ সালের সাফে মালদ্বীপের বিপক্ষে একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে ৯০ ও পঁচানব্বই মিনিটে পরপর দুটি গোল খেয়ে নিশ্চিত জয় হাতছাড়া হওয়ার সেই পুরনো ক্ষতগুলোও এখনো পুরোপুরি শুকায়নি।
এই ব্যর্থতার ইতিহাস আরও একটু পেছনে ফিরে তাকালেও একেবারে অভিন্ন চিত্রই চোখে পড়ে। ২০১৩ সালের সাফে গ্রুপ পর্বের ম্যাচে ভারতের বিপক্ষে এগিয়ে থেকেও পঁচানব্বই মিনিটে সুনীল ছেত্রীর করা গোল অথবা পাকিস্তানের বিপক্ষে বিরানব্বই মিনিটে গোল খেয়ে ম্যাচ হারের চরম তিক্ততা কারোরই ভুলে যাওয়ার কথা নয়। এমনকি ১৯৯৭ সালে ভারতের বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের ম্যাচে চৌদ্দ, ষাট ও আটাশিত মিনিটে তিন তিনটি গোলের ঝড় ওঠার স্মৃতিও রয়েছে। সব মিলিয়ে গত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে সাফে বাংলাদেশ দলের এই শেষ সময়ে গোল খাওয়ার প্রবণতা একটি স্থায়ী ব্যাধিতে রূপ নিয়েছে।
২০০৩ সালের সাফজয়ী দলের কৃতি স্ট্রাইকার আলফাজ আহমেদ এই দীর্ঘস্থায়ী সমস্যার একটি বৃহত্তর কারণ খুঁজে বের করেছেন বলে জানিয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, ফিফা এবং এএফসি এই নির্দিষ্ট বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা পরিচালনা করেছে। তাদের সেই গবেষণার প্রতিবেদনে দেখা গেছে যে, শৈশবের পুষ্টিহীনতা এবং নিয়মিত খাদ্যাভ্যাসের নানা সমস্যার কারণে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর ফুটবলাররা সাধারণত ম্যাচের সত্তর মিনিট সময় পার হয়ে যাওয়ার পর আর আগের মতো সমান তালে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার শারীরিক সক্ষমতা ধরে রাখতে পারে না।
বাংলাদেশ জাতীয় দলের বর্তমান কোচের কাছেও যে এই বাস্তব সত্যগুলো অজানা থাকার কোনো কারণ নেই, তা বলাই বাহুল্য। তাঁর নিজস্ব মন্তব্যেও বিষয়টি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে, যেখানে তিনি বলেছেন যে টুর্নামেন্টে যদি চ্যাম্পিয়ন হতে হয়, তবে ম্যাচের একদম শেষ মিনিট পর্যন্ত সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে লড়াই চালিয়ে যেতে হবে। কিছুক্ষণ ভালো ফুটবল খেলে যদি আবার মাঝপথে দল হাল ছেড়ে দেয়, তবে স্বাভাবিকভাবেই শক্তিশালী প্রতিপক্ষ সেই সুযোগ লুফে নেবে এবং সেটাই ধ্রুব সত্য।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।