
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
কয়েকটি ব্যাংকের ভঙ্গুর অবস্থাকে কোনোভাবেই ইসলামি ব্যাংকিং কাঠামোর মৌলিক নীতির ব্যর্থতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর মধ্য দিয়ে মূলত এটিই স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, শরিয়তের সঠিক নির্দেশ পালনের পাশাপাশি সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থাপনা, জবাবদিহিতার পরিবেশ, স্বচ্ছতা বজায় রাখা এবং যথাযথ নিয়ন্ত্রণ বাস্তবায়ন করা কতটা আবশ্যক।
ইসলামি ব্যাংকিং ব্যবস্থায় অর্থবরাদ্দকে অনেক সময় বিনিয়োগ হিসেবে অভিহিত করা হয়ে থাকে, তবুও ব্যাংকগুলোর অর্থ ফেরত পাওয়ার সহজাত ঝুঁকি সবসময়ই বজায় থাকে। পর্যাপ্ত মূল্যায়ন ছাড়া বড় অংকের অর্থায়ন করা, গ্রাহকের আর্থিক সামর্থ্য যাচাইয়ের ক্ষেত্রে ঘাটতি থাকা এবং কোনো বিশেষ প্রভাবশালী গোষ্ঠীকে অতিরিক্ত অর্থায়ন করার ফলে ব্যাংকের সম্পদের মান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
খেলাপি বিনিয়োগের পরিমাণ বেড়ে গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের আয় যেমন হ্রাস পায়, তেমনই প্রভিশন বা নিরাপত্তা সঞ্চিতি সংরক্ষণের চাপও বৃদ্ধি পায় এবং এর ফলে নতুন খাতে বিনিয়োগ করার ক্ষমতা কমে যায়। এই পরিস্থিতির কারণে দেশের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এবং গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদনশীল খাতগুলো তাদের প্রয়োজনীয় আর্থিক সহযোগিতা থেকে বঞ্চিত হয়।
আমানতকারীদের চাহিদামাফিক যেকোনো সময় অর্থ উত্তোলনের সুযোগ নিশ্চিত করা যেকোনো ব্যাংকের অন্যতম একটি মৌলিক দায়িত্ব হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে নির্ধারিত সময়ে বিনিয়োগের অর্থ আদায় না হওয়া, মাত্রাতিরিক্ত অর্থায়ন করা, সম্পদের দুর্বল ব্যবস্থাপনা এবং সামগ্রিক আস্থার সংকটের কারণে ব্যাংকগুলো তীব্র তারল্য সংকটের মুখে পড়তে পারে।
গ্রাহক ও আমানতকারীরা যখন কোনো ব্যাংকের আর্থিক শক্তি নিয়ে সংশয়ে ভোগেন, তখন তারা একসঙ্গে বিপুল পরিমাণে আমানতের অর্থ তুলে নেওয়ার চেষ্টা করেন, যা বিদ্যমান সংকটকে আরও বেশি ঘনীভূত করে তোলে। এই ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে ব্যাংকের সার্বিক ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পরিচালনা করা জরুরি হয়ে পড়ে।
কোনো ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ, মূল ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ, নিরীক্ষা বিভাগ এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ইউনিটের কার্যপরিধিতে দায়িত্বের স্পষ্ট সীমারেখা না থাকলে সেখানে নানা ধরনের অনিয়ম মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার সুযোগ তৈরি হয়। যখন একই ব্যক্তি বা একক কোনো বাণিজ্যিক গোষ্ঠীর হাতে অতিরিক্ত ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত থাকে, তখন স্বার্থের সংঘাত এবং যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে পক্ষপাতদুষ্ট হওয়ার ঝুঁকি বহুলাংশে বেড়ে যায়।
ব্যাংক খাতের সামগ্রিক মালিকানা ও পরিচালনায় স্বচ্ছতা বজায় রাখা, স্বাধীন পরিচালকদের পক্ষ থেকে কার্যকর ভূমিকা পালন নিশ্চিত করা এবং সার্বিকভাবে পেশাদার ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠা করা অত্যন্ত অপরিহার্য। এই পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়িত হলে তবেই অনিয়ম ও দুর্নীতির পথ রুদ্ধ করা সম্ভব হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।
ইসলামি ব্যাংকিংয়ের সবচেয়ে বড় বিশেষ পরিচয় হলো এর যাবতীয় কার্যক্রম শরিয়তের সুনির্দিষ্ট নীতিমালা মেনে পরিচালনা করা। তবে শুধু কিছু নির্দিষ্ট ইসলামি পরিভাষা ব্যবহার করলেই কোনো ব্যাংকের সব ধরনের কার্যক্রম স্বয়ংক্রিয়ভাবে শরিয়তসম্মত হয়ে যায় না, বরং এর বাস্তব প্রতিফলন থাকতে হবে।
প্রতিটি চুক্তির বাস্তব রূপ, পণ্যের প্রকৃত মালিকানা, সুনির্দিষ্ট ঝুঁকি বণ্টন পদ্ধতি এবং প্রতিটি লেনদেনের আসল কাঠামো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করা দরকার। শরিয়তের তদারকি বা সুপারভিশন প্রক্রিয়া যদি কেবল লোকদেখানো বা আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে তা সাধারণ গ্রাহকদের মনে গভীর আস্থার সংকট তৈরি করতে পারে।
ইসলামি অর্থায়নের বিভিন্ন প্রক্রিয়া সফলভাবে পরিচালনার জন্য আধুনিক ব্যাংকিং, হিসাববিজ্ঞান, আইনগত বিষয়, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং শরিয়াহর ওপর সমন্বিত জ্ঞান ও দক্ষতার প্রয়োজন রয়েছে। এসব খাতে দক্ষ জনবলের যথেষ্ঠ অভাব থাকলে নতুন পণ্যের নকশা তৈরি এবং ঝুঁকি মূল্যায়নের প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের দুর্বলতা দেখা দিতে পারে।
অন্যদিকে, বর্তমান যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ডিজিটাল ব্যাংকিং এবং সাইবার সুরক্ষার আধুনিক ব্যবস্থায় পর্যাপ্ত বিনিয়োগ করা না হলে যুগের সঙ্গে চলা আধুনিক গ্রাহকদের পরিবর্তিত চাহিদা পূরণ করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। তাই সার্বিক উন্নতির জন্য প্রযুক্তির ব্যবহার ও দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার বিকল্প নেই।
সূত্র: আজকের পত্রিকা