
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
গত ৩১ অক্টোবর পালিত হয়েছিল বিশ্ব মিতব্যয়িতা দিবস। ইতিহাসের পাতা ঘেঁটে জানা যায়, ১৯২৪ সালে ইতালির মিলানে অনুষ্ঠিত প্রথম আন্তর্জাতিক সঞ্চয় ব্যাংক কংগ্রেসে অধ্যাপক ফিলিপ্পো রাভিজ্জা এই দিনটিকে আন্তর্জাতিক সঞ্চয় দিবস হিসেবে পালনের ঘোষণা দিয়েছিলেন।
সে সময় সমাজের বিভিন্ন স্তর থেকে মিতব্যয়ের বার্তা ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়া হতো। স্কুল, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং নারী সংগঠনগুলোও এই কার্যক্রমে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিল। ফলে এটি শুধু ব্যাংকারদের নির্দিষ্ট কোনো বিষয় ছিল না, বরং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিল।
তবে বর্তমান সময়ে এসে জীবিকা নির্বাহের সেই হিসাব আগের তুলনায় অনেক বেশি জটিল ও কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত বছরের সেপ্টেম্বরে যে নির্দিষ্ট পণ্য বা সেবার পেছনে ১০০ টাকা ব্যয় হতো, চলতি বছরের একই সময়ে তার জন্য খরচ করতে হয়েছে ১০৮ টাকা ৩৪ পয়সা।
পরিসংখ্যান বলছে, দেশে মূল্যস্ফীতির হার বর্তমানে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশে। অথচ একই সময়ে জাতীয় পর্যায়ে সাধারণ মানুষের গড় মজুরি বৃদ্ধির হার মাত্র ৭ দশমিক ৯০ শতাংশ। দীর্ঘ সাড়ে চার বছর ধরে মজুরি বৃদ্ধির হার পণ্যের দাম বাড়ার গতিকে ছাড়িয়ে যেতে ব্যর্থ হয়েছে।
রাজশাহীর মতো মফস্বল শহরের একটি মাঝারি মানের পরিবারে প্রতি মাসে ৩০ হাজার টাকার সংসার খরচ বিবেচনা করলে বিষয়টি স্পষ্ট হয়। একই পরিমাণ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতে এখন পরিবারগুলোকে খরচ করতে হচ্ছে প্রায় ৩২ হাজার ৫০০ টাকা।
এর ফলে প্রতি মাসে আড়াই হাজার টাকা এবং বছরান্তে প্রায় ত্রিশ হাজার টাকার অতিরিক্ত আর্থিক চাপের মুখে পড়তে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। আয়ের সাথে ব্যয়ের এই বিশাল ব্যবধান পূরণ করতে হয় হয় খাওয়ার পাতে খাবার কমিয়ে, নতুবা স্থানীয় মুদিদোকানের খাতায় দেনা জমিয়ে।
মানুষের জীবনযাত্রার ওপর এই তীব্র অর্থনৈতিক চাপের পেছনে মূল ভূমিকা পালন করছে অনেক দূরের একটি যুদ্ধ। পশ্চিম এশিয়ায় চলমান সংঘাতের তীব্র আশঙ্কায় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে প্রতি ব্যারেল ১১৭ ডলারে গিয়ে ঠেকেছে, যা গত পাঁচ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ রেকর্ড।
বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ইরান যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাবে চলতি বছর বিশ্ববাজারে বিভিন্ন পণ্যের দাম ১৬ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। সংঘাতটি ভৌগোলিক দিক থেকে দূরে হলেও এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব সরাসরি এসে পড়ছে দেশের স্থানীয় বাজারে।
এর কারণ হিসেবে বলা যায়, পণ্য আনা নেওয়ার কাজে ব্যবহৃত ট্রাক, বাস এবং জলপথের নৌকাগুলো জ্বালানি তেল দিয়েই পরিচালিত হয়। এই প্রেক্ষাপটে গত ২০ সেপ্টেম্বর সরকার দেশের বাজারে চার ধরনের জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বৃদ্ধি করেছে।
জ্বালানি তেলের বাড়তি পরিবহন খরচের এই পুরো বোঝা শেষ পর্যন্ত চাল, ডাল ও সবজির মতো নিত্যপণ্যের বর্ধিত দামের মাধ্যমে ক্রেতার পকেট থেকেই আদায় করা হয়। দেশের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন এ বিষয়ে সতর্ক করে জানিয়েছেন যে, পণ্যের দামের এই ঊর্ধ্বগতির প্রভাব আগামী দু-এক মাসের মধ্যেও কমার কোনো সম্ভাবনা নেই।
সূত্র: আজকের পত্রিকা