
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি অর্জনের পাশাপাশি প্রারম্ভিক স্তরের চাকরির বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে পেশাগত অভিজ্ঞতার অভাব একটি চিরন্তন জটিলতা হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে। অধিকাংশ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানেই নিয়োগের ক্ষেত্রে পূর্বকাজের অভিজ্ঞতা চাওয়া হয়, যা নতুন স্নাতকদের জন্য বড় একটি বাধা। তবে সঠিক পন্থায় বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের বিভিন্ন একাডেমিক ও সহশিক্ষামূলক কার্যক্রমকে ফুটিয়ে তুলে এই ঘাটতি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।
শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা কালীন সময়ে সম্পন্ন করা বিভিন্ন ধরনের গবেষণা কর্ম, মাঠপর্যায়ের জরিপ পরিচালনা এবং প্রশিক্ষণ গ্রহণের অভিজ্ঞতা চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে। এর পাশাপাশি বিভিন্ন ক্লাব কার্যক্রম এবং সমাজসেবামূলক বা স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিজ্ঞতাও নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। তবে এই সমস্ত অর্জনগুলো যথাযথ নিয়মে জীবনবৃত্তান্তে বা সিভিতে উপস্থাপন করা অত্যন্ত জরুরি।
একাডেমিক পাঠ্যক্রমের অংশ হিসেবে তৈরি করা গবেষণাপত্র বা টার্ম পেপারের মতো বিষয়গুলো সরাসরি সিভিতে যুক্ত করা যেতে পারে। অবশ্য প্রার্থীর উচিত সব অ্যাসাইনমেন্টের দীর্ঘ তালিকা না দিয়ে কেবল নির্দিষ্ট চাকরির পদের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত ও তাৎপর্যপূর্ণ কাজগুলো সাবধানে বেছে নেওয়া।
একজন শিক্ষার্থী তাঁর শিক্ষাজীবনে শ্রমবাজার বিশ্লেষণ, সামাজিক বৈষম্য কিংবা জলবায়ু পরিবর্তনের মতো সমসাময়িক বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে গবেষণামূলক কাজ সম্পন্ন করে থাকেন। তাই চাকরির জন্য আবেদন করার সময় নির্দিষ্ট পদের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক গবেষণাগুলোকেই কেবল সিভিতে প্রাধান্য দেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের বিংহ্যামটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যারিয়ার বিষয়ক নির্দেশিকায় জীবনবৃত্তান্তে গবেষণার অভিজ্ঞতা সঠিকভাবে তুলে ধরার বিষয়ে কিছু নির্দিষ্ট পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সেই নির্দেশিকা অনুযায়ী গবেষণার সঠিক শিরোনাম, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নাম, নিজের ওপর ন্যস্ত দায়িত্ব, কাজের নির্দিষ্ট সময়কাল এবং ব্যবহৃত পদ্ধতি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে বলা হয়েছে।
একাডেমিক কার্যক্রমের অংশ হিসেবে শিক্ষার্থীরা প্রায়শই মাঠপর্যায়ে সরাসরি তথ্য সংগ্রহ, সাক্ষাৎকার গ্রহণ, পর্যবেক্ষণ এবং জরিপ কাজের মতো কার্যক্রমে অংশ নিয়ে থাকেন। এই ধরনের প্রাক্-পেশাগত কাজের মাধ্যমে অর্জিত নানান দক্ষতাও সিভিতে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলা সম্ভব।
তবে জীবনবৃত্তান্তে কেবল সংক্ষিপ্তভাবে ‘মাঠকাজ করেছি’ লিখে দায় সারলে চলবে না; বরং কাজের নির্দিষ্ট স্থান, গবেষণার মূল উদ্দেশ্য, ব্যবহৃত কার্যপদ্ধতি এবং সংগৃহীত ফলাফল বিশ্লেষণে প্রার্থীর নিজের ভূমিকা ঠিক কী ছিল, তা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা আবশ্যক।
উচ্চশিক্ষার এই পর্বে পড়াশোনার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানিত শিক্ষকদের সঙ্গে বিভিন্ন গবেষণা কিংবা অন্যান্য একাডেমিক কাজের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সোনালী সুযোগ তৈরি হয় শিক্ষার্থীদের সামনে।
এই বিষয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের বিশিষ্ট অধ্যাপক মাসউদ ইমরান তাঁর মতামত প্রকাশ করে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অধ্যয়নরত অবস্থায় শিক্ষার্থীরা টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্ট বা টিএ এবং রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট বা আরএ হিসেবে অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে কাজ করতে পারেন।
তিনি আরও যোগ করেন যে, এই ধরনের কাজের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট অধ্যাপক মহোদয় শিক্ষার্থীদের কাজের দক্ষতার স্বীকৃতিস্বরূপ অভিজ্ঞতার একটি প্রাতিষ্ঠানিক সনদ প্রদান করতে পারেন। পাশাপাশি তিনি উল্লেখ করেন যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যদি এই বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো নীতিমালা থাকত, তবে তা শিক্ষার্থীদের জন্য আরও বেশি সুবিধাজনক হতো।
এ ছাড়া বিভিন্ন ধরনের কর্মশালায় সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণের মাধ্যমে অর্জিত অভিজ্ঞতার সনদপত্রগুলোও পরবর্তীতে শিক্ষার্থীদের চাকরি পাওয়ার লড়াইয়ে ভীষণভাবে কাজে লাগবে।
শিক্ষকের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে পরিচালিত গবেষণা কার্যক্রম, পাঠদান-সহায়ক বিভিন্ন কাজ কিংবা কোনো বিশেষ প্রকল্পে সম্পৃক্ত থাকার অভিজ্ঞতা সিভিতে অন্যান্য অংশের চেয়ে আলাদাভাবে প্রদর্শন করা উচিত।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের একাডেমিক কাজগুলো সিভিতে বর্ণিলভাবে সাজানোর পাশাপাশি নিয়োগকর্তারা ঠিক কোন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এই সমস্ত অভিজ্ঞতাকে মূল্যায়ন করে থাকেন, সে বিষয়ে সম্যক ধারণা রাখা আবশ্যক।
নামিদামি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান এসিআইয়ের মানবসম্পদ বিভাগের সহকারী ব্যবস্থাপক মোড. আকতার হোসেন একটি শীর্ষস্থানীয় দৈনিককে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জানান যে, সদ্য বিশ্ববিদ্যালয় পাস করা বেশির ভাগ তরুণ-তরুণীরই পূর্ববর্তী চাকরির কোনো অভিজ্ঞতা থাকে না।
এই পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করে তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে তাঁরা মূলত নতুন প্রার্থীর শিক্ষাগত যোগ্যতার পাশাপাশি তাঁদের মৌলিক ও প্রাসঙ্গিক দক্ষতা, বিশেষ করে বিভিন্ন কারিগরি দক্ষতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করে থাকেন।
তিনি আরও স্পষ্ট করেন যে, মাঠপর্যায়ের কাজ এবং গবেষণা কার্যক্রম নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে, যা অভিজ্ঞতা না থাকলেও প্রার্থীদের প্রতিযোগিতার বাজারে অন্যদের তুলনায় অনেকখানি এগিয়ে রাখে।
মোড. আকতার হোসেনের মতে, এই একাডেমিক ও গবেষণামূলক অভিজ্ঞতাগুলো পেশাগত চাকরির চতুরতার কোনো বিকল্প হতে না পারলেও, ক্যারিয়ারের প্রারম্ভিক স্তরের চাকরির ক্ষেত্রে এগুলোর গুরুত্ব কোনোভাবেই অস্বীকার করা যায় না।
প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সহশিক্ষা কার্যক্রম বা এক্সট্রা কারিকুলার অ্যাক্টিভিটিজে সক্রিয় অংশগ্রহণ শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত চরিত্র গঠন এবং পেশাগত দক্ষতা বহুগুণ বাড়িয়ে তুলতে দারুণ সাহায্য করে।
বর্তমান যুগের নিয়োগকর্তারা শুধুমাত্র প্রার্থীর ঠান্ডা কাগজের শিক্ষাগত যোগ্যতা বা পরীক্ষার আকর্ষণীয় ফলাফল দেখে সন্তুষ্ট হন না, বরং তাঁরা প্রার্থীর সাবলীল যোগাযোগের দক্ষতাও গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন।
পাশাপাশি প্রার্থীর যেকোনো কঠিন দায়িত্ব কাঁধে নেওয়ার মানসিকতা, সহকর্মীদের সঙ্গে দলগতভাবে কাজ করার সুপ্ত ক্ষমতা এবং নতুন কর্মপরিবেশের সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নেওয়ার অসাধারণ যোগ্যতার মূল্যায়ন করা হয়।
সহশিক্ষা কার্যক্রমে যুক্ত থাকার সুবাদে শিক্ষার্থীরা যে অমূল্য অভিজ্ঞতা অর্জন করেন, কর্মক্ষেত্রে এই সমস্ত প্রয়োজনীয় দক্ষতার বাস্তব প্রমাণ হিসেবে তা সিভিতে খুব সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলা সম্ভব।
এসিআই প্রতিষ্ঠানের মানবসম্পদ বিভাগের অপর এক সহকারী ব্যবস্থাপক আশরাফুল ইসলাম এই প্রসঙ্গে মন্তব্য করে বলেন যে, বিশ্ববিদ্যালয় স্তরে সহশিক্ষা কার্যক্রম এবং বিভিন্ন ধরনের স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজ ক্যারিয়ারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি উদাহরণ দিয়ে বোঝান যে, বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের ডিবেট ক্লাব, ক্যারিয়ার ক্লাব কিংবা এ জাতীয় অন্যান্য নামী ক্লাবে প্রার্থীরা ঠিক কী ধরনের দায়িত্ব পালন করেছেন এবং কোন পদে আসীন ছিলেন, তা গভীরভাবে যাচাই করে দেখা হয়।
তবে তিনি শেষ পর্যন্ত অত্যন্ত জোরালোভাবে সতর্ক করে বলেন যে, এই সমস্ত সহশিক্ষা কার্যক্রমে অংশগ্রহণের নেপথ্যে যাবতীয় প্রমাণপত্র, প্রশংসাপত্র বা অফিশিয়াল সনদগুলো সযত্নে সংগ্রহ করে নিজের কাছে সংরক্ষণ করে রাখা অত্যন্ত জরুরি।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।